লিপস্টিকে রাঙা ঠোঁট
এ বছর ঠোঁটে ওমব্রে করার চল বিশ্বজুড়ে চলছে মডেল: সাদিয়া ইসলাম; মেকওভার: শোভন’স মেকওভার; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আজ ২৯ জুলাই, লিপস্টিক দিবস। সাজসজ্জার এ উপকরণটি কেবলই সৌন্দর্য বাড়ানোর অংশ নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বের অংশ। লিপস্টিকের ইতিহাস আসলে সৌন্দর্যচর্চার বিবর্তনেরই গল্প। সময়ের সঙ্গে বদলেছে এর উপাদান, রং ও ব্যবহার। লিখেছেন রিক্তা রিচি
মনপুরা সিনেমার পরীর কথা মনে আছে? সিনেমার একটি দৃশ্যে দেখা যায়, প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে রঙিন কাগজ পানিতে ভিজিয়ে ঠোঁট রাঙিয়েছেন তিনি। পরী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী ফারহানা মিলি। একসময় গ্রামবাংলার অনেক কিশোরী এভাবেই ঠোঁট সাজাতেন। কারণ তখনও লিপস্টিকের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটেনি। এমন ঘটনা কি কেবল আমাদেরই? না। যখন ঠোঁটের সাজের কোনো কিছুই আবিষ্কার হয়নি, তখনও রূপসচেতন নারীরা ঠোঁট রাঙাতেন নানা পদ্ধতিতে। রানী ক্লিওপেট্রা ঠোঁট রাঙাতে লাল রং ব্যবহার করতেন। সেটি তৈরি হতো অ্যালজিন, আয়োডিন ও ব্রোমিনের মিশ্রণে। আবার তিনি এক ধরনের পোকা থেকে পাওয়া কারমাইন দিয়েও ঠোঁট লাল করতেন। মেসোপটেমিয়ানের উচ্চবিত্ত নারীরা ঠোঁট রাঙাতেন পাথরের গুঁড়া ও সাদা সিসার মিশ্রণে। ঠাকুরবাড়ির (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) মেয়ে-বউরা ঠোঁট লাল করতেন পান খেয়ে। সময় গড়িয়েছে। হয়েছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বাণিজ্যিকভাবে লিপস্টিক তৈরি হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি এখন মানুষের হাতের নাগালে। একদম সাধ্যের মধ্যে। কৃত্রিম রঙের লিপস্টিকের পাশাপাশি এখন বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক লিপস্টিকের চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশের দু-একটি ব্র্যান্ড এ নিয়ে কাজও করছে। হয়তো খুব শিগগির দেশের বাজারে প্রাকৃতিক লিপস্টিকের আধিপত্য বাড়বে।
কেন লিপস্টিক দিবস?
সাজসজ্জার অন্যতম প্রধান উপকরণ লিপস্টিক। এটি ছাড়া অনেক নারী বাইরে বের হওয়ার কথা ভাবতে পারেন না। শুধু তাই নয়, এ প্রসাধনীটি বিশেষ করে লাল লিপস্টিক প্রতিবাদ ও আত্মবিশ্বাসের ভাষাও হয়ে ওঠেছে। তাই তো বিশ্বজুড়ে থাকা লিপস্টিকপ্রেমীদের জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে ‘লিপস্টিক দিবস’-এর। আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্ব প্রকাশের প্রতীক হিসেবে লিপস্টিককে তুলে ধরতে প্রতিবছর ২৯ জুলাই ‘লিপস্টিক দিবস’ উদযাপন করা হয়। মেকআপপ্রেমীর জন্য একটি উদযাপনের দিন তো বটেই, নতুন রং, ট্রেন্ড ও মেকআপ স্টাইল নিয়ে আগ্রহ বাড়াতেও এ দিনটি ভূমিকা রাখে। এ দিবসটি প্রথম উদযাপন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালে। মার্কিন সৌন্দর্য উদ্যোক্তা ও বিউটি বিশেষজ্ঞ হুডা কাত্তান ২৯ জুলাইকে লিপস্টিক ডে হিসেবে উদযাপনের আহ্বান জানান। এরপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কসমেটিকস ব্র্যান্ড ও বিউটি কমিউনিটি দিনটি ব্যাপকভাবে উদযাপন শুরু করে।
প্রতিবাদের ভাষা লাল লিপস্টিক
মেরিলিন মনরো, অড্রে হেপবার্ন থেকে শুরু করে এখনকার অনেক হলিউড-বলিউড অভিনেত্রী, সংগীতশিল্পী লাল লিপস্টিকে ঠোঁট রাঙান। এর পেছনে কারণ রয়েছে। বিশ শতকে লাল লিপস্টিক হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক আন্দোলনে বিদ্রোহের প্রতীক। সাহস ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের প্রতীক হিসেবে লাল লিপস্টিক পরে নারীরা রাস্তায় নেমেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল–নারীর রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও নারীরা দেশপ্রেম ও দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে লাল লিপস্টিক ব্যবহার করেছেন। সে সময় ‘ভিক্টরি রেড’ নামে একটি শেড বাজারে চালু হয়েছিল। পরে মেরিলিন মনরো, অড্রে হেপবার্ন সেই টকটকে লাল লিপস্টিককে সৌন্দর্য, ফ্যাশন ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি করে তুলে ধরেছেন।
অন্যান্য রঙের লিপস্টিকেরও রয়েছে কদর
এখনকার নারীর কাছে গোলাপি, বেগুনি, মভ, বাদামি, কমলা শেডের লিপস্টিকের কদরও রয়েছে। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে কিংবা কনট্রাস্ট করে ঠোঁট রাঙান তারা। মন ভালো থাকুক বা খারাপ, লিপস্টিক না হলে যেন হয়ই না। উজ্জ্বল বিভিন্ন রঙের পাশাপাশি ন্যুড শেডের চাহিদা শীর্ষে। গত কয়েক বছর ধরে এই ন্যুড শেডের লিপস্টিকের চল চলছে।
বছরজুড়ে কোন ট্রেন্ড চলছে?
শোভন’স মেকওভারের কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা জানান, এ বছর ওমব্রে লিপসের চাহিদা বেড়েছে। এ জন্য লিপ লাইনার দিয়ে ঠোঁট এঁকে ব্লেন্ড করা হয়। হালকা থেকে গাঢ় করে ওমব্রে করার চল বিশ্বজুড়ে চলছে। এ ছাড়া ন্যুড ও প্যাস্টেল শেডের ব্যবহার বেড়েছে। এ বছর বেড়েছে লিপগ্লসের ব্যবহার। বিভিন্ন রঙের লিপগ্লস বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানি লিপস্টিকের বদলে স্টিক লিপগ্লস নিয়ে এসেছে। আবার লিপবামের মতো রঙিন কিছু গ্লসি, শাইনি বামও এনেছে। এগুলো ঠোঁট ফাটা রোধ করে। একইসঙ্গে ঠোঁটে হালকা আভাও যুক্ত করে।
ত্বকের সঙ্গে মানানসই শেড
রূপবিশেষজ্ঞদের মতে, সব রং সবার ঠোঁটে একভাবে ফুটে ওঠে না। উজ্জ্বল ত্বকে পিঙ্ক, কোরাল ও ক্ল্যাসিক রেড সুন্দর লাগে। গমবর্ণ ত্বকে ক্যারামেল, টেরাকোটা ও ব্রাউন ন্যুড দারুণ মানায়। শ্যামলা ত্বকে বেরি, ওয়াইন, প্লাম ও ডিপ রেড এনে দেয় আলাদা আবেদন। নিজের ত্বকের আন্ডারটোন বুঝে শেড নির্বাচন করলে সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে।
বর্ষায় লিপস্টিক ব্যবহারের নিয়ম
বর্ষার আর্দ্র আবহাওয়ায় লিপস্টিক দ্রুত মুছে যেতে পারে। তাই ব্যবহারের আগে ঠোঁট পরিষ্কার করে লিপবাম ব্যবহার করা উচিত। শোভন সাহা মনে করেন, লিপস্টিক ব্যবহারের আগে লিপ প্রাইমার বা লিপ বেজ ব্যবহার করলে টেক্সার ভালো আসে। যাদের ঠোঁট বেশি শুষ্ক, তাদের জন্য এ নিয়মে লিপস্টিক ব্যবহার করা ভালো। লিপ বেজ ব্যবহার করলে লিপস্টিক দীর্ঘস্থায়ী হয়, ঠোঁট কালো হয় না।
লিপ লাইনার দিয়ে আউটলাইন এঁকে লিপস্টিক লাগানো যেতে পারে। টিস্যু দিয়ে হালকা ব্লট করে আবার একটি স্তর লাগালে রং দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। যদি ঝামেলাহীন থাকতে চান, তাহলে ম্যাট লিপস্টিক ব্যবহার করুন। অবশ্য ঠোঁট সুন্দর রাখতে পরিচর্যা করতে হবে। কোমল ও সতেজ ঠোঁটের জন্য সপ্তাহে দুদিন লেবু ও চিনির সাহায্যে স্ক্রাব করতে পারেন। বাজারে বিভিন্ন ধরনের লিপ অয়েল পাওয়া যায়। রূপবিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠোঁটের ধরন অনুসারে সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।
কেনার আগে খেয়াল রাখুন
শুধু রং দেখে নয়, লিপস্টিকের মেয়াদ, উপাদান ও মান দেখে লিপস্টিক কিনুন। মেয়াদোত্তীর্ণ প্রসাধনী ব্যবহার করা উচিত নয়। ঠোঁট সংবেদনশীল হলে ভালো মানের ও ময়েশ্চারাইজিং উপাদানসমৃদ্ধ লিপস্টিক বেছে নিন। সুস্থ ও নিরাপদে থাকতে অন্যের লিপস্টিক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
পছন্দের লিপস্টিক কোথায় পাবেন, দাম কেমন
দেশের বাজারে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের লিপস্টিক বেশ জনপ্রিয়। লরিয়েল, ম্যাক, জর্ডানা, ফ্লোরমার, নিওর, গোল্ডেন রোজ, হুদা বিউটি, লোটাসসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লিপস্টিক বিভিন্ন প্রসাধনীর স্টোরে পাওয়া যায়। এ ছাড়া লিলি, লা ফেম্মেসহ আরও কিছু ব্র্যান্ডের প্রসাধনী তরুণীদের চাহিদার শীর্ষে থাকে। লিপস্টিকের দাম শুরু ২০০ টাকা থেকে। মান ও ব্র্যান্ডভেদে দাম তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।
- বিষয় :
- ঠোঁট ফাটা