উপকূলে জরায়ুসংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন নারীরা
ছবি :: আশরাফুল ইসলাম
জিলফুল মুরাদ শানু
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৪ | ২২:৩১ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৪ | ১৩:৩৩
জলবায়ু পরিবর্তন– খেটে খাওয়া অনেক মানুষই এই শব্দের ব্যাপকতা সম্পর্কে অবগত নন। তবে এর প্রভাব তাদের জীবনকে করছে বিপন্ন। আগের তুলনায় ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পানির লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া এবং নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা এখন উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের জীবনসঙ্গী।
সুন্দরবনের কোলঘেঁষে গড়ে উঠেছে সাতক্ষীরা জেলার এক প্রান্তিক উপজেলা শ্যামনগর। উচ্চ রক্তচাপ, নারীর মূত্রনালির প্রদাহ, জরায়ুমুখ ক্যান্সারসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় বছরের পর বছরে ভুগছেন এ অঞ্চলের মানুষ। স্থানীয় চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রগুলোতেও এ ধরনের রোগীর আধিক্য লক্ষ্য করা যায়।
মোসাম্মৎ মায়া আক্তার এমনই একজন। শ্যামনগর সদরেই তাঁর বাড়ি। বেশ কয়েক মাস ধরে মূত্রনালির প্রদাহ নিয়ে যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। পেট ব্যথাসহ আরও কিছু সমস্যা হচ্ছিল। এলাকাবাসীর পরামর্শে সন্দেহবশত জরায়ুমুখ ক্যান্সারসংক্রান্ত পরীক্ষা করান। এতেই জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের অধ্যায়। তাঁর জরায়ুমুখে ক্যান্সারের জীবাণু পাওয়া যায়। এই রোগের পরিধি ও পরিণতির কথা ভেবে তিনি ব্যাপকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি না থাকলে তাঁর ছোট ছোট দুই সন্তানের কী হবে, জরায়ুমুখ কেটে ফেলতে হয় কিনা, কেটে ফেললে আদৌ সংসার আর টিকবে কিনা ইত্যাদি নানা প্রশ্ন আর দুশ্চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।
এই দুশ্চিন্তার পারদ বাড়তে থাকে যখন এলাকাবাসীর কয়েকজন তাঁকে জরায়ুমুখ কেটে ফেলার পরামর্শ দেন। এমন সময় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল শ্যামনগরের একজন স্বাস্থ্যকর্মী তাঁকে আশার আলো দেখান। তিনি জানান, জরায়ুমুখ কেটে ফেলার প্রশ্নই আসে না; বরং চিকিৎসা করেই সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সুযোগ আছে। তিনি ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে এখন সুস্থ জীবনযাপন করছেন।
শুধু মায়া আক্তারই নন; শ্যামনগরে এমন অনেক নারীই তাদের মূত্রনালির প্রদাহের সমস্যাসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে চুল ও ত্বকের ক্ষতি হয়। রং কালো হয়ে যায় ও দ্রুত বার্ধক্য চলে আসে। এ ছাড়া গর্ভপাত ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। সেখানকার নারী ও শিশুদের চিংড়ি পোনা ধরার জন্য ভাটার সময় ভোরে ও দিনের বেলায় প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা লবণাক্ত পানিতে থাকতে হয়। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্যসহ নারীরা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন।
দেশে প্রতিবছর কয়েক লাখ নারী জরায়ু ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকেন, তার মধ্যে বেশির ভাগই উপকূলীয় অঞ্চলের। নারীর জরায়ুসংক্রান্ত অসুখের তীব্রতা লবণাক্ততাপ্রবণ গ্রামগুলোতে বেশি। সে জন্য অল্প বয়সেই ওই এলাকার নারীরা জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। সাতক্ষীরার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে জরায়ুসংক্রান্ত রোগে ভুগছেন এমন নারীর সন্ধান পাওয়া যাবে।
উপকূলীয় অঞ্চলে নারী ও কিশোরীরা মাসিকের সময় ব্যবহৃত কাপড় ধুয়ে আবারও সেটি ব্যবহার করেন এবং লবণাক্ত পানিতে গোসলসহ দৈনন্দিন কাজের কারণে তাদের জরায়ুসংক্রান্ত রোগের উপস্থিতি অনেক বেশি। উপকূলের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই জরায়ুসংক্রান্ত রোগে নারীরা আক্রান্ত, ডাক্তাররা রোগীদের জরায়ু কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন। জরায়ু কেটে ফেলার পর অনেকের স্বামী তাদের ফেলে অন্যত্র বিয়ে করছেন, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে।
লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে নারীর গর্ভপাতের হার বেড়েছে। খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন উপজেলার অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণা অনুযায়ী, অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি গ্রহণের ফলে নারীর জরায়ু রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত, এমনকি অপরিণত শিশু জন্ম দেওয়ার হার বেড়েছে।
স্থানীয় নারীকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং সচেতনতার জন্য বিনামূল্যে গাইনি স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পের আয়োজন করে ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল শ্যামনগর। মূত্রনালির প্রদাহসংক্রান্ত সেবা এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সারসংক্রান্ত পরামর্শ ও সেবা দেওয়া হয়। এ ছাড়া স্থানীয়দের স্বাস্থ্যসেবা কার্ড দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে রোগীরা বিশেষ মূল্য ছাড় উপভোগ করতে পারেন।
ফ্রেন্ডশিপের হেড অব কমিউনিকেশন্স তানজিনা শারমিন বলেন, ‘স্থানীয় জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নানা ধরনের সমস্যার বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ফ্রেন্ডশিপ নিয়মিত কাজ করে যায়। তারই অংশ হিসেবে আমরা শ্যামনগরে এই ক্যাম্প করেছি।’
ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল শ্যামনগরের পরিচালক কর্নেল (অব.) ডা. মোজাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ছোট ছোট মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে থাকি। এবারের ক্যাম্পটি একটু ব্যতিক্রম এবং বড় পরিসরের। আমরা চাই রোগীরা এসে এই হাসপাতাল থেকে সর্বোচ্চ মানের সেবা গ্রহণ করবেন।’
- বিষয় :
- নারী
- উপকূলে লবণাক্ততা
