ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভ্রমণ

মেঘ, পাহাড় আর সবুজের শহরে

মেঘ, পাহাড় আর সবুজের শহরে
×

এল্লার পাহাড়, জলপ্রপাত আর সবুজে মোড়া চা বাগান পর্যটকদের মন কাড়ে সহজেই

গোলাম কিবরিয়া

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬ | ০৭:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাতভর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ট্রেন যখন ধীরে ধীরে এল্লা স্টেশনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন জানালার বাইরে ভোরের আলো মাত্র ফুটতে শুরু করেছে। পাহাড়ের গায়ে সাদা কুয়াশা ঝুলে আছে, দূরে চা বাগানের সারি সবুজ ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্তজুড়ে। ট্রেনের জানালা দিয়ে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাসে চায়ের পাতার কাঁচা গন্ধ মিশে ছিল। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল–এল্লা কোনো শহর নয়, যেন মেঘের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক নীরব স্বপ্ন।
শ্রীলঙ্কার পার্বত্য অঞ্চলের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত ছোট্ট এই পাহাড়ি শহরের উচ্চতা প্রায় এক হাজার ৪১ মিটার। কিন্তু সংখ্যায় এর সৌন্দর্য মাপা যায় না। এল্লার আসল পরিচয় তার প্রকৃতিতে–পাহাড়, মেঘ, উপত্যকা, জলপ্রপাত আর অসীম সবুজে মোড়া চা বাগানের এক অপার্থিব জগৎ। এখানে আকাশ যেন আরও কাছে নেমে আসে। কখনও মেঘ এসে ছুঁয়ে যায় পাহাড়ের চূড়া, কখনও রোদের ঝিলিক সবুজ পাতার ফাঁকে তৈরি করে এক অদ্ভুত আলোছায়ার খেলা।
স্টেশন থেকে বের হয়েই চোখে পড়ে ছোট ছোট ক্যাফে, পাহাড়ি রেস্তোরাঁ আর ব্যাকপ্যাক কাঁধে ঘুরে বেড়ানো পৃথিবীর নানা দেশের পর্যটক। এল্লার রাস্তাগুলোয় এক ধরনের ধীর জীবন বয়ে চলে। এখানে কেউ তাড়াহুড়া করে না। পাহাড়ের শহর যেন সবাইকে একটু থামতে শেখায়।
সকালের নাশতা শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম এল্লার সবচেয়ে বিখ্যাত আকর্ষণ নাইন আর্চ ব্রিজ দেখতে। পাহাড়ি শহরে চলাচলের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাহন ‘টুকটুক’। চালক হাসিমুখে বললেন, ‘ট্রেন আসার সময় গেলে সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য দেখতে পারবেন।’ কথাটা শুনে উত্তেজনা আরও বেড়ে গেল।
টুকটুক আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগোতে লাগল। দুই পাশে চা বাগান, মাঝেমধ্যে কুয়াশার চাদর, দূরে পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট বাড়ি। কিছুদূর পর রাস্তা শেষ হয়ে শুরু হলো হাঁটার পথ। সরু ট্রেইল ধরে এগোতেই হঠাৎ সামনে উন্মোচিত হলো সেই বহুল পরিচিত দৃশ্য–সবুজ পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা নাইন আর্চ ব্রিজ।
প্রথম দেখাতেই বোঝা যায়, কেন এটি এল্লার প্রতীক হয়ে উঠেছে। দুটি পাহাড়কে যুক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাথরের এই সেতু যেন সময়ের সাক্ষী। ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত এই রেলসেতুর বয়স শত বছরেরও বেশি। ৯টি বিশাল বাঁকানো খিলানের জন্য এর নাম হয়েছে ‘নাইন আর্চ ব্রিজ’। মাঝের খিলানগুলো সবচেয়ে উঁচু আর দুই পাশেরগুলো ধীরে ধীরে মাটির দিকে নেমে এসেছে। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, কোনো কংক্রিট বা স্টিল স্ট্রাকচার ছাড়াই শুধু পাথর আর ইটের গাঁথুনিতে তৈরি হয়েছিল এই স্থাপত্য বিস্ময়।
চারপাশে তখন পর্যটকের ভিড়। কেউ ছবি তুলছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ আবার রেললাইনের পাশে বসে অপেক্ষা করছে ট্রেনের জন্য। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে ভেসে এলো ট্রেনের হুইসেল। মুহূর্তেই চারপাশে এক ধরনের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। পাহাড়ের বুক চিরে নীল রঙের ট্রেন যখন ধীরে ধীরে ব্রিজের ওপর উঠে এলো, পুরো দৃশ্যটা যেন সিনেমার কোনো দৃশ্য হয়ে উঠল। নিচে সবুজ বন, ওপরে ধোঁয়াটে আকাশ আর মাঝখানে শত বছরের পুরোনো সেতুর ওপর দিয়ে এগিয়ে চলা ট্রেন–সেই মুহূর্ত সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
