বৃষ্টিভেজা দিন ও প্রাপ্তির সমীকরণ
অলংকরণ: শেখ শাহাদ
আবীর আল নাহিয়ান
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি। হাসিবের গ্রামের বাড়িতে জরুরি কাজ। বাড়ি যাওয়ার আগে একবার ক্যাম্পাসেও যেতে হবে। সে কারণে বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করে মাথায় ছাতা চেপে সে বাসা থেকে বের হলো।
মোড়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা সিএনজি অটোরিকশা মিলল। বৃষ্টির দিনে অটোরিকশার পেছনের সিটের মাঝখানে বসাটাই সবচেয়ে নিরাপদ–দুই পাশ থেকে ভেজার ভয় থাকে না। তবে হাসিবের সেই সুযোগ হলো না। পেছনের পুরো সিট ততক্ষণে তিনজন যাত্রী দখল করে নিয়েছেন। অগত্যা চালকের পাশের আসনে বসতে হলো তাকে।
কিছুক্ষণ পর অটোরিকশাটি এসে থামল টিলাগড় পয়েন্টে। ভাড়া চুকিয়ে হাসিব ক্যাম্পাসের দিকে হাঁটতে শুরু করল। বৃষ্টির সজীব ছোঁয়ায় মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ যেন নতুন রূপ ধারণ করে আরও সতেজ এবং প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।
ডিপার্টমেন্টের কাজ শেষ করে হাসিব ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়াল। ততক্ষণে বৃষ্টির তোড় আরও বেড়েছে। ছাতা খুঁজতে গিয়ে দেখে ছাতাটি নেই! কোথায় ফেলে এসেছে, কিছুতেই মনে করতে পারল না। এটা তার পুরোনো অভ্যাস–যেখানেই যায়, ছাতা হারিয়ে আসে। বৃষ্টির তীব্রতায় দৌড়ে সামনের দোকানের বারান্দায় আশ্রয় নিল। হঠাৎ ডানদিকে তাকাতেই একটা চেনা চেহারায় চোখ আটকে গেল তার। মুখখানি পুরোপুরি চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। ‘সাদমান’–তার স্কুলের অভিন্নহৃদয় বন্ধু। সামান্য এক কথাকাটাকাটির জেরে অভিমানের বশে একসময় তাদের সুন্দর বন্ধুত্বটা থমকে গিয়েছিল।
অনেক বছর পর আচমকা সাদমানকে দেখে হাসিবের মনে দ্বিধা আর ইতস্ততবোধ জাগল– সাদমান তাকে চিনতে পারবে তো? আবার পুরোনো বন্ধুকে দেখার ব্যাকুলতাও তাগিদ দিচ্ছিল। কাছে গিয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘তুমি সাদমান না? আমি হাসিব...।’
সাদমান তাকে চিনে ফেলল। নিমেষেই উধাও হলো সব দূরত্ব। সোনালি দিনগুলো নিয়ে দুই বন্ধুর প্রাণখোলা গল্প চলতে লাগল।
হাসিব আবেগতাড়িত হয়ে সাদমানের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘জানিস সাদমান, সামান্য তুচ্ছ বিষয়ে ইগো ধরে রেখে এতটা বছর আমরা একে অপরের থেকে দূরে রইলাম। ভুল বোঝাবুঝি হলে তখনই মিটিয়ে নেওয়া উচিত ছিল।’
সাদমানের চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছে। সে হাসিবকে বুকে জড়িয়ে ধরে ভেজা গলায় বলল, ‘ভুল হয়ে গেছে রে ভাই। কখনও এই দূরত্বের দেয়াল আর উঠতে দেব না।’
বৃষ্টি কমলে বিদায় নিয়ে হাসিব টিলাগড় পয়েন্টের দিকে হাঁটতে লাগল। মন এখন অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠেছে। সে ভাবছিল–আজ যদি ছাতাটা না হারাত; তবে বন্ধুত্বের এ অপ্রকাশ্য দেয়ালটা হয়তো কোনোদিনই ভাঙত না। কখনও কখনও কিছুটা হারিয়ে যাওয়াই বোধহয় জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিগুলোকে সামনে এনে দেয়।
সুহৃদ, সিলেট
- বিষয় :
- সুহৃদ সমাবেশ