ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি কবিতার জন্ম

একটি কবিতার জন্ম
×

হানিফ রাজা

প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাত তখন প্রায় ১২টা। ময়মনসিংহ শহরের কাঠগোলা বাপাউবো আবাসিক কলোনি নিস্তব্ধ। দূরে কোথাও কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক ভেসে আসছে। জানালার পাশে বসে আছেন কবি আবিদ। সামনে সাদা কাগজ, হাতে কলম। অথচ কাগজের বুক তখনও শূন্য।
সারাদিন ধরেই তাঁর মনের ভেতর একটি কবিতা ঘুরপাক খাচ্ছিল। কখনও একটি সুন্দর পঙ্‌ক্তি, কখনও বা নিখুঁত কোনো উপমা এসে ধরা দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, পুরো কবিতাটাই বুঝি মস্তিষ্কে রূপ নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে কিন্তু সাদা কাগজের সামনে বসতেই শব্দগুলো যেন অজানায় হারিয়ে যাচ্ছে।
পাশের ঘরে স্ত্রী নীলা, মেয়ে রাফা আর ছেলে রাফিন ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমানোর আগে নীলা তাগাদা দিয়ে বলেছিল–‘বেশি রাত জাগো না, শরীর খারাপ করবে।’ আবিদ শুধু মুচকি হেসেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, সৃষ্টির ব্যাকুলতায় আজ ঘুম সহজে নামবে না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাঁকা কাগজের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, কবিতাটা মাথায় আছে কিন্তু হাতে নামছে না কেন?
ঠিক তখনই আট বছরের মেয়ে রাফা ঘুম ভেঙে পানি খেতে এলো। বাবাকে টেবিলপ্রান্তে জেগে থাকতে দেখে অবাক হয়ে বলল–বাবা, এখনও ঘুমাওনি?
আবিদ মৃদু হেসে বললেন–‘না মা, একটু লিখছি।’
মেয়ে কাগজের দিকে তাকিয়ে বিজ্ঞের মতো হেসে বলল–‘লিখছো, নাকি লিখতে পারছো না?’
আবিদও হেসে বললেন, ‘দুটোই বলা যায় মা।’
রাফা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বলে উঠল– ‘বাবা, তুমি তো শুধু বসে আছো! যা মনে আসছে, সেটাই লিখে ফেলো না কেন?’
শিশুর এই অতিসহজ কথাটি যেন আবিদের ভেতরের স্তব্ধতা ভেঙে আলোর সঞ্চার করল। তিনি উপলব্ধি করলেন, নিখুঁত রূপ দেওয়ার অপেক্ষায় থেকেই হয়তো তিনি মূল সূচনাটাই করতে পারছেন না।
তিনি কলম তুলে নিলেন। একটি লাইন লিখলেন, আবার কেটে দিলেন। এবার আর থামলেন না। ভালো লাগুক আর না লাগুক, হৃদয়ের ভাবগুলোকে কাগজে ঢেলে দিতে লাগলেন। ধীরে ধীরে সাদা পৃষ্ঠায় শব্দেরা নিজেদের জায়গা করে নিতে শুরু করল।
রাত গভীর থেকে গভীরতর হলো। ঘরের কোণে ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া পুরো পৃথিবী যেন নিঃশব্দ। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গিয়ে চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেল। মোবাইল ফোনের ক্ষীণ আলোটুকু জ্বেলেই আবিদ আবার কলম ধরলেন। অন্ধকার ভেদ করে জেগে ওঠা সেই আলোয় কাগজের শব্দগুলো যেন নতুন প্রাণ পেল।
আবিদ বুঝলেন–কবিতা আকাশ থেকে ঝরে পড়ে না। মানুষের জীবন, স্মৃতি, বিরহ আর ভালোবাসার গভীরেই তার জন্ম। কলম আর কিবোর্ড তো কেবল সেই অলৌকিক অনুভূতিকে দৃশ্যমান জগতে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম।
দূরের মসজিদ থেকে ভোরের আজান ভেসে এলো। পুব আকাশে ভোরের আলো ফুটতেই স্ত্রী নীলা এসে পাশে দাঁড়াল। আবিদ কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই মুচকি হেসে বললেন–‘আজ একটা কবিতার জন্ম হলো নীলা।’
জানালার বাইরে নতুন দিনের আলো ছড়িয়ে পড়ছে আর টেবিলের ওপর পরম শান্তিতে শুয়ে রইল সদ্য জন্ম নেওয়া একটি কবিতা। 
সুহৃদ, ময়মনসিংহ

আরও পড়ুন

×