নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিন
শৃঙ্খল ভাঙার পথিকৃৎ
নেলসন ম্যান্ডেলা [জন্ম: ১৮ জুলাই ১৯১৮; মৃত্যু: ৫ ডিসেম্বর ২০১৩]
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘রোলিহ্লাহ্লা’ নামের আক্ষরিক অর্থ হলো ‘বিপত্তি সৃষ্টিকারী’। কিন্তু নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলার জীবন কেবল কোনো সাধারণ ঝামেলা বা বিশৃঙ্খলার গল্প নয়; তাঁর জীবন এক অবিচল ন্যায়বিচার ও মানবিকতার মহাকাব্য। তিনি নিছক শাসকের পরিবর্তন চাননি; বরং তিনি অন্যায়ের শিকড় ধরে টান দিয়েছিলেন। বর্ণবাদী ব্যবস্থার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করেছিলেন এবং সাম্য ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে পাহাড়ের মতো অটল থেকেছিলেন। এভাবেই তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘শান্তিপ্রণেতা’।
নেলসন ম্যান্ডেলা কেবল একজন দক্ষিণ আফ্রিকান বর্ণবাদবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট, আইনজীবী বা রাজনৈতিক বন্দি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি যুগের কণ্ঠস্বর। বর্ণবাদের নির্মম শৃঙ্খল ভাঙার সংগ্রামে তাঁকে জীবনের অমূল্য ২৭টি বছর কাটাতে হয়েছিল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। কারাগারের গরাদ তাঁর আত্মাকে বন্দি করতে পারেনি। বর্ণবাদী সরকারের পতনের পর ১৯৯৪ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।
১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তাঁর শাসনামল ছিল একটি বিভক্ত জনগোষ্ঠীকে পুনর্গঠন, গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন এবং সামাজিক সংস্কারের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। প্রতিশোধের বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ক্ষমার পথ। তাঁর এই অসামান্য নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ, ১৯৯৩ সালে এফডব্লিউডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। ম্যান্ডেলা আজ বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার, ক্ষমা এবং অবিচল নেতৃত্বের এক সর্বজনীন প্রতীক।
ম্যান্ডেলার এ কালজয়ী আদর্শকে সম্মান জানাতেই প্রতিবছর ১৮ জুলাই তাঁর জন্মদিনে উদযাপিত হয় ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত এই দিনটি শুধু তাঁর জীবনকে স্মরণ করার জন্য নয়; বরং তাঁর মূল্যবোধগুলো কীভাবে আজকের পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিক, তা গভীরভাবে উপলব্ধি করার দিন। ম্যান্ডেলা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রত্যেক মানুষেরই বিশ্বকে বদলানোর ক্ষমতা রয়েছে। তাঁর নিরলস সংগ্রামী জীবনের প্রতি সম্মান জানিয়ে, এই দিনে মানুষকে অন্তত ৬৭ মিনিট সমাজের কল্যাণে ব্যয় করার আহ্বান জানানো হয়।
ম্যান্ডেলার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল কিছু শাশ্বত নীতি–শিক্ষা, সম্প্রীতি, উদ্যোগ, নেতৃত্ব এবং মানুষের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। এগুলো কোনো নিছক তাত্ত্বিক ধারণা ছিল না, বরং তাঁর জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত। ম্যান্ডেলা বিশ্বাস করতেন, পরিস্থিতি বা পারিপার্শ্বিকতা যেন কখনোই মানুষের সুযোগের সীমানা নির্ধারণ না করে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘শিক্ষাই হলো সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র, যা দিয়ে তুমি বিশ্বকে বদলে দিতে পার।’ এ সত্যকেই ধারণ করে, শিক্ষা কীভাবে মানুষের সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে এবং সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে শেখায়।
আজকের বিশ্ব, যেখানে পরাশক্তিগুলো যুদ্ধে লিপ্ত, যেখানে ফিলিস্তিন সরাসরি বর্ণবাদে আক্রান্ত, গণহত্যার শিকার; সেখানে আজও তাঁর এই দর্শন ও বর্ণবাদবিরোধী লড়াই জীবন্ত। ম্যান্ডেলার আদর্শ আজও বহমান এবং সত্যিকারের পরিবর্তন আসে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই।
ম্যান্ডেলার উত্তরাধিকার কোনো দূরের অতীত নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তে, মানুষের প্রতি আমাদের আচরণে এবং চারপাশের চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় উপস্থিত। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, নেতৃত্ব কেবল ক্ষমতা বা পদে নয়, বরং এর উদ্দেশ্য মানুষের সেবায় নিহিত। ১৮ জুলাই, নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস– মূলত তা ধারণের আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবর্তন শুরু হয় ঠিক সেখান থেকেই, যেখানে আমরা দাঁড়িয়ে আছি; আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট ইতিবাচক কাজের মাধ্যমেই তৈরি হতে পারে এক মানবিক ও সুন্দর পৃথিবী।
- বিষয় :
- নেলসন ম্যান্ডেলা
- শাহেরীন আরাফাত