যে নদী ফিরিয়ে দিল ক্ষমা
চিত্রকর্ম:: সাফায়েত সাগর
ফারহানা খানম
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছে। দুদিন ধরে টানা বৃষ্টির পর রোদ যেন একটু একটু করে মাটির ওপর নিজের অধিকার ফিরে পাচ্ছে। ভেজা পাতাগুলোয় আলো এসে থামে, আবার সরে যায়। দূরের বিলে সাদা বকেরা নেমেছে। বাতাসে কাদা, ধানগাছ আর ভেজা মাটির এক ধরনের শান্ত গন্ধ।
রাস্তার পাশে বাঁশের সাঁকোর মাথায় দাঁড়িয়ে থাকে রফিক। তার হাতে একটি কালো ছাতা। অথচ এখন আর ছাতার প্রয়োজন নেই। রোদ উঠছে। তবু সে ছাতাটা ভাঁজ করে না। যেন ছাতার চেয়েও ভারী কিছু সে হাতে ধরে আছে।
গ্রামের মানুষ জানে, রফিক একটু অদ্ভুত হয়ে গেছে। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। বাজারে একটি ছোট ইলেকট্রনিক্সের দোকান চালায়। মোবাইল মেরামত ও চার্জার বিক্রি করে। কারও ফোনে অ্যাপ ইনস্টল করে দেয়। কথাবার্তায় ভদ্র, হাসিখুশি। কিন্তু বৃষ্টি থামলেই তাকে এই সাঁকোর কাছে দেখা যায়।
কেউ জিজ্ঞেস করলে সে শুধু বলে, আকাশটা দেখি।
লোকজন হেসে উড়িয়ে দেয়। সত্যিটা কেউ জানে না। প্রায় এক বছর আগে, এমনই এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে এই সাঁকো থেকেই একজন বৃদ্ধ নদীতে পড়ে গিয়েছিলেন। সবাই ভেবেছিল, অন্য কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। রফিকও তাই ভেবেছিল। সে তখন দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছিল। একটু থামে, তাকায় আবার হাঁটা দেয়। ৫ মিনিট পর যখন লোকজন ছুটে আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সেই ৫ মিনিটই রফিকের জীবনকে থামিয়ে দেয়। এরপর থেকে আকাশ মেঘলা হলেই তার বুকের ভেতর অকারণ অস্বস্তি জমে। বৃষ্টি থামলে সে এই সাঁকোয় এসে দাঁড়ায়। যেন নিজের সেই ৫ মিনিটের বিচার নিজেই করে।
আজও দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় দূরে একটি মোটরসাইকেল পিছলে পড়ে। একজন কলেজছাত্র ছিটকে রাস্তার ধারে নর্দমার মতো ফুলে ওঠা খালে পড়ে যায়। মাথায় আঘাত লেগে সে আর উঠতে পারে না। চারপাশে মানুষ জড়ো হয়। কেউ ভিডিও করছে। কেউ চিৎকার করছে– ধরো! ধরো!
কিন্তু কেউ নামছে না। রফিকের বুকের ভেতর যেন এক বছর আগের সেই ৫ মিনিট ফিরে আসে। সে এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকে না। ছাতাটা ফেলে দিয়ে সোজা পানিতে ঝাঁপ দেয়। পানির স্রোত এখনও তীব্র। ছেলেটির জামা আঁকড়ে ধরে সে ওপরে তোলে। আরও দুজন তখন সাহস পেয়ে নেমে আসে। অনেক কষ্টে সবাই মিলে ছেলেটিকে ওপরে তোলে। ছেলেটি কাঁপছে, কিন্তু বেঁচে আছে।
অ্যাম্বুলেন্স ডাকা হয়। মানুষ এবার রফিকের পিঠ চাপড়ে দেয়। কেউ ভিডিও করতে করতে বলে– এই লোকটা না থাকলে আজ শেষ ছিল!
রফিক কিছু বলে না। সে শুধু ভেজা শরীর নিয়ে রাস্তার পাশে বসে পড়ে। তার চোখে পানি। সেটি বৃষ্টির নয়। বৃদ্ধ মানুষটির মুখ তার মনে পড়ে। এতদিন ধরে সে ভেবেছে, জীবনে কিছু ভুলের কোনো ক্ষমা নেই। আজ হঠাৎ তার মনে হয়, ক্ষমা হয়তো অন্যের কাছ থেকে আসে না; আসে পরের সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে।
সন্ধ্যায় বাজারে খবর ছড়িয়ে পড়ে–রফিক নাকি একজনের প্রাণ বাঁচিয়েছে। লোকজন তাকে নায়ক বানাতে চায়। সে হেসে বলে, আজ আমি কাউকে বাঁচাইনি। শুধু ৫ মিনিট নষ্ট করিনি। কেউ কথাটার অর্থ বুঝতে পারে না।
পরদিন সকালেও আকাশ পরিষ্কার থাকে। রফিক আবার সাঁকোর কাছে আসে। তবে আজ তার হাতে কোনো ছাতা নেই। সে অনেক দিন পর প্রথমবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে– মেঘ সরে গেলে শুধু রোদই বের হয় না, মানুষের ভেতরেও আলো ফুটে উঠতে পারে।
সুহৃদ, ঢাকা
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