নাইন আর্চ ব্রিজ থেকে ফিরে বিকেলের দিকে রওনা দিলাম লিটল অ্যাডামস পিকের উদ্দেশে। এল্লায় এসে এই ট্রেক না করলে ভ্রমণ যেন অপূর্ণ থেকে যায়। পাহাড়টির উচ্চতা প্রায় এক হাজার ১৪১ মিটার। তবে পথটি খুব কঠিন নয় বলে সব বয়সী পর্যটকই এখানে উঠতে পারেন।
চা বাগানের ভেতর দিয়ে শুরু হয় হাঁটার পথ। সবুজ গাছের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে সরু ট্রেইলের ওপর। কোথাও চা পাতা তুলছেন শ্রমিকরা, কোথাও ইউরোপীয় পর্যটকরা ক্যামেরা হাতে হাঁটছেন ধীরে ধীরে। পাহাড়ি বাতাসে হাঁটার ক্লান্তি খুব একটা টের পাওয়া যায় না।
একসময় মাটির পথ শেষ হয়ে শুরু হলো সিঁড়ি। চূড়ায় উঠতে বেশ কিছু সিঁড়ি ভাঙতে হয়। মাঝেমধ্যে থেমে নিচের দিকে তাকালে দেখা যায় সবুজ উপত্যকা, আঁকাবাঁকা রাস্তা আর দূরে মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সারি। ওপরে পৌঁছানোর পর মনে হলো পুরো এল্লা শহর যেন চোখের সামনে বিছিয়ে আছে। চারপাশে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বাতাস এতটাই ঠান্ডা আর নির্মল যে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতেই ভালো লাগে।
ফেরার পথে পড়ল ‘ফ্লাইং রাবনা অ্যাডভেঞ্চার’-এর জিপলাইনিং স্পট। দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল মানুষ পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস কেটে ছুটে যাচ্ছে। পাহাড়ি নীরবতার মধ্যে তাদের চিৎকার আর উচ্ছ্বাস ভেসে আসছিল। এল্লা যে শুধু শান্ত প্রকৃতির শহর নয়, বরং রোমাঞ্চপ্রিয়দেরও স্বর্গ–সেটি এখানেই সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়।
পরদিন সকালে রওনা দিলাম এল্লা রকের পথে। এই ট্রেক একটু বেশি চ্যালেঞ্জিং। রেললাইন, ঘন জঙ্গল আর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে এগোতে হয়। পথের প্রতিটি বাঁকে নতুন দৃশ্য অপেক্ষা করে থাকে। কোথাও ছোট ঝরনা, কোথাও পাখির ডাক, কোথাও গভীর নীরবতা। কয়েক ঘণ্টার হাঁটার পর যখন চূড়ায় পৌঁছালাম, তখন ক্লান্তির চেয়ে বিস্ময়টাই বেশি কাজ করছিল। চারদিকে শুধু পাহাড়ের সমুদ্র। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর কোলাহল থেকে বহু দূরে চলে এসেছি।
এল্লার আরেকটি আকর্ষণ রাবনা জলপ্রপাত। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা সাদা জলধারা দূর থেকেই চোখে পড়ে। কাছাকাছি যেতেই শোনা যায় পানির গর্জন। পাহাড়ি পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে জল ছিটকে আসছিল চারদিকে। স্থানীয়রা বললেন, রামায়ণের কিংবদন্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই জলপ্রপাতের ইতিহাস। বলা হয়, রাজা রাবণ সীতাকে এখানে লুকিয়ে রেখেছিলেন। পৌরাণিক গল্প আর প্রকৃতির সৌন্দর্য মিলে জায়গাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
সন্ধ্যার পর এল্লা শহরের রূপ আবার বদলে যায়। ছোট ছোট ক্যাফে আর রেস্তোরাঁগুলো আলোয় ঝলমল করতে থাকে। কোথাও লাইভ মিউজিক, কোথাও পাহাড়ি ঠান্ডায় গরম কফির কাপ হাতে আড্ডা। বিদেশি পর্যটকের ভিড়, হাসির শব্দ আর পাহাড়ি বাতাস মিলিয়ে তৈরি হয় অন্যরকম এক প্রাণচাঞ্চল্য।
এল্লা এমন এক শহর, যেখানে প্রকৃতি আর জীবনের উচ্ছ্বাস পাশাপাশি হেঁটে চলে। সকালে মেঘে ঢাকা পাহাড়, দুপুরে চা বাগানের সবুজ, বিকেলে ট্রেকিংয়ের রোমাঞ্চ আর রাতে পাহাড়ি শহরের উষ্ণ প্রাণবন্ততা–সব মিলিয়ে এল্লা শুধু একটি ভ্রমণ গন্তব্য নয়, বরং এমন এক অনুভূতি, যা অনেক দিন পর্যন্ত মনে রয়ে যায়। 

আরও পড়ুন

×