ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বিচ্ছেদ মানেই কি নারীর পরাজয়

বিচ্ছেদ মানেই কি নারীর পরাজয়
×

আফরোজা চৈতী

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২১:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিচ্ছেদ কী কেবলই একটি সম্পর্কের সমাপ্তি, নাকি একটি নতুন যুদ্ধের শুরু? আমাদের সমাজ বিচ্ছেদকে অধিকাংশ সময়ই ‘ব্যর্থতার গল্প’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। যখনই কোনো সংসার ভাঙে, তখন প্রশ্ন ওঠে–এই বিচ্ছেদের দায়ভার কার? খুবই স্বাভাবিকভাবে অভিযোগের আঙুলটি একজন পুরুষের চেয়ে নারীর দিকেই বেশি তাক করা থাকে। কারণ, একুশ শতকে দাঁড়িয়েও আমাদের সমাজব্যবস্থায় একজন ‘একা পুরুষ’-এর চেয়ে একজন ‘একা নারী’র জীবনযাপন অনেক বেশি প্রশ্নবিদ্ধ, কণ্টকাকীর্ণ এবং প্রতিকূল।

বিচ্ছেদের পরিসংখ্যান
শুরুতেই চোখ রাখা যাক পরিসংখ্যানের দিকে, যা আমাদের বর্তমান সমাজবাস্তবতার একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। শুধু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেই ২০২৩ সালে ১২ হাজারের বেশি তালাক রেজিস্ট্রি হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৩০টির মতো দাম্পত্য সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। একই সময়ে ঢাকা দক্ষিণে এই সংখ্যা প্রায় আট হাজার। রাজধানীতে বছরে প্রায় ২০ হাজার পরিবার ভাঙছে–এই তথ্যটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি হাজারো স্বপ্নের অপমৃত্যুর দলিল।

বিভিন্ন গবেষণাপত্র ও মিডিয়া রিপোর্টের ভাষ্যমতে, তালাকের সংখ্যা ও হার–উভয় ক্ষেত্রেই শীর্ষস্থানীয় জেলা ঢাকা। তবে ঢাকার বাইরের চিত্রও বেশ উদ্বেগজনক। জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলায় মোট বিয়ে হয়েছে আট হাজার ১০৬ আর বিচ্ছেদ হয়েছে পাঁচ হাজার ৫২১টি। অর্থাৎ বিচ্ছেদের হার মোট বিয়ের প্রায় ৬৮ শতাংশ! অন্যদিকে, বগুড়ায় ২০২৪ সালে ২২ হাজার ১৯৮ বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ১২ হাজার ১৪টি। অর্থাৎ গড়ে প্রতি মাসে এক হাজার পরিবার বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রতি হাজারে ১০.৮ জন নারী বিয়েবিচ্ছেদ করেছেন, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১.৫ জন। মাসে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে ৮৪৩টিরও বেশি পরিবার। চমকপ্রদ তথ্য হলো, তালাকের নোটিশ প্রেরণকারীদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। তাদের মধ্যে অভিজাত ও বিত্তবান নারী থেকে শুরু করে স্বাবলম্বী কর্মজীবী নারীর সংখ্যাই বেশি।

প্রশ্ন যখন মানিয়ে নেওয়ার
পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ১৭.৪ শতাংশ পরিবার এখন নারীর নেতৃত্বে চলছে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। নারীর এই আর্থিক সক্ষমতা বা স্বাবলম্বী হওয়া কি তাঁর জীবনকে সহজ করেছে? নাকি সমাজ তাঁকে আরও বড় কোনো পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে?

যখন কোনো নারী বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন, সমাজ প্রথমেই প্রশ্ন ছোড়ে–‘তিনি কি মানিয়ে নিতে পারেননি?’ এ প্রশ্নটি কখনোই করা হয় না– ‘তিনি আসলে কী সহ্য করছিলেন?’
এমনই একজন শারমিন (৩৮)। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত। ১০ বছরের দাম্পত্য জীবনে শারীরিক নির্যাতন ছিল না সত্য, ছিল প্রতিদিনের অবমাননা, নিয়ন্ত্রণ আর বেকার স্বামীর ‘আর্থিক অত্যাচার’। শারমিনের ভাষায়, ‘আমার আয়ের অর্থে আমার কোনো স্বাধীনতা ছিল না। আমাকে বলা হতো– তুমি বেশি কথা বল, বেশি জান, বেশি স্বাধীন। একদিন বুঝলাম, আমি নিজের ঘরেই বন্দি।’

বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর শারমিন সবচেয়ে বড় আঘাতটি পান নিজের পরিবার থেকেই। মা বলেছিলেন, ‘আরেকটু সহ্য করলে কী হতো?’ এই একটি প্রশ্ন নারীর জীবনে সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র। বর্তমানে শারমিন একা থাকেন, আর্থিকভাবে পূর্ণ স্বনির্ভর। সমাজের চোখে তিনি এখনও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। প্রতিবেশী আর আত্মীয়দের সন্দেহ, বিদ্রুপ আর ফিসফাস এখন তাঁর নিত্যসঙ্গী। সমাজ নারীর ‘বেঁচে থাকা’ মেনে নেয়, তার ‘নিজের মতো করে বাঁচা’ মেনে নিতে পারে না।

