ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কদমফুলের শেষ সুবাস

কদমফুলের শেষ সুবাস
×

চিত্রকর্ম:: সাফায়েত সাগর

আ স আ দ শাহীন

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের গ্রামটি ছিল সবুজে ঘেরা এক নীরব স্বর্গ। বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি বা ইট-পাথরের দালান সেখানে ছিল না; সন্ধ্যা নামলেই কুপি ও হারিকেনের আলো মেখে মায়াবী এক রূপ নিত চারপাশ। দিনমজুর বাবার সামান্য আয় আর মায়ের মমতায় চলত আমাদের অভাবের সংসার। মা-বাবা নিজেরা নিরক্ষর হলেও স্বপ্ন দেখতেন শিক্ষার আলো দিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার। আমি, আমার যমজ বোন সাথী এবং বড় ভাই আশিক ইকবাল–এই তিন ভাইবোনকে ঘিরে ছিল তাদের জীবনের সবটুকু প্রত্যাশা।

প্রতিদিন শিশিরভেজা মেঠোপথ ধরে হেঁটে স্কুলে যাওয়ার পথেই ছিল আমাদের শৈশবের মূল আকর্ষণ–একটি প্রকাণ্ড কদমগাছ। বর্ষা এলে গাছটি ডালপালা ভরে অজস্র সোনালি-সাদা গোলাকার কদমফুলে সেজে উঠত। বাতাসে সেই ফুলের আকুল সুবাস ভেসে আসত দূর থেকে। আমরা ভাইবোনেরা থমকে দাঁড়িয়ে নিচে ঝরে পড়া ফুল কুড়িয়ে নিই, নাকে চেপে বুকভরে টানি সেই মাতাল করা গন্ধ। মেঘলা দিনে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ঝরঝর বৃষ্টির সুর শোনা আর ফুলের গা বেয়ে জল গড়িয়ে পড়া দেখাটা ছিল জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা।

একদিন সেই আনন্দ স্থায়ী রূপ হারিয়ে বিষাদে রূপ নিল। সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে দেখি কুড়াল হাতে কিছু মানুষ কদমগাছটির গুঁড়িতে আঘাত হানছে। কুড়ালের একেকটি কোপে যেন মাটি কেঁপে উঠছিল; সঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল আমাদের কোমল মন। পরে শুনলাম, গ্রামের এক যুবক নাকি মাগরিবের পর গাছে সাদা কাপড় পরা অদ্ভুত এক ছায়া দেখেছিল। ঘটনার পর থেকে ছেলেটি অসুস্থ হয়ে মারা যায়। অশুভ ছায়ার আতঙ্কে প্রবীণদের সিদ্ধান্তে গাছটি চিরতরে কেটে ফেলা হলো।
গাছটি পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু একটি বৃক্ষই বিলীন হয়নি, হারিয়ে গিয়েছিল আমাদের পুরো শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর ও পবিত্র অধ্যায়টি।
আজ অনেক বছর পর গ্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে; পাকা রাস্তা আর বিদ্যুৎ এসেছে কিন্তু হারিয়ে গেছে সেই নিটোল সরলতা। গাছে আসলেও ভূত ছিল নাকি মানুষের কুসংস্কার, তা আজ আর বড় প্রশ্ন নয়। সত্য হলো, আজও বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামলে দূর থেকে কদমফুলের সুবাস ভেসে আসে। মনটা ক্ষণিকের জন্য আবার ফিরে যায় সেই পুরোনো মেঠোপথে; যেখানে যমজ বোন আর বড় ভাইয়ের সঙ্গে কদমগাছটি নীরব অভিভাবক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু গাছ  মরে গেলেও মানুষের স্মৃতির গভীরে চিরকাল সবুজ হয়ে বেঁচে থাকে। 
সুহৃদ, নাটোর

আরও পড়ুন

×