আদিবাসীদের বিয়ের পোশাক
আদিবাসীদের বিয়ের পোশাকে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন লক্ষণীয় ছবি: মিজেল হোজাল
ফাতেমা তুজ জোহরা মাইসা
প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬ | ০৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের পাহাড়, সমতল আর বনাঞ্চলজুড়ে বসবাস করে নানা জাতিগোষ্ঠীর আদিবাসী সম্প্রদায়। প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি, উৎসবের মতো বিয়ের আচারেও রয়েছে নিজস্বতা। আদিবাসীদের বিয়ের পোশাক শুধু পোশাক নয়, বরং তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয় প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম। এ দেশের আদিবাসীদের বিয়ের পোশাকের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যেমন বেশির ভাগ পোশাক নিজস্ব তাঁতে বোনা কাপড় দিয়ে তৈরি। পোশাকে থাকে উজ্জ্বল রং ও ঐতিহ্যবাহী নকশা।
আদিবাসীদের বিয়ের পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত হয় ধাতব বস্তু বা রুপার অলংকার। এ ছাড়া বিয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা পোশাক তৈরি করা হয়। বর্তমানে তাদের পোশাকে আধুনিকতার প্রভাব থাকলেও ঐতিহ্যবাহী রীতির উপস্থিতি এখনও বজায় রয়েছে।
চাকমা: বাংলাদেশের পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে চাকমার জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাদের নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে। চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক হওয়ায় বিয়ের পর কনেকে বর নিজের ঘরে নিয়ে আসেন। চাকমা বিয়েতে বর সাধারণত ধুতি ও পাঞ্জাবি পরেন; যাতে থাকে জুয়ের সিলুম নকশা। মাথায় থাকে হাবং; যা এক ধরনের পাগড়ি। অন্যদিকে কনে পরে পিনোন-হাদি, যা চাকমা নারীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক। আগে এসব পোশাক পরিবারের সদস্যরাই তাঁতে বুনে তৈরি করতেন। এখনও অনেক পরিবার সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। যদিও বর্তমানে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন টেক্সটাইল দোকানেও এসব পোশাক সহজেই পাওয়া যায়।
গারো: গারোরা মূলত সমতলের আদিবাসী এবং তাদের সমাজব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক। ফলে বিয়ের পর ছেলে মেয়ের বাড়িতে এসে বসবাস করেন। তাদের বিয়ের পোশাকেও রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। গারো কনে সাধারণত দকমান্দা পরেন, মাথায় দেন কুপিং (পাগড়ি) এবং পেছনে থাকে দমি; যা মোরগের পাখা দিয়ে তৈরি এক ধরনের অলংকার। বর পরেন গান্না চংতব; যা ধুতি জাতীয় পোশাক এবং মাথায় থাকে কুটিপ। এ ছাড়া তারা হাতে চাকসিল, পায়ে জাসিল এবং কানে বিভিন্ন ধরনের দুল ব্যবহার করেন। তবে বর্তমানে অনেক গারো নারী বিয়েতে দকমান্দার পাশাপাশি শাড়ি বা গাউনও পরেন এবং পুরুষদের মধ্যেও স্যুট বা পাঞ্জাবি পরার প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
ত্রিপুরা: ত্রিপুরা সম্প্রদায় মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে এবং শিল্প-সংস্কৃতিতে তারা সমৃদ্ধ। তাদের সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক। ত্রিপুরা কনে বিয়েতে সাধারণত রিনাই ও রিসা পরেন। রিনাই হলো স্কার্ট বা থামি ধরনের পোশাক এবং রিসা এক ধরনের ওড়না। এসব পোশাক সাধারণত তারা নিজেরাই তাঁতে বুনে তৈরি করেন। বর পরেন ধুতি ও পাঞ্জাবি। অনেক সময় রিসা কাপড় দিয়েই পাঞ্জাবি তৈরি করা হয়। বর্তমানে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন দোকানে এসব পোশাক পাওয়া যায়। এর পাশাপাশি স্থানীয় নারী উদ্যোক্তারাও রঙিন রিনাই-রিসা তৈরি করে থাকেন।
মারমা: মারমা সম্প্রদায়ের বসবাস মূলত বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায়। তাদের বিয়ের পোশাকও বেশ আলাদা এবং দৃষ্টিনন্দন। মারমা কনে বিয়ের সময় পরে থঃবুইং ও মঃমা রাংজি, যা এক ধরনের লুঙ্গি ও টপ। পায়ে থাকে কাখ্যাং (খারু) এবং মাথায় গবং নামে একটি মাথার বন্ধনী। বর পরেন খঃয়অ ও য়ঃক্যা রাংজিঃ বা আংঙ্গি, যা লুঙ্গি ও শার্টের মতো এক ধরনের পোশাক। এসব পোশাক অনেক সময় মিয়ানমার থেকে আনা হয়। তবে বর্তমানে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন দোকানেও পাওয়া যায়।
আদিবাসীদের বিয়ের পোশাকের সঙ্গে অলংকারেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাধারণত তাদের মধ্যে গলার বড় হার, নাকফুল, চুড়ি, কানের দুল এবং পায়ের ভারী অলংকার ব্যবহারের চল রয়েছে। অধিকাংশ অলংকার তৈরি হয় রুপা বা অন্যান্য ধাতু দিয়ে–যদিও মাঝেমধ্যে স্বর্ণালংকারও দেখা যায়।
একসময় আদিবাসীদের বিয়ের পোশাক পুরোপুরি নিজেদের তৈরি তাঁতের কাপড়েই সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের পরিবর্তনে এখন বাজারে সহজেই রেডিমেইড পোশাক ও অলংকার পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আগের সেই প্রস্তুতির উৎসবমুখর পরিবেশ কিছুটা কমে গেলেও বিয়ের পোশাকে তাদের ঐতিহ্য এখনও অটুট রয়েছে।
বাংলাদেশের আদিবাসীদের বিয়ের পোশাক শুধু সাজসজ্জা নয় বরং এটি তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
- বিষয় :
- বিয়ের অনুষ্ঠান
