নানা রঙের রম্য গল্প
রেফারি বিভ্রাট
চিত্রকর্ম:: সাফায়েত সাগর
সোহেল নওরোজ
প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
জহিরের দোকান ছোট হতে পারে, কিন্তু মনটা মহাসাগরের মতো বড়। এ কথা জহির নিজের মুখেই বলে। ঠিক এ সময় দোকানের বয়োজ্যেষ্ঠ কাস্টমার আয়নাল সাগর কলার কাঁদির দিকে তাকায়। আজ তার পকেটে টান। না হলে সবচেয়ে বলিষ্ঠ কলার গন্তব্য তার উঁচু পেটেই হতো। ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে জহির বড়পর্দা টানিয়েছে। প্রজেক্টরে খেলা দেখার লোভে আয়নালের মতো অনেকেই জড়ো হচ্ছে। জহির খেলাপাগল মানুষ। বিশ্বকাপ তো আর রোজ আসে না! এ সময় একটু খরচ-খরচা করতে তার ভালোই লাগে।
আয়নাল খাঁ একটা জীর্ণ ১০ টাকার নোট বের করে জর্দা দেওয়া পান কিনে মুখে চালান করে দেয়। ঠিক সে সময় একজন উড়ে এসে বড় সাগর কলাটা টান দিয়ে ছিঁড়ে নেয়। তার বুকের ভেতর কিঞ্চিৎ মোচড় দিয়ে ওঠে। সে চোখ ঘুরিয়ে জহিরের দিকে তাকায়। তার গায়ে প্রিয় দলের জার্সি। আয়নালের গায়ে তিলে ধরা হোসিয়ারি গেঞ্জি। সে জহিরকে তাচ্ছিল্য করে বলে, ‘আজকালকার পোলাপানরা কী সব পিন্দে! দেশের ওপরে টান নাই, অন্য দেশের পতাকা শরীলে জড়ায়ে মাঞ্জা মারে!’ জহির শুনেও না শোনার ভান করে। সে আয়নালের স্বভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। দীর্ঘদিন ধরে এমন তির্যক মন্তব্য শুনে অভ্যস্ত। আয়নাল থামে না, ‘আমাগো সময় এইসব বাড়াবাড়ি ছিল না। বাপের ট্যাকা নষ্ট করে ফুটানি মারার সময়ই পাইত না ছেলেপুলেরা।’
একটা গোল হতেই ‘গোওওল’ বলে দর্শকরা চিৎকার করে ওঠে। আয়নালের মনে ছিল না। আচমকা শব্দ শুনে সে বেঞ্চ থেকে প্রায় পড়েই গিয়েছিল। কোনোমতে নিজেকে সামলে দিয়ে পাশের জনকে জিজ্ঞেস করে, ‘কে কারে গোল দিল?’ পাশের লোক আয়নালের অজ্ঞতায় কিছুটা বিরক্ত হলো, ‘খেলা দেখতে এসেছেন, অথচ কার খেলা জানেন না!’
আয়নাল লোকটার মুখের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল, ‘আমাগো সময় দল চিনা সহজ ছিল। এক পাশে খেলত সাদা জামাপরা দল। আরেক পাশে কালো। আমরা দুই দলে ভাগ হয়ে যেতাম। গোল দিলি পরে চিল্লাইতাম, অহন সকলেই রঙিন জামা পরে–কিডা কোন দলের পিলিয়ার, কোনডা রেফরি কিছুই বোঝা যায় না। পাশের লোক বিরক্তি এড়াতে নিঃশব্দে আয়নালের পাশ থেকে উঠে দূরে গিয়ে বসে। তাতে তার ভাবান্তর হয় না। এদিকে মাঠের উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। শেষ মুহূর্তের আক্রমণ দেখে জহির কাউন্টারে দাঁড়িয়েই লাফিয়ে উঠল। তা দেখে আয়নাল আবার ফোড়ন কাটল, ‘আরে জহির, লাফাইয়া লাভ কী? ওই বাইশজন মিইলা একটা বলের পিছে দৌড়াইতেছে, অথচ দোকানে কলার কাঁদি ঝুলতাছে দুইটা! অগোরে একেকটা কলা দিয়া দিলে তো এই মারামারিটা আর থাহে না!’ জহির জবাব দেওয়ার আগেই খেলা আরও জমে উঠল। খেলা যখন শেষের পথে তখন হঠাৎ করে হয় লোডশেডিং। সবাই ‘ইশ’ শব্দ করে ওঠে। ব্যতিক্রম কেবল আয়নাল। সে হো হো করে হেসে ওঠে। সবাই এবার তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায়। সুযোগ পেয়ে আয়নাল গলা চড়ায়, ‘কইছিলাম না, আমাগো সময়ডাই ভালো ছিল। মরার কারেন্ট যাওয়া-আসার বালাই ছিল না। সপ্তায় একবার করে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে আনলিই খেল খতম। আর টেনশন হইত না। ওইডাই ছিল সত্যিকারের বিশ্বকাপ।’
সুহৃদ, খুলনা
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ
