বৃষ্টির কোনো সাক্ষী থাকে না
শামসুজ্জামান সোহাগ
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
আষাঢ়ের মেঘলা বিকেলগুলো কেমন যেন অদ্ভুত রকমের নিরপেক্ষ। এগুলো কারও ব্যথায় থেমে থাকে না; কারও গভীর শোকের কাছে নত করে না মাথা। তবু যখন আকাশ ভেঙে ঝমঝম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করে, তখন মন বলে– এই আকাশ বুঝি পৃথিবীর সব গোপন কান্না আর না-বলা আক্ষেপের ভাষা খুব ভালো করেই পড়তে পারে। সেদিন বিকেলেও শহরের শেষ প্রান্তে জরাজীর্ণ পুরোনো রেলস্টেশনটিতে বিষণ্নতার ছায়া নেমে এসেছিল। শেষ প্ল্যাটফর্মের ভাঙা কাঠের বেঞ্চে নিঃসঙ্গ বসেছিলেন এক বয়োবৃদ্ধ লোক। তাঁর পাশে রাখা একটি ছোট মাটির টব আর তার ভেতরে সযত্নে পোঁতা একটি কদমের চারা। ধুলোবালি ও ব্যস্ততায় মোড়ানো পথচারীরা তাঁকে দেখে ভাবল, হয়তো বৃদ্ধ একটু পর গাছটি নিয়ে ঘরে ফিরবেন। কিন্তু সাঁঝের আঁধার ঘন হয়ে এলেও তিনি স্থানটি ছেড়ে উঠলেন না। ঠিক সেই মুহূর্তে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হতেই বৃদ্ধ ধীরপায়ে উঠলেন। স্টেশনের পাশের এক চিলতে খালি জমিতে আলতো করে চারাটি রোপণ করলেন। হাতের মুঠো দিয়ে ভেজা মাটি চেপে চেপে খুব মৃদু গলায় ফিসফিস করে বললেন–‘যে মানুষগুলো জীবনে আর কোনোদিন ফিরে আসে না, তাদের ভালোবাসার স্মৃতিতে অন্তত কিছু ফুল ফুটুক।’ বৃদ্ধের সেই করুণ আকুতি চারপাশের কোলাহলে কেউ শুনতে পেল না। কেবল আকাশ থেকে ঝরে পড়া বর্ষার জলই হলো সেই নীরব মুহূর্তের একমাত্র সাক্ষী। কালক্রমে অনেক বছর গড়িয়ে গেল। সময়ের নিয়মে বদলে গেল সেই পুরোনো স্টেশন। পুরোনো কাঠ-ইটের বেঞ্চ হারিয়ে গিয়ে সেখানে গড়ে উঠল ঝকঝকে নতুন প্ল্যাটফর্ম, এলো আধুনিক দ্রুতগামী ট্রেন। বর্ষাকাল এলেই স্টেশনের সেই কদমগাছটি সুবাসিত গোলাকার কদমফুলে ডালপালা ভরে তোলে। দূরপথের ক্লান্ত যাত্রী তার সবুজ ছায়ায় ক্ষণিক স্বস্তি খোঁজে, শিশুরা ঝরে পড়া কদমফুল কুড়িয়ে আনন্দে মেতে ওঠে আর নতুন প্রেমিক-প্রেমিকারা তার তলে দাঁড়িয়ে মধুর মুহূর্তের ছবি তোলে। কেউ কোনোদিন জানতে পারে না–ওই কদমগাছের শিকড়ে শিকড়ে জমে আছে একজন হারিয়ে যাওয়া মানুষের প্রতি নীরব প্রার্থনা। আসলে বৃষ্টি কখনও ইতিহাসের পাতায় নাম লেখে না। সে কেবল অদেখা ভালোবাসা আর গোপন বেদনার সুর মাটির গভীরে রোপণ করে অমর করে রেখে যায়।
যান্ত্রিক ব্যস্ততায় কদমগাছটি এখন এক জীবন্ত স্মৃতিসৌধ। বদলে যাওয়া প্ল্যাটফর্মে হাজারো মানুষের আনাগোনা, কারও তাড়াহুড়ো, কারও দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর। কিন্তু বর্ষার ভারী বর্ষণে যখন প্রথম কদমটির পরাগ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যেন পুরো প্ল্যাটফর্ম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। এক অপূর্ব সুবাসে ভেসে যায় বিষণ্ন বাতাস। পথচারীরা এই তরুর ছায়ায় বসে বৃষ্টি দেখে। কদমের স্নিগ্ধ স্পর্শে নিজেদের গল্প লেখে, কিন্তু কেউ জানে না এই বৃক্ষের প্রতিটা পাতায় জমা আছে এক অচেনা বৃদ্ধের পরম মমতা আর নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস। v
সুহৃদ, রংপুর
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