মুক্তগদ্য
স্মৃতির বাঁশিতে অমলিন সুর
ধূসর স্মৃতির উজ্জ্বল ক্যানভাস
কুলসুম বিবি
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬:৫৬ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:২০
বৈশাখী মেলার কথা শুনলেই ভেসে ওঠে শৈশবের এক রঙিন পৃথিবী। পাড়া-প্রতিবেশী মিলে দলবেঁধে যেতাম। চৈত্র মাসের শেষ দিকে যখন আমের মুকুলের ঘ্রাণ বাতাসে ভাসত, তখনই বুঝতে পারতাম মেলা আসন্ন। গ্রামের পাশে পুরোনো কড়ই গাছতলা মাঠে বসত মেলা। দু-তিন দিন আগে থেকে প্রস্তুতি চলত। দোকানিদের কর্মযজ্ঞ দেখতে ভালো লাগত। গ্রামের প্রান্তরে বিশাল মাঠটিতে দোকানিরা তাঁবু খাটাত। বাঁশের ওপর টিনের চালা, চারপাশে রঙিন কাগজের সাজ। একেক করে দোকানগুলো গড়ে উঠত। কোনোটা পিতলের গহনার, কোনোটা কাঠের খেলনার, মৃৎশিল্পের আর কাচের চুড়ি-আলতা-ফিতার দোকান। মেলার এক প্রান্তে বসত সার্কাস আরেক প্রান্তে নাগরদোলা।
সকালবেলা বাবার হাত ধরে যেতাম। মা আগেই ঠিক করে দিতেন। আমার জন্য লাল রংয়ের ক্লিপ, আপুর জন্য রঙিন চুড়ি আর ছোট ভাইয়ের জন্য মাটির ঘোড়া। কিন্তু মেলায় গিয়ে সব পরিকল্পনা উল্টে যেত। চোখ জুড়ানো এত কিছু দেখে মন অস্থির হয়ে যেত। যেন জীবন জেগে উঠত।
চারদিকে মানুষের ঢল, হাসি-গানে মুখর পরিবেশ। কেউ সার্কাস দেখছে, কেউ দেখছে বায়োস্কোপ। কেউবা আবার নাগরদোলায় চড়ে চিৎকার করছে। পটুয়া মিয়ার বাঁশির সুরে পুতুল নাচের সঙ্গে সাজানো গল্প বলা দেখে অনেকেই মুগ্ধ। রঞ্জনদাদার জরির কাজ করা কাপড়, সব মিলিয়ে এক অপূর্ব জগৎ। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল খাবার। বাতাসে ভাসত মুড়ি-চানাচুর, মিষ্টি, জিলাপির গন্ধ, চটপটির ঝাঁজ, তিলের খাজা, তিল্লাই, মন্ডা মিঠাই আর শেষে খেজুরের গুড়ের পাটালি– সেটা না খেলে যেন মেলাতেই আসা হয়নি। এটি ছিল গ্রামের মানুষের মিলনমেলা।
যুগ পাল্টেছে, এখন শহরের জাঁকজমকপূর্ণ ফ্ল্যাটে বসে এসব কথা ভাবি। নিউমার্কেটের চকচকে মেলা কিংবা হোটেলে আয়োজিত ‘বৈশাখী উৎসব’ এসব স্মৃতির কাছে নিষ্প্রভ। আমার গ্রামের সেই মাটির মেলা, বৃষ্টিভেজা তাঁবুর নিচে জড়ো হওয়া মানুষ, মাইকে ভেসে আসা গানের সুর– সব যেন হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ সুখ। জানি বৈশাখ বারবার ফিরে আসবে। ফিরে আসবে বাহারি মেলা। কিন্তু ফিরে আসবে না শুধু সেই স্মৃতিময় দিনের খেলা।
- বিষয় :
- গল্প
- স্মৃতি
- সুহৃদ সমাবেশ
