ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

গ্রাফিক ডিজাইনের ‘মুকুটহীন রানী’

গ্রাফিক ডিজাইনের ‘মুকুটহীন রানী’
×

ক্যানভা’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মেলানি পারকিন্স

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৩ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান ডিজিটাল যুগে একটি চমৎকার প্রেজেন্টেশন, সামাজিক মাধ্যমে আকর্ষণীয় কনটেন্ট কিংবা প্রফেশনাল সিভির কথা ভাবতেই চোখের সামনে সবার আগে যে নামটি ভেসে ওঠে, তা হলো ‘ক্যানভা’। মাত্র এক দশকের ব্যবধানে গ্রাফিক ডিজাইনের চিরাচরিত জটিল ব্যাকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এটি নান্দনিকতাকে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এই যুগান্তকারী পরিবর্তনের নেপথ্য কারিগর ক্যানভার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মেলানি পারকিন্স। তাঁর জীবনের গল্পটি সিলিকন ভ্যালির আর দশটা গতানুগতিক স্টার্টআপের মতো নয়; এটি প্রবল ইচ্ছাশক্তি, লিঙ্গবৈষম্যের দেয়াল জয় করা এবং মুনাফার চেয়ে মানবতাকে ঊর্ধ্বে রাখার এক অনন্য উপাখ্যান।

পুঁজিবাদের এই যুগে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যখন সফটওয়্যার লাইসেন্স বা সাবস্ক্রিপশন ফির নামে পকেট কাটতে ব্যস্ত, মেলানি তখন হেঁটেছেন স্রোতের একেবারে বিপরীতে। চাইলেই তিনি ক্যানভার প্রিমিয়াম টুলস শিক্ষার্থীদের কাছে বিক্রি করে রাতারাতি ধনকুবের হতে পারতেন। শিক্ষাকে ব্যবসার হাতিয়ার না বানিয়ে, বিশ্বের লাখো শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য ক্যানভাকে তিনি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। এই বিরল মানসিকতাই আজ তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে গ্রাফিক ডিজাইনের ‘মুকুটহীন রানী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার পার্থে জন্ম নেওয়া মেলানির মা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা এবং বাবা ফিলিপিনো-শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান ইঞ্জিনিয়ার। হাইস্কুলে পড়ার সময় কনকনে ঠান্ডায় ভোর সাড়ে ৪টায় ফিগার স্কেটিংয়ের কঠোর অনুশীলন তাঁকে শিখিয়েছিল–লক্ষ্য যত পিচ্ছিল বা কঠিনই হোক, নিজের পায়ে স্থির থাকতে হয়। মাত্র ১৪ বছর বয়সেই তাঁর ভেতরে উদ্যোক্তা হওয়ার জেদ চাপে; নিজ হাতে স্কার্ফ বুনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি শুরু করেন তিনি।

উচ্চশিক্ষার জন্য ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ায় ভর্তি হয়ে নিজের খরচ জোগাতে সহপাঠীদের গ্রাফিক ডিজাইন (ফটোশপ, ইনডিজাইন) শেখানো শুরু করেন মেলানি। পড়াতে গিয়েই তিনি একটি যুগান্তকারী সমস্যার সম্মুখীন হন। তিনি খেয়াল করেন, প্রচলিত ডিজাইন সফটওয়্যারগুলো এতটাই জটিল যে সামান্য কিছু বেসিক টুলস শিখতেই একটি সেমিস্টার পার হয়ে যায়, আর সেগুলোর দামও আকাশছোঁয়া।

মেলানি স্বপ্ন দেখলেন এমন এক সহজ প্ল্যাটফর্মের, যা হবে অনলাইনভিত্তিক, ড্র্যাগ-অ্যান্ড-ড্রপ পদ্ধতির এবং কোলাবোরেটিভ। ২০০৭ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তৎকালীন বয়ফ্রেন্ড (বর্তমান স্বামী) ক্লিফ ওব্রেখটকে নিয়ে মায়ের ড্রয়িংরুমে শুরু করেন ‘ফিউশন বুকস’ নামের একটি স্কুল ইয়ারবুক ডিজাইনের স্টার্টআপ। গভীর আর্থিক সংকটে মায়ের রাত জেগে প্রিন্টারের কালি পাহারার সেই দিনগুলো পেরিয়ে উদ্যোগটি অভাবনীয় সফলতা পায় এবং নিউজিল্যান্ড ও ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়ে।

