ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও মানবাধিকার

বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও মানবাধিকার
×

শিল্পকর্ম:: দ্য প্রিজনার [১৮৭৮]; শিল্পী : নিকোলা ইয়ারোশেঙ্কো

মো. রাশেদুল ইসলাম

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটি বহুল প্রচলিত রূপক গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। বনে হঠাৎ মহিষের পাল প্রাণভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াচ্ছে। তা দেখে শিয়াল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা এভাবে পালাচ্ছ কেন?’ মহিষ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘বনে পুলিশ এসেছে হাতি ধরতে।’ শিয়াল তো আকাশ থেকে পড়ল–‘কিন্তু তোমরা তো মহিষ, হাতি নও; তাহলে পালাচ্ছ কেন?’ মহিষের উত্তর, ‘আরে ভাই, পুলিশ যদি আমাকে হাতি ভেবে গ্রেপ্তার করে ফেলে, তবে আমি যে হাতি নই–তা প্রমাণ করতেই তো আমার পুরো জীবন পার হয়ে যাবে!’

গল্পটি নিছক কৌতুক হলেও আমাদের দেশের বর্তমান বিচারব্যবস্থার এক করুণ ও বাস্তব চিত্র এটি। একবার যদি কেউ ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার জালে জড়িয়ে পড়েন, তবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার আগেই তাঁর জীবনের সোনালি সময়গুলো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে হারিয়ে যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে কারাগারেই জীবনের ইতি ঘটে যায়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কারা হেফাজতে বন্দি মৃত্যুর সংখ্যা ৬১। এর মধ্যে বিচারাধীন বন্দি ৩৭ জন। গত বছর কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ১০৭ জনের। এর মধ্যে বিচারাধীন বন্দি ছিলেন ৬৯ জন। ২০২৪ সালে কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ৬৫ জনের। এর মধ্যে বিচারাধীন বন্দি ছিলেন ৪২ জন।

বর্তমানে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা ৮৩ থেকে ৮৫ হাজারের মতো। ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের কাছাকাছি এই বন্দিদের অধিকাংশই হলেন বিচারাধীন বন্দি বা ‘আন্ডারট্রায়াল প্রিজনার’। এদের মধ্যে একটি বড় অংশকে কেবল রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে বন্দি করে রাখা হয়েছে। অথচ তাদের বিরুদ্ধে নেই কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। 

ফৌজদারি কার্যবিধির সর্বশেষ সংশোধনী অনুযায়ী পুলিশ রিপোর্ট দেওয়ার জন্য ৬০ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। এ ছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট আদালত বা বিশেষ আদালতের ক্ষেত্রে ১৮০ দিন এবং দায়রা জজ আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। বাস্তবে এই আইনি সময়সীমা কেবল কেতাবেই বন্দি। মাসের পর মাস এবং বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও পুলিশ রিপোর্ট দাখিল হয় না এবং বিচার প্রক্রিয়াও সমাপ্ত হয় না। আইনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলে জামিন বা বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাওয়া একজন নাগরিকের আইনি অধিকার। সেই অধিকার আজ পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে। 

আমাদের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, আইন অনুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে এবং ৩৫(৫)-এ বলা আছে, নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না। বিচারিক প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই যদি কাউকে বছরের পর বছর কারাভোগ করতে হয়, তবে তা কি সংবিধানের চরম লঙ্ঘন নয়?

বিনা বিচারে হারিয়ে যাওয়া সোনালি সময়
আইনের অপব্যবহারের কারণে নিঃস্ব হচ্ছেন অসংখ্য সাধারণ মানুষ। সিলেটের ফজলু মিয়া মানসিক ভারসাম্যহীন একজন ব্যক্তি, যার কোনো অপরাধই ছিল না, তাঁকে বিনা বিচারে জেলের চার দেয়ালে কাটাতে হয়েছে দীর্ঘ ২২ বছর সাত মাস! পৃথিবীর আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত এই মানুষটির জীবনের দায়ভার কে নেবে?

কমলা বানু নামে আরেক নারীর গল্পও একই রকম হৃদয়বিদারক। উচ্চ আদালত তাঁকে মামলা থেকে খালাস দিলেও, সেই আদেশের কপি যথাসময়ে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে খালাস পাওয়ার পরও তাঁকে অতিরিক্ত সাত বছর কারাবাস করতে হয়েছে। মিষ্টন মিয়া নামে এক আসামির গল্প আরও ভয়াবহ। ১১ বছর আগেই তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন, অথচ নথিপত্রের জটিলতায় তাঁকে অতিরিক্ত ১১ বছরসহ মোট ২৪ বছর কারাগারে কাটাতে হয়। তিনি যখন গ্রেপ্তার হন তখন একজন কম বয়সী নারী তাঁকে বিদায় জানায় এবং তিনি যখন মুক্তি পান তখন একই বয়সী আরেকজন নারী তাঁকে কারাগার থেকে রিসিভ করতে এসেছেন, প্রথম জন তাঁর মেয়ে এবং দ্বিতীয় জন তাঁর নাতনি। বিনা অপরাধে একটি মানুষের জীবনে পুরো একটি প্রজন্মের শূন্যতা–এর চেয়ে বড় অবিচার আর কী হতে পারে?

