ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পৃথ্বীলার গহনার রাজ্য

পৃথ্বীলার গহনার রাজ্য
×

পৃথ্বীলা ও তাঁর বানানো গহনা

আফরোজা চৈতী

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩৭ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৫:৫৯

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে পাস করে যখন পৃথ্বীলা শাহনেওয়াজ গহনা নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন অনেকেই তাঁর এই পুরোনো কাপড়, দেশি ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করে গহনা বানানোকে ভালো চোখে দেখেননি। তারা বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি তবে কী কাজে এলো? পরিবারের অন্য বোনেরা বড় বড় জব করছেন, ক্লাসমেট বন্ধুরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হচ্ছেন, তখন কিনা তিনি কাপড়, কড়ি, দড়ি নিয়ে বেকার সময় কাটাচ্ছেন!

উত্তরটা দিয়েছিলেন পৃথ্বীলার জীবনসঙ্গী। তিনি বলেছিলেন, চাকরি করার চেয়ে চাকরি দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাটা অনেক বেশি সম্মানের। পেশায় ব্যাংকার শাহনেওয়াজ হক পাটোয়ারী একজন বিনয়ী ও আন্তরিক মানুষ। সংসার, দুই সন্তান সামলে পৃথ্বীলার উদ্যোক্তা হওয়ার লড়াইয়ে তিনিই সবসময় পাশে থেকেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় যেখানে সন্তান, সংসার, স্বামী সব সামলে নারীর কাজে মনোযোগ দেওয়াটাই ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে পৃথ্বীলার যুদ্ধটা অনেকটাই সহজ করে দিয়েছেন তাঁর জীবনসঙ্গী। দুই সন্তান সামলে ক্লান্ত হয়ে গেলে তিনিই স্ত্রীর বড় ভরসার স্থল হন। 

পৃথ্বীলা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর ক্রাফটিংয়ের পরতে পরতে এর ছোঁয়া পাওয়া যায়। ইতিহাসের স্বর্ণ সময় যেন তিনি খোদাই করে তুলে আনেন আঙুলে সুতার বুননে। কী নেই তাঁর গহনায়? তিনি গহনার উপস্থাপনায় এনেছেন বাঙালিয়ানা। পাখির সূচিকর্মের আদলে যেন এই গহনা বিরহী প্রেয়সীর কথা জানান দেয়। ফেলে দেওয়া লাখ টাকার জামদানি শাড়ির পাড় তিনি অলঙ্কারের মর্যাদা দিয়ে তরুণীর কণ্ঠহার করেছেন। তাঁর গহনার একটি বড় বিষয় হলো– তিনি ফেলে দেওয়া কাপড়, পুঁতি, শাড়ির পাড় ইত্যাদি দিয়ে গহনা বানান। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো–তাঁর গহনা বানানোর জন্য ব্যবহার করা প্রতিটি উপাদান তিনি সংগ্রহ করেন আমাদের দেশীয় উপকরণ থেকে। পাটের দড়ি থেকে শুরু করে নকশিকাঁথার বর্ণিল কাজ। তাঁর গহনায় থাকে নিজস্ব সূচিকর্ম। যেখানে বুননে বুননে তাঁর গহনায় তুলে আনেন আমাদের ঐতিহ্যর গন্ধমাখা সব গল্প গাঁথার বর্ণনা। কড়ির সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর হাতের কাজে গহনা হয়ে উঠে একেকটি গল্প। 

শুরু হয়েছিল ছোট্ট সূচিকর্ম দিয়ে আর আজ সেটি রীতিমতো একটি বড় দোকানে পরিণত হয়েছে। খুব ছোট্ট পরিসরে বাসায় বসে কাজ করেন পৃথ্বীলা। তবে কাজের চাপ যখন বেশি হয়, তখন পার্টটাইম কাউকে সাহায্যকারী হিসেবে নিয়ে নেন। তিনি জানান, তাঁর এ গহনার পরিভ্রমণে অনুপ্রেরণা হিসেবে সবসময়ই কাজ করেছে একাডেমিক পড়াশোনা। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে পড়ার সময় তিনি দেখেছেন, এই বাংলার রয়েছে অনেক ধরনের আদি মোটিফ আর অলংকরণের এক দারুণ গল্প। তিনি তাঁর গল্পকে তুলে এনেছেন গহনার পরতে পরতে। এখন তাঁর গ্রাহক তালিকায় সরকারি, বেসরকারি মহল থেকে বিদেশি নাগরিকরাও রয়েছেন। 

পৃথ্বীলার মতে, উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য দরকার কঠোর পরিশ্রম। এর সঙ্গে অবশ্যই ধৈর্য ও অধ্যবসায় যোগ করতে হবে। নিজের মননশীলতা, শিক্ষা, দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে।

আরও পড়ুন

×