এই সাফল্য তাঁকে পুরো বিশ্বের জন্য ডিজাইনকে সহজলভ্য করার সাহস জোগায়। এর জন্য প্রয়োজন বিপুল ফান্ডিং। খনিজশিল্পের শহর পার্থের এক সাধারণ তরুণীর জন্য সিলিকন ভ্যালির দরজা খোলা মোটেও সহজ ছিল না। তখনকার দিনে নারী উদ্যোক্তারা মোট ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাত্র ২ শতাংশ পেতেন। বিনিয়োগকারীদের দরজায় কড়া নেড়ে মেলানি ১০০ বারেরও বেশি সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হন! তবু তিনি দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না।

অবশেষে ২০১০ সালের দিকে বিখ্যাত বিনিয়োগকারী বিল টাইয়ের মনোযোগ কাড়তে মেলানি এক দুঃসাহসী কৌশল নেন। টাইয়ের কাইটসার্ফিংয়ের প্রতি দুর্বলতা জানতে পেরে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রবাল প্রাচীরে ধাক্কা খেয়েও তিনি এই বিপজ্জনক সামুদ্রিক খেলাটি আয়ত্ত করেন। এরপর বিল টাইয়ের সামনে ‘ক্যানভাস শেফ’ নামে পিৎজা বানানোর রূপকে নিজের আইডিয়া উপস্থাপন করেন। তাঁর এই অদম্য জেদ ও সৃজনশীলতা শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মুগ্ধ করে।

২০১২ সালে গুগলের সাবেক ইঞ্জিনিয়ার ক্যামেরন অ্যাডামস যুক্ত হওয়ার পর ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যানভার যাত্রা শুরু হয়। ক্যানভার সবচেয়ে বড় ম্যাজিক ছিল মানুষের ‘ক্লিক-ভীতি’ দূর করা। এর ইন্টারফেস এমনভাবে সাজানো হয়, যেন একদম আনাড়ি কেউ প্রথম দিনেই একটি সুন্দর ডিজাইন তৈরি করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। আজ ক্যানভা বিশ্বের ১৯০টিরও বেশি দেশে প্রতি মাসে ১৭০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ ব্যবহার করছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার।

সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেও মেলানি তাঁর মূল ভিশন ভোলেননি। ২০১৯ সালে চালু করা ‘ক্যানভা ফর এডুকেশন’-এর মাধ্যমে বিশ্বের সব প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি স্কুলকে ক্যানভার প্রিমিয়াম ভার্সন আজীবন বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ১০ কোটিরও বেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী এটি ব্যবহার করছে। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালে মেলানি ও ক্লিফ দম্পতি ‘দ্য গিভিং প্লেজ’-এ স্বাক্ষর করে ক্যানভার মালিকানার প্রায় ৩০ শতাংশ (যা বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য) মানবকল্যাণে দান করার যুগান্তকারী ঘোষণা দেন।

বৈশ্বিক এই উদ্যোগের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশেও। সরকারের এটুআই প্রোগ্রামের অধীনে ‘শিক্ষক বাতায়ন’-এর লক্ষাধিক শিক্ষক এখন মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের জন্য ক্যানভা ব্যবহার করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে ক্যানভা প্রো ব্যবহার করে নিজেদের প্রস্তুত করছেন। বাংলা ফন্ট এবং দেশীয় উৎসবের টেমপ্লেট যুক্ত থাকায় দেশের লাখো তরুণ আজ ক্যানভা দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ডিজাইন, ইউটিউব থাম্বনেইল বা লোগো বানিয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। 

আরও পড়ুন

×