মামলার পাহাড় ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা
বিনা বিচারে আটকে থাকা মানুষের বেশির ভাগই আর্থিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন কারাগারে, তখন সংসারের ঘানি টানতেই পরিবারগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্রথম দিকে ধারদেনা বা গবাদি পশু বিক্রি করে আইনজীবী নিয়োগ করলেও, একপর্যায়ে তাদের আর সেই সামর্থ্য থাকে না। ফলে মামলার নথিপত্র আদালতের ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে যায়। সেই সঙ্গে কালের গহ্বরে হারিয়ে যান বিচারপ্রার্থীরা। বিচার বিভাগের কাঁধে জমে থাকা মামলার পাহাড় এই দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ।

২০১৮ সালে উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের সহায়তায় আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি বিচার বিভাগীয় জরিপ ‘জাস্টিস অডিট’ অনুযায়ী, ওই সময়ে দেশে বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ৩৭ লাখ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন কোনো মামলা না হলেও বিদ্যমান বিচারক ও কাঠামো দিয়ে এই মামলাগুলো নিষ্পত্তি করতে অন্তত ১৮ বছর সময় লাগবে। বর্তমানে এই মামলার সংখ্যা বেড়ে প্রায় অর্ধকোটিতে (৪৮ লাখ) দাঁড়িয়েছে। আমাদের আইনি প্রক্রিয়া যেন এক গোলকধাঁধা, যেখানে একটি মামলা থেকে আপিল, রিভিশন মিলায়ে কমপক্ষে আরও চার থেকে পাঁচটি মামলার জন্ম হয়, আর একজন বিচারপ্রার্থী তাতে ঘুরপাক খেতে থাকেন।

সমাধান কোথায়
বিচারব্যবস্থার এই অচলায়তন ভাঙতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছা। আইন বা কাঠামোর চেয়েও বেশি জরুরি হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। এ ছাড়াও বিচারাধীন মামলার সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা, অপরাধের ধরন ও মামলার বয়স অনুযায়ী পৃথক করা, যেসব মামলায় আসামি কারাগারে আছে সেসব মামলা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া, আদালতগুলোয় মামলার সমবণ্টন নিশ্চিত করা, অপরাধ ও মামলার ধরন অনুযায়ী আপিল এখতিয়ার সীমিত করা, ছোট ছোট অপরাধের ক্ষেত্রে দোষ স্বীকারকে উৎসাহিত করা এবং দোষী ব্যক্তিকে কারাদণ্ড না দিয়ে প্রবেশনে দেওয়া, যেন পরিবার তথা সমাজের উন্নয়নে কাজ করে। 

অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কারাগারগুলোকে সংশোধনাগার হিসেবে গড়ে তোলা, বন্দিদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার ব্যবস্থা করা; অপরাধের ধরন বিবেচনায় কারাবন্দিদের পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা করা যেন ছোট অপরাধী বড় অপরাধীর সঙ্গে মিলিত হয়ে অপরাধ দক্ষতা বাড়াতে না পারে। বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, আদালতে আসামির উপস্থিতিতেও প্রযুক্তির ব্যবহার করা আবশ্যক। বিচারসংশ্লিষ্ট জনবলকে প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা দরকার।   

আইনগত সহায়তা প্রদান আইন-২০২৬ অনুযায়ী, ছোট ছোট বিরোধ বাধ্যতামূলক মামলা পূর্ব-মধ্যস্থতার বিধান রাখা হয়েছে এবং ফৌজদারি কার্যবিধির সর্বশেষ সংশোধনীতে মীমাংসাযোগ্য মামলাগুলো মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির বিধান রাখা হয়েছে। সে অনুযায়ী  ১২-১৩টি জেলায় পাইলট প্রকল্প চলছে, তা আশাব্যঞ্জক। এ প্রক্রিয়ায় যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে হিতে বিপরীত হতে পারে, যা মামলার দীর্ঘসূত্রতা আরও বাড়াতে পারে। এ ক্ষেত্রে দক্ষ মিডিয়েটর প্যানেল প্রস্তুত করা, প্যারালিগ্যাল নিযুক্তির মাধ্যমে মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া গতিশীল করা এবং বিচারপ্রাপ্তি সহজ করা যেতে পারে। এ ছাড়া মধ্যস্থতায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন বেসরকারি সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। বিপুলসংখ্যক মামলার জট নিরসনে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। 

এ বিষয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভালো উদাহরণ অনুসরণ করা যেতে পারে, বিশেষ করে মালয়েশিয়ার উদাহরণ আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। একসময় বিপুল মামলার জটে থাকা মালয়েশিয়া বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও মামলার সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিজেদের মামলাজট নিরসনে সক্ষম হয়েছে। 

আইনের শাসন শুধু বইয়ের পাতায় থাকলে চলবে না, তা মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হতে হবে। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দিন শেষে একজন সাধারণ মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে চায় এবং কোনো কারণে অভিযুক্ত হলেও একটি স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচারের নিশ্চয়তা চায়। মহিষকে যেন হাতি প্রমাণের ভয়ে সারাজীবন দৌড়াতে না হয়–রাষ্ট্রকে সেই অভয় ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: আইনজীবী ও উপপরিচালক (মামলা), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)

আরও পড়ুন

×