১২তম আসরের সূচনা
চিন্তায় মননে বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টাইমস মিডিয়া ভবনের অ্যাসেমব্লি চত্বরে বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের ১২তম আসরের উদ্বোধন করেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সুহৃদ সমাবেশের সদস্য এবং অভিভাবক প্রতিনিধিদের সঙ্গে আয়োজক ও অতিথিরা
আসাদুজ্জামান
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’ প্রতিপাদ্যে আবারও দেশজুড়ে শুরু হচ্ছে বিএফএফ-সমকাল জাতীয় বিজ্ঞান উৎসব। বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ) ও সমকালের যৌথ উদ্যোগে এবং সমকাল সুহৃদ সমাবেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য ১২তম আসরের পাওয়ার্ড বাই হিসেবে রয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি
কালো পিচের মসৃণ রাস্তা ধরে ছোটা স্বনিয়ন্ত্রিত যান কিংবা আধুনিক ড্রয়িংরুমের কোণে কথা বলা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–প্রযুক্তির এই দাপুটে যুগে আমরা প্রতিদিন অভ্যস্ত হয়ে উঠছি অসংখ্য নতুন বিস্ময়ে। প্রযুক্তির ঝলকানির আড়ালে অন্ধবিশ্বাস আর মুখস্থবিদ্যার অন্ধকারও তো কম নয়! প্রযুক্তির অপব্যবহার কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সংকট যখন দোরগোড়ায়, তখন সবকিছুর সামনে দাঁড়িয়ে মূল প্রশ্ন তুলে ধরার উপযুক্ত সময় এখনই। চারপাশের কুসংস্কার ঠেলে যুক্তি দিয়ে সত্যিটা খুঁজে নেওয়ার এ চিরন্তন তাগিদ নিয়ে তেজগাঁওয়ের টাইমস মিডিয়া ভবনের অ্যাসেমব্লি চত্বরে সমবেত হয়েছিল একঝাঁক বিতর্কপ্রেমী। আকাশে রঙিন বেলুন উড়িয়ে, চোখে হাজারো স্বপ্নের আলো নিয়ে সূচনা হলো বিএফএফ-সমকাল ১২তম জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসবের।
তেজগাঁওয়ের সেই ঝলমলে পড়ন্ত বিকেলটি শুধুই একটি প্রাতিষ্ঠানিক উৎসব উদ্বোধনের ছিল না; তা ছিল বিজ্ঞানমনস্ক এক অনাগত ভবিষ্যৎ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার। উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ। তিনি বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের স্মরণ করিয়ে দেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের যুগের এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার কথা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, পরীক্ষার খাতায় সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক কারণ নিখুঁতভাবে লিখেও যারা বাস্তবে সূর্যকে রাহুর গ্রাস থেকে বাঁচাতে ঢাক-ঢোল নিয়ে রাস্তায় নামে, আমাদের শিক্ষা যেন তেমন কপট না হয়। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু কিংবা অসাধারণ স্থপতি এফ আর খানের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনও বিজ্ঞানীরা উপযুক্ত মূল্যায়ন পান না। তাই উদীয়মান বিতার্কিকদের প্রতি তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল–কেবল পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব মুখস্থ করলেই চলবে না, চিন্তায়, আচরণে ও মননে সত্যি সত্যি বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠতে হবে।
প্রযুক্তির এই নতুন অধ্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার রোধ এবং জলবায়ুর জটিল ধাক্কা সামলাতে হলে প্রশ্ন করার বিকল্প নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং সোসাইটির মডারেটর অধ্যাপক ড. এসএম শামীম রেজার কণ্ঠেও ঝরে পড়ে সেই একই আশাবাদ। অন্যদিকে সমকালের প্রকাশক আবুল কালাম আজাদ তাঁর বক্তব্যে এ উদ্যোগকে আরও প্রসারিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে, যারা প্রতিনিয়ত চর্চা অব্যাহত রাখলে ভবিষ্যতে অনেক দূর যাবে। এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজনকে কেবল প্রিন্ট পত্রিকার পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে ডিজিটাল মাধ্যমেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী জানান, তরুণদের ভেতর থেকে বিজ্ঞানভীতি দূর করে দেশ গঠনে তাদের সক্রিয়ভাবে উদ্বুদ্ধ করাই এ উৎসবের অন্যতম লক্ষ্য। আয়োজনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, আজ যারা এখানে যুক্তির চর্চা করছে, এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই জন্ম নেবে আগামী দিনের বিজ্ঞানী, দূরদর্শী নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক মানের পথপ্রদর্শক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক কৃতী বিতার্কিক ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞ নিশাত সুলতানা আশা প্রকাশ করেন, যুক্তিবাদী এ তরুণরাই ভবিষ্যতে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলীর শুভেচ্ছা বক্তব্যের পরই উদ্বোধন ঘোষিত হয়। সমবেত তরুণদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে যুক্ত হয়েছিল গত আসরের রানার্সআপ ঢাকার শহীদ পুলিশ স্মৃতি কলেজ এবং হলি ক্রস স্কুলের খুদে বিতার্কিকরা।
উৎসবের পর্দা ওঠার পরই দেশের স্কুলগুলোয় শুরু হয়েছে প্রচার-প্রচারণা ও দল গঠনের তোড়জোড়। ৬৪ জেলার ৫২০টি স্কুলের অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির এক হাজার ৫৬০ জন খুদে বিতার্কিক এতে অংশ নিচ্ছে; যেখানে প্রতিটি দলে থাকছে তিনজন করে সদস্য। প্রতিটি জেলায় ন্যূনতম ১৫টি স্কুলে চালানো হবে তথ্য প্রচারণা, যেখান থেকে আবেদনের ভিত্তিতে সেরা আটটি স্কুল প্রতিযোগিতার মূল পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
রংপুর অঞ্চল থেকে শুরু হবে প্রতিযোগিতা। এরপর ধারাবাহিকভাবে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা-১ ও ঢাকা-২ অঞ্চলের বিতর্ক উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ প্রাথমিক লড়াইয়ে প্রতি জেলায় আটটি দল অংশ নেবে। ১৪ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে বিভাগীয় পর্ব, যেখানে জেলা পর্যায়ের বিজয়ী দলগুলো মুখোমুখি হবে। বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন দলগুলোকে নিয়ে আগামী ১৩ ও ১৪ নভেম্বর ঢাকায় বসবে জাতীয় পর্বের চূড়ান্ত আসর। ১৪ নভেম্বর ফাইনাল ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে নামবে দেশজুড়ে স্কুলভিত্তিক সবচেয়ে বড় এই বিতর্ক উৎসবের পর্দা। বিজয়ী দলের তিন সদস্যের প্রত্যেকের হাতে উঠবে ল্যাপটপ। রানার্সআপ দল পাবে ট্যাব এবং সেমিফাইনালিস্ট দুই দল পাবে স্মার্টফোন; যার সঙ্গে যুক্ত হবে ক্রেস্ট ও সনদপত্র।
তবে এ চকচকে উপহারগুলোকে ছাপিয়ে আয়োজনটি দিনশেষে হয়ে উঠেছে মুক্তচিন্তা ও যুক্তিতর্কের এক অনন্য পাঠশালা। ইট-কাঠের তেজগাঁও থেকে ছড়িয়ে পড়া এই যুক্তির সুর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে পৌঁছে যাক– বিজ্ঞানমনস্ক বাংলাদেশ গড়ার এটাই তো আসল পথ।
বিভাগীয় সম্পাদক, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