আমিশদের দেশে একদিন
আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার আমিশ গ্রামে চারদিকে সুনসান নীরবতা -ছবি: সংগৃহীত
মুসাফির পারভেজ
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:১২
একটু কল্পনা করুন–সকালে উঠে আপনি মোবাইল হাতে নিতে যাচ্ছেন আর সেখানে কেউ এসে বলছে: ‘না! মোবাইল হারাম!’ শুনেই আপনি ঝাঁকি খেলেন। ভাবতে লাগলেন এটা কি স্বপ্ন? না কি টাইম মেশিনে উঠে প্রাচীন যুগে চলে গেছি?
না, এটি কোনো স্বপ্ন নয়। শুনতে আশ্চর্য লাগলেও এমন এক বাস্তব গ্রাম আছে আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ায়। সতেরো শতকের দিকে তারা ঝাঁক বেঁধে ইউরোপ থেকে উত্তর আমেরিকায় চলে আসে। বর্তমানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া, ওহাইও এবং ইন্ডিয়ানা রাজ্যে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছে। সেখানে মানুষ এখনও মোবাইল, টিভি, ফ্রিজ– সবকিছু থেকে মুক্ত। তারা হলো আমিশ জাতি। আমি গিয়েছিলাম সেই ‘নেটওয়ার্কহীন গ্রামে’ ঘুরতে।
যখন সময় থেমে যায়, এখানে ঘোড়া ছুটে চলে
শিপন কাকা, হানিফ কাকা, শাহনেওয়াজ কাকা আর আমি মিলে বেরিয়ে পড়লাম আমিশ গ্রামে। গেট দিয়ে ঢুকতেই মনে হলো আচ্ছা, এটা কি ‘গল্পের জাদুর গ্রাম?’ চারদিকে সুনসান নীরবতা। না আছে হর্নের শব্দ, না আছে মোবাইলের টুংটাং, শুধু ছুটে আসছে ঘোড়ার গাড়ি আর লোকেরা যেন ‘টাইম ট্রাভেল’ করে আদিকালে গিয়ে বসেছে।
তাদের মোবাইল নেই?
না, তারা কেউ মোবাইল ব্যবহার করে না। শুধু তাই নয়, আমিশরা টিভি, ইন্টারনেট–এমনকি ফ্রিজও ব্যবহার করে না। তাদের ঘরে আলো বলতে শুধু একটা কেরোসিন ল্যাম্প, তাও রান্নাঘরে। তোমার প্রিয় ‘ঘরে বসে খাবার অর্ডার?’ ওটা বললেই তোমায় ধোয়ামোছার ঝাঁটা মেরে তাড়িয়ে দেবে।
পোশাক যেন নাটকের কস্টিউম
তাদের পোশাক দেখে মনে হয় যেন পুরোনো সিনেমার সেটে ঢুকে পড়েছি। সব নারী মাথা ঢেকে রাখে, একই রঙের লম্বা জামা পরে। এক কথায় পরিপূর্ণ পর্দানশীন নারী। ছেলেরা কালো রঙের বিশাল জামা পরে। তবে মাথায় বড় একটা কালো টুপি অবশ্যই থাকা চাই। মডার্ন ফ্যাশন এখানে নিষিদ্ধ বলা যায়।
নিয়মের কড়াকড়ি
গ্রামে ঢুকেই গাইড বলে দিল ছবি তুলতে পারবা না। তাদের সঙ্গে কথা বলবা না। তাদের বাড়ির কাছে যাবা না। নিয়মের এমন কড়াকড়ি দেখে মনে হচ্ছিল, এবার শার্লক হোমস হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি না করলেই নয়।
১৬ বছর বয়সে ‘ভোট’
প্রতিটি ছেলেমেয়ে ১৬ বছরে পৌঁছে নিজেই ঠিক করে–আমি আমিশ থাকব নাকি আধুনিক জীবনে যাব। মানে ১৬ বছর বয়সেই একটা গোটা সভ্যতা থেকে বিদায় বা স্বাগত জানানোর লাইসেন্স। যদি কেউ চলে যায়, তার আর ফিরে আসার সুযোগ নেই। একেবারে ব্লক লিস্ট।
তাদের নিজস্ব শিক্ষাব্যবস্থা আছে, তাও কেবল নামমাত্র। যেখানে ন্যূনতম পড়ালেখা করানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পর্যন্ত তাদের যাওয়া হয় না। শর্ত একটাই–যদি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যেতে চায় সে পুনরায় আমিশ সভ্যতার অংশ হতে পারবে না।
হোস্টেল না, চার্চভিত্তিক পুলিশ
তাদের সমাজে পুলিশের বদলে চার্চের বড় ভাইরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। যদি কেউ নেশা করে, তাহলে কি হয় জানেন? না, থানায় নেয় না–সোজা চার্চে নিয়ে গিয়ে ধর্মীয় আদালত বসে।
শেষ কথায় একটু সিরিয়াস হই…
হাসি-মজা করলেও আমিশদের জীবন আমাদের অনেক কিছু শেখায়। তারা জানিয়ে দেয়, বাঁচা মানেই দৌড়ানো নয়। কখনও কখনও একটু থেমে যাওয়াও জীবনের বড় আনন্দ হতে পারে। তাদের সরল জীবন দেখে মনে হয়–এটাই বুঝি সত্যিকারের স্বাধীনতা। না মোবাইলের দাসত্ব, না সোশ্যাল মিডিয়ার মিথ্যে হাসি–শুধু প্রকৃতি, পরিবার আর শান্তির এক জগৎ।
আপনি যদি সত্যি সত্যিই নিজেকে খুঁজে পেতে চান, তাহলে একবার এই ‘মোবাইলহীন গ্রামে’ ঘুরে আসতে পারেন। নতুন কিছু না দেখলেও, হারানো কিছু অনুভব করবেন–হৃদয়ের একদম গভীরে। v
- বিষয় :
- গ্রাম
