একসঙ্গে থেকেও যখন আলাদা
শুধু দুজন বুঝে, ভেতরের সম্পর্কটা কতটা শূন্য হয়ে যাচ্ছে...
রোজী আরেফিন
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৩
মিতু আর রাকিবের বিয়ে হয়েছে প্রায় আট বছর। বিয়ের শুরুতে তাদের জীবন ছিল বেশ রঙিন। ছুটির দিনে একসঙ্গে বাইরে যাওয়া, রাতে দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ, ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে পরিকল্পনা–বলা চলে ঘাসফড়িংয়ের জীবন কাটাত দুজন। সময়ের সঙ্গে সেই উচ্ছ্বাস ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। এখন তারা সকালে একসঙ্গে নাশতা করলেও কথা হয় কেবল কয়েকটি প্রয়োজনীয় বাক্যে, দিনের বাকি সময় কাটে তাদের নিজ নিজ কাজে ডুবে থেকে।
কোনো বড় ঝগড়া নেই, কিন্তু ভালো লাগা বা আবেগের আদান-প্রদানও নেই। সংসারের খরচ চলে, সন্তান স্কুলে যায়, বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হয়, কিন্তু শুধু তারা দুজন বুঝে, তাদের ভেতরের সম্পর্কটা কতটা শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
তারা আলাদা হয়ে যায়নি। কারণ পরিবার, সমাজ আর সন্তানের কথা মাথায় রেখে এখনও একই ছাদের নিচে থাকে। বাস্তবে তারা মানসিকভাবে অনেক আগেই দূরে সরে গেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরীর মতে, দম্পতির মধ্যে এ ধরনের সম্পর্ককে সাইলেন্ট ডিভোর্স বলা হয়। যেখানে সম্পর্ক কাগজপত্রে বেঁচে থাকে। আবেগ, ভালোবাসা ও মানসিক যোগাযোগ অনেক আগেই মারা যায়।
সাইলেন্ট ডিভোর্সের পেছনের প্রধান কারণ
অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন ও নারীর পরিবর্তন
বর্তমানে নারীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষিত ও কর্মজীবী। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়ে তারা আর সম্পর্কের নামে অবহেলা বা নির্যাতন সহ্য করতে রাজি নন। আগে সামাজিক চাপ ও আর্থিক অসহায়ত্বে অনেক নারী অখুশি দাম্পত্যে জীবন কাটিয়ে দিতেন। এখন সেই মানসিকতা বদলেছে।
যৌথ পরিবার থেকে নিউক্লিয়ার পরিবার
আগে বড় পরিবারে দম্পতির মধ্যে সমস্যা হলেও আশপাশে শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন থাকত, যা দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনত বা অন্তত চাপ ভাগ করে নিত। এখন ছোট পরিবারে সব চাপ সরাসরি দম্পতির ওপর পড়ে। ফলে টানাপোড়েন বাড়ে।
ডিজিটাল যুগের অস্থিরতা
সোশ্যাল মিডিয়া, মেসেজিং অ্যাপ, অনলাইন গেম বা কনটেন্টের প্রতি আসক্তি বাস্তব কথোপকথন কমিয়ে দিচ্ছে। অনলাইনে ফ্লার্টিং বা পরকীয়ার সুযোগও বেড়েছে।
নৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় অনীহা
ধৈর্য, ক্ষমা ও সহনশীলতা দাম্পত্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থ, তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টির লোভ ও আত্মকেন্দ্রিকতা জায়গা নিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টার জায়গায়।
জীবনযাপনের অমিল
দম্পতির কর্মঘণ্টা, জীবন লক্ষ্য, বিনোদনের ধরন বা আবেগ প্রকাশের ধরনে অমিল থাকলে সময়ের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব বাড়ে।
সমাধানের পথ
অধ্যাপক কামাল চৌধুরী বলেন, সাইলেন্ট ডিভোর্স থামানো সম্ভব। এর জন্য উভয় পক্ষের সচেতন প্রচেষ্টা প্রয়োজন। যেমন–নিয়মিত খোলামেলা কথা বলা, প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট সঙ্গীর সঙ্গে দিনের কথা, অনুভূতি ও চিন্তা শেয়ার করা।
মানসম্মত সময় কাটানো: হাঁটাহাঁটি, রান্না, সিনেমা বা ছোট ভ্রমণ সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনে।
ডিজিটাল সীমাবদ্ধতা: খাওয়ার সময় ও ঘুমানোর আগে প্রযুক্তি ব্যবহার সীমিত রাখা।
আবেগিক সহায়তা: জীবনের ছোট-বড় সমস্যায় পাশে থাকা ও উৎসাহ দেওয়া।
দাম্পত্য কাউন্সেলিং: সমস্যাকে প্রাথমিক অবস্থায় চিহ্নিত করে সমাধান বের করার সুযোগ।
সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ: স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত নয় যে প্রতিনিয়ত কেউ কাউকে ডমিনেট করবে, বরং পরস্পরের মতামত, ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে সম্মান প্রদর্শন করেই সম্পর্কের এক মজবুত ভিত গড়ে তোলা যায়।
নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চা
ধৈর্য, ক্ষমা, দায়িত্ববোধ ও সততা–এসব গুণ অনুশীলন দাম্পত্যে দীর্ঘস্থায়িত্ব আনে। বিশেষ করে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা মানুষের মধ্যে মানসিক স্থিরতা আনে এবং যে কোনো সম্পর্ক ভাঙতে নিরুৎসাহিত করে।
পুরুষের মানসিক প্রস্তুতি: এখন নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, উচ্চশিক্ষিত ও সচেতন। আগের মতো অবহেলা বা অত্যাচার সহ্য করবে না। সংসার মানে দুজনের সমান দায়িত্ব ও মতামতের মূল্যায়ন–এটি পুরুষদের মেনে নিতে হবে।
ভবিষ্যতের জন্য কীভাবে চিন্তা করা উচিত?
সব দম্পতিকে এটি বুঝতে হবে সাইলেন্ট ডিভোর্স শুধু তাদের জন্য নয়, পুরো পরিবারের তথা সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নীরব এই বিচ্ছেদে দম্পতি আইনি বিচ্ছেদে না গেলেও আবেগ, যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার সম্পর্ক ভেঙে যায়, যা ধীরে ধীরে পারিবারিক পরিবেশকেও শূন্য করে তোলে। এর ফলে শুধু স্বামী-স্ত্রী নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্য বিশেষ করে সন্তানরা সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপে থাকে। তারা মা-বাবার মধ্যে দূরত্ব ও অবহেলার কারণে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে, আত্মবিশ্বাস হারায়, এমনকি শিক্ষাগত ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এ অভিজ্ঞতা তাদের নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
- বিষয় :
- সংসার