একা মায়ের লড়াই
বিচ্ছেদের পর নারীর সংকট যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সামাজিক। আত্মীয়দের নীরব প্রশ্ন–পাড়া-প্রতিবেশীর কৌতূহলী চোখ, সহকর্মীদের অযাচিত সহানুভূতি–সব মিলিয়ে নারীর চারপাশে তৈরি হয় এক ‘অদৃশ্য কারাগার’। এখানে তাঁকে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়, সে ‘খারাপ নারী’ নয়। যদি সেই নারী ‘সিঙ্গেল মাদার’ বা একা মা হন, তবে সংকট আরও গভীর। আফসানার (৪২) বিচ্ছেদ হয়েছে পাঁচ বছর আগে। তাঁর এক কন্যাসন্তান রয়েছে। সন্তানের স্কুলে কোনো সমস্যা হলেই প্রথম প্রশ্ন আসে, ‘বাবা কোথায়?’ বাবার অনুপস্থিতির সব দায় যেন একা মায়ের। আফসানা বলেন, ‘আমার সন্তান ভালো ফল করলে সেটা স্বাভাবিক। খারাপ করলেই দোষ আমার–যেহেতু আমি একা মা।’

সামাজিকভাবেও পদে পদে হেনস্তার শিকার হতে হয় তাঁকে। আফসানা ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ‘বাসার দারোয়ানও অনেক সময় সম্মান দিয়ে কথা বলেন না। অথচ পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির স্বামী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে তাঁকে সবাই তটস্থ হয়ে সম্মান করেন। বাসা ভাড়া নিতে গেলে যখন জানাই আমি ডিভোর্সড, মেয়ে নিয়ে একা থাকব, তখন কেউ আর বাসা ভাড়া দিতে চান না। মুখের ওপর বলে দেন–আপনাদের সঙ্গে কোনো পুরুষ নেই?’

আফসানার উপলব্ধি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ, “একক মা হওয়া মানে দ্বিগুণ দায়িত্ব নয়; বরং দ্বিগুণ নজরদারি। সমাজ ধরে নেয় একা নারীর পরিবার মানেই ‘অসম্পূর্ণ’ পরিবার। অথচ হাসিখুশি সাধারণ জীবন কাটানোর অধিকার আমাদেরও আছে।’’

অযাচিত কৌতূহল ও মুরব্বিপনা
তানিয়া (৩৫)। প্রথম বিয়ে ভাঙার পর আর দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবেননি। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় সৃজনশীল কাজে যুক্ত আছেন। তাঁর জীবনে সবচেয়ে ক্লান্তিকর বিষয় হলো প্রতিদিনের সেই একই প্রশ্ন– এখনও বিয়ে করনি কেন?’ ‘একা থাক, ভয় লাগে না?’

এ প্রশ্নগুলো যতটা না কৌতূহল, তার চেয়ে বেশি ‘সামাজিক নিয়ন্ত্রণ’-এর ভাষা। তানিয়া বলেন, ‘আমি একা থাকি বলেই সবাই মনে করে আমাকে রক্ষা করতে হবে, শাসন করতে হবে, উপদেশ দিতে হবে। যেন পরিবারে পুরুষ না থাকা মানেই আমি অরক্ষিত।’

তানিয়া, শারমিন কিংবা আফসানা–এই তিন নারীর গল্প আলাদা হলেও তাদের সংকট এক বিন্দুতে মিলে গেছে। বিচ্ছেদ নারীর জীবনের শেষ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু সমাজ নারীর এই ঘুরে দাঁড়ানোকে সহজভাবে নিতে পারে না। স্বাধীন নারীকে ‘বেপরোয়া’, চুপ থাকলে ‘অহংকারী’ আর নিজের মতো থাকলে ‘ইগো’র তকমা দেওয়া হয়।
মানবাধিকারকর্মী ও ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবীর এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার অনেক সহকর্মী আছেন যারা ডিভোর্সড, একা থাকেন। তারা সন্তানের স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে বাসা ভাড়া–প্রতিটি পদে পদে বাধার সম্মুখীন হন। যেন নারীর স্বামী না থাকা বা সন্তানের বাবা না থাকাটা মহাপাপ।’

খুশি কবীর আরও যোগ করেন, ‘কোনো নারীই আসলে একা চলতে চান না। তিনিও একজন জীবনসঙ্গী নিয়ে সুখী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। যখন সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, যখন সঙ্গীটি তাঁকে নির্যাতন করেন কিংবা তাঁকে ছেড়ে চলে যান, তখন সেই ট্রমা কাটিয়ে ওঠা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। নিজের মানসিক ক্ষত সারিয়ে, সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে যখন একজন নারী ঘুরে দাঁড়াতে চান, সমাজ তখন তাঁকে সাপোর্ট দেওয়ার বদলে কর্মস্থলে বুলিং বা যৌন হয়রানির মাধ্যমে তাঁর মনোবল ভেঙে দিতে চায়।’

সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের উচিত এমন সময়ে নারীর পাশে থাকা। যেখানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী, সেখানে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানসিক চাপে রেখে কোনো রাষ্ট্র সামনে এগোতে পারে না।

আরও পড়ুন

×