পারিবারিক নির্যাতন
রুখে দাঁড়ানোর সংগ্রাম
অলংকরণ :: অরবিন্দ হালদার
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৪ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ২১:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
২৫ নভেম্বর ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’। নারীর ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এ দিবসের সূচনা। এমন এক সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশে পরিবারের মাঝেও নারী নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি প্রকট সামাজিক বাস্তবতা। স্ত্রীকে ‘মৃদু শাসন’ করার নামে এই সহিংসতার এক ধরনের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাও আছে; যা সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিকতারই বহিঃপ্রকাশ। নথিভুক্ত সহিংসতার সংখ্যা গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে আরও বেড়েছে। এ সংখ্যাগুলো কেবল আক্রান্তের বিস্তারই তুলে ধরে না, বরং আইন ও সামাজিক প্রতিকারের মধ্যে যে গভীর ব্যবধান রয়েছে, তারও প্রমাণ দেয়।
রীতা (ছদ্মনাম) রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। উচ্চশিক্ষিত ও ভালো বেতনের চাকরি করলেও নিজের উপার্জনে তাঁর অধিকার সীমিত। রীতার অনুমতি ছাড়াই স্বামী তাঁর বেতনের বেশির ভাগ অংশ কখনও নিজের ব্যবসায় বিনিয়োগ করতেন। কখনও দেবর-ননদের হাত খরচ হিসেবে, কখনও দুই সন্তানের পড়াশোনার ব্যয়। রীতার ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য সামান্য অর্থও থাকত না। সমাজ-সংসারের দিকে তাকিয়ে রীতা সব মেনে নেন।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলায় বাড়ি লাইলি বেগমের (ছদ্মনাম)। বিয়ের দুই মাস পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে তাঁর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন শারীরিক, মৌখিক ও মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন শুরু করে। এক পর্যায়ে যৌতুক না পেয়ে খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় লাইলিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে আবারও ওই নিপীড়কদের কাছে ফিরে যাওয়া নিয়ে দেনদরবার করছে লাইলির পরিবার। এ ঘটনায় কোনো মামলা পর্যন্ত হয়নি।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘অপরাধীরা জানে যে তারা পার পেয়ে যাবে। আমরাও মনে করি, আমাদের সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেভাবে গেড়ে বসেছে এর ফলে অপরাধীরা বারবার নৃশংস অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। নিম্নআয়ের নারীরা আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন। কারণ, তাদের পক্ষে স্বামীর ঘর ছেড়ে বের হয়ে আসা সম্ভব হয় না। এমনকি মা-বাবাও সামাজিক মর্যাদার ভয়ে তাদের নির্যাতিত মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারেন না। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা পারিবারিক সহিংসতাকে একটি চক্রাকারে চলতে সাহায্য করে।’
বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস)-২০২২ অনুযায়ী, যৌন সম্পর্কে রাজি না হওয়াকে সমাজে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে প্রহার করার একটি ‘যৌক্তিক কারণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা যৌন জবরদস্তি ২০১০ সালের পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন অনুযায়ী অপরাধ।
মানবাধিকার আইনজীবী ও বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) উপদেষ্টা সালমা আলী বলেন, ‘যখন একজন নারী প্রতিবাদ করার সুযোগ পান না; আবার কোথাও সঠিক কাউন্সেলিং বা সমর্থন পান না, তখন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এ নারী একসময় ভয়ানক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতে পারেন। এ সংকটের মূল সমাজের গভীরে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে একজন নারী বা মেয়েকে মানুষ হিসেবে নয়, বরং কেবল ‘নারী’ হিসেবে দেখা হয়। বিয়ের পর সহিংসতা ও ঘরবন্দি জীবন তাঁর ওপর যে মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, পরবর্তী জীবনেও সেই ট্রমা থেকে যেতে পারে।’
গত বছর আর চলতি বছরে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যের একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, প্রকাশিত তথ্যের মধ্যেও গত বছর থেকে চলতি বছরে পারিবারিক সহিংসতা অনেকটাই বেড়েছে। যদিও অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে অনেক ঘটনা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত বছরের প্রথম ১০ মাসের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে ৭৬টি অতিরিক্ত পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে। গত বছর মোট নথিভুক্ত ঘটনা ছিল ৪২৭টি, চলতি বছরে তা বেড়ে হয়েছে ৫০৩টি। এর মধ্যে স্বামীর হাতে হত্যার সংখ্যা ২০২৪ সালের ১৫৫ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৯৮ জনে পৌঁছেছে। একইভাবে স্বামীর পরিবারের হাতে হত্যার সংখ্যাও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে–২৮ থেকে ৫৭। এটি পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সহিংসতার তীব্রতা বৃদ্ধি এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতার গভীর ব্যর্থতা নির্দেশ করে। পারিবারিক নির্যাতনের কারণে আত্মহত্যা করার ঘটনাও বেড়ে ১৪৪-এ পৌঁছেছে, যা সহিংসতার দীর্ঘমেয়াদি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং ভুক্তভোগীর অসহায়ত্বকে তুলে ধরে।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন হক বলেন, ‘আইনগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি, নারী নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা ও অভিভাবকত্ব সম্পর্কিত আইনের বাস্তবায়নেও গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আদালতের অপর্যাপ্ত সংখ্যা, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং নারীবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে নারীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। অর্থাৎ কেবল আইন প্রণয়ন করাই যথেষ্ট নয়; বরং এর প্রয়োগের জন্য সহায়ক বিচারিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।’
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ জরিপ (২০২৪) অনুযায়ী, দেশের ৭০ শতাংশ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার শারীরিক, যৌন, মানসিক ও অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হন। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) কর্তৃক পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, আইন বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন– পুলিশ, আইন ও বিচার বিভাগ) পারিবারিক সহিংসতাকে একটি ‘তুচ্ছ সমস্যা’ হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের মধ্যে এমন মনোভাব প্রবল–এটি সমাধানে বিচার বিভাগ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সময় ব্যয় করার চেয়ে পারিবারিকভাবে সমাধান করা উচিত। এই প্রাতিষ্ঠানিক ‘ব্যাকল্যাশ’ আইন প্রয়োগের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়।
নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, ‘আমাদের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, পুরুষতান্ত্রিকতা অনেক নারীর মধ্যেও বিরাজ করছে। নারী সমাজের বাইরের কেউ নয়। নারীর স্থান, মর্যাদা, সুযোগ, স্থান অনেক কম ও দুর্বল। তারা যখন একটু জায়গা পায়, তখন মনে করে অন্য কাউকে এখানে আসতে দেব না। তাই বলা হয়, নারী কখনও কখনও নারীর শত্রু হয়ে ওঠে। আসলে নারী নারীর শত্রু নয়; পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চাইলে নারীকে ব্যবহার করা হয় অন্য নারীকে দমিয়ে রাখার জন্য। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক স্তরে পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ব্যক্তিগত লজ্জা ও ভয় কাটিয়ে সোচ্চার হওয়া অপরিহার্য।’
