ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

দেশি মুরগি পালনে ভাগ্যবদল

দেশি মুরগি পালনে ভাগ্যবদল
×

নিজের দেশি মুরগির খামারে জোবেদা খাতুন

জালাল উদ্দিন

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দারিদ্র্য আর জীবনের রূঢ় বাস্তবতা একসময় আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল জোবেদা খাতুনকে। স্বামী আর ছেলেমেয়েদের নিয়ে অভাবের সংসারে ছিলেন দিশেহারা। তবে এখন সে অবস্থা আর নেই। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার সেনগাঁতী গ্রামের এই নারী নিজ চেষ্টায় আর উদ্ভাবনী পদ্ধতির প্রয়োগে আজ এলাকার নারীদের জন্য এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত। প্রতি মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা আয় করে জোবেদা এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বী। তাঁর এ অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে দেশি মুরগি পালনের আধুনিক পদ্ধতি–‘কুপ মডেল’। 
জোবেদার এই বদলে যাওয়ার গল্পটা শুরু হয় স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘প্রোগ্রাম ফর পিপলস ডেভেলপমেন্ট’-এর (পিপিডি) স্পেশাল প্রোগ্রাম-ডেভেলপমেন্টের (এগ্রিকালচার) এক কর্মকর্তার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে। তাঁর পরামর্শে জোবেদা সেনগাঁতী পশ্চিমপাড়া মহিলা সমিতিতে যুক্ত হন। এর কিছুদিন পর পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পিপিডি থেকে ক্ষুদ্র পরিসরে ঋণ গ্রহণ করেন তিনি। 

আগে থেকেই সনাতন পদ্ধতিতে দেশি মুরগি পালনের কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিল জোবেদার। তাতে মড়ক আর বন্যপ্রাণীর আক্রমণে লোকসানই হতো বেশি। পিপিডি তাঁকে সনাতন পদ্ধতির বদলে আধুনিক ‘কুপ মডেল’ বা মাচা পদ্ধতিতে মুরগি পালনের পরামর্শ দেয়। শুরুতে তাঁকে দুদিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং বিনামূল্যে ১০০টি দেশি মুরগির বাচ্চাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ দেওয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় জোবেদা খাতুনের ঘুরে দাঁড়ানো আর সামনের দিকে অবিরাম পথচলা। 
কুপ মডেল বা মাচা পদ্ধতি হলো দেশি মুরগি পালনের একটি আধুনিক ও নিয়ন্ত্রিত বা আধা-নিবিড় ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় মাটি থেকে কিছুটা উঁচুতে ফ্লোর বা মাচা তৈরি করা হয় এবং খামারের চারপাশে মুরগি চরে বেড়ানোর জন্য নেট বা জাল দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গা ঘেরা থাকে। 

বিজ্ঞানসম্মত এই পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ‘বায়োসিকিউরিটি’ বা জৈব নিরাপত্তা। নেটের ঘেরাটোপের কারণে মুরগিগুলো শিয়াল, বেজি, চিল বা বিড়ালের মতো প্রাণীর আক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদে থাকে। অন্যদিকে, বাইরের বন্য বা পরিযায়ী পাখির সংস্পর্শে আসতে না পারায় এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর মতো প্রাণঘাতী রোগের সংক্রমণ থেকে খামার সুরক্ষিত থাকে। 
জোবেদা খাতুন এই মডেলে আরও একটি চমৎকার কাজ করেছেন। মুরগির চরে বেড়ানোর ঘেরা জায়গায় তিনি বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করছেন। মুরগিগুলো প্রাকৃতিকভাবে এই সবজি, ঘাস ও কীটপতঙ্গ খেয়ে বড় হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন মুরগির প্রাকৃতিক খাদ্য নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে বাজার থেকে কেনা রেডিমেইড খাবারের খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
বর্তমানে জোবেদার খামারে দেশি মুরগির সংখ্যা চার শতাধিক। প্রতিদিন তিনি বাণিজ্যিকভাবে ডিম ও মুরগি বিক্রি করেন। সব খরচ বাদ দিয়ে মাস শেষে তাঁর মাসিক আয় দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ব্রয়লার বা সোনালি মুরগির তুলনায় বাজারে দেশি মুরগির চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি হওয়ায় তাঁর মুনাফার পরিমাণও আশাব্যঞ্জক। এখন আর তাঁকে মুরগি নিয়ে হাটে যেতে হয় না, স্থানীয় পাইকাররা সরাসরি খামার থেকেই ডিম ও মুরগি কিনে নিয়ে যান। এই আয়ে সংসারে কেবল সচ্ছলতাই ফেরেনি, দুই ছেলে ও এক মেয়েকেও ভালোভাবে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। 
জীবন-সংগ্রামে হার না মানা জোবেদা বলেন, ‘স্বামীর রোজগারের পাশাপাশি এখন আমিও সংসারের খরচে সমান অংশীদার।’ আজ তিনি সেনগাঁতী গ্রামে শুধু একজন সফল খামারিই নন; বরং তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন আশপাশের অনেকেই। উল্লাপাড়া উপজেলার সেনগাঁতী গ্রামের খাদিজা খাতুন, চর সাতবাড়িয়া গ্রামের রাবেয়া, সোনা, লায়লী এবং এনায়েতপুর গ্রামের মুক্তি ও আঁখি খাতুনসহ অনেকেই এখন অল্প পুঁজিতে ‘কুপ মডেল’ খামার গড়ে তুলছেন।

পিপিডি’র প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রাসেল জানান, ‘কুপ মডেল পদ্ধতিতে স্বল্প পুঁজিতে এবং কম ঝামেলায় দেশি মুরগি পালন করা যায়। খাঁচায় বা আবদ্ধ অবস্থায় দেশি মুরগির বাচ্চার নিবিড় পরিচর্যা করা হয়। সময়মতো দুটি রানিক্ষেত, দুটি গামবোরো এবং একটি ফাউল কলেরার টিকা নিশ্চিত করতে পারলে রোগবালাইজনিত মৃত্যুর হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। ফলে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ বাচ্চাই ডিম বা মাংস দেওয়ার উপযোগী সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকে।’ 

আরও পড়ুন

×