ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আফগান নারীদের ঘুরে দাঁড়ানো

আফগান নারীদের ঘুরে দাঁড়ানো
×

সৌরচালিত গ্রিনহাউসে কাজ করছেন নূরহায়া [ছদ্মনাম]

তাসমিয়া জাহান সিমরান

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

চারপাশে ধু-ধু প্রান্তর আর রুক্ষ প্রকৃতি। এরই মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক টুকরো সবুজ–একটি সৌরচালিত গ্রিনহাউস। হালকা সবুজ প্লাস্টিকের আচ্ছাদন ভেদ করে ভেতরে উঁকি দিচ্ছে নরম রোদ। সারি সারি সতেজ শাকসবজিতে ভরে উঠেছে চারপাশ। মাঝখানে এক নারী পরম মমতায় পরিচর্যা করছেন গাছগুলোর। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে এটি কোনো কৃষিনির্ভর শান্ত দেশের চিত্র। না, এটি যুদ্ধ, খরা আর চরমভাবাপন্ন জলবায়ুর দেশ আফগানিস্তানের চিত্র। যেখানে এ গ্রিনহাউসগুলো কেবল ফসলই ফলাচ্ছে না, বুনছে নারীর আত্মনির্ভরশীলতার নতুন স্বপ্ন।

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ কান্দাহার। গ্রীষ্মে এখানকার তাপমাত্রা এতটাই তীব্র হয়, মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এই বৈরী পরিবেশে গত সাত বছর ধরে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে আসছিলেন ৪৫ বছর বয়সী বিধবা নারী নূরহায়া (ছদ্মনাম)। তিন সন্তানের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে রোদে পুড়ে সবজি চাষের চেষ্টা করতেন তিনি। প্রতিবছরই প্রচণ্ড তাপদাহ আর পোকামাকড়ের আক্রমণে নষ্ট হতো ফসল।

কান্দাহার থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে হেলমান্দ প্রদেশের খাদিজার (ছদ্মনাম) গল্পটাও একই রকম। আট সন্তানের জননী খাদিজার বিশাল পরিবারের টিকে থাকার একমাত্র উপায় কৃষি। যে অঞ্চলে তাপমাত্রা নিয়মিত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায় এবং পানির স্তর ক্রমেই নিচে নামছে, সেখানে কৃষিকাজ যেন মরীচিকার পেছনে ছোটার মতো। খাদিজার ভাষায়, ‘বছরের বেশিরভাগ সময় হেলমান্দে খরা থাকে। পানির তীব্র সংকটে কৃষকদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। জনসংখ্যা বাড়ছে, পানি ভাগ হয়ে যাচ্ছে অনেক মানুষের মধ্যে। আমাদের মতো কৃষিনির্ভর পরিবারের জন্য পরিস্থিতি অসম্ভব হয়ে উঠছে।’

আফগানিস্তান বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। দীর্ঘস্থায়ী খরা আর চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া দেশটির কৃষি খাতকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, দেশটির প্রায় দুই কোটি ১৯ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এমন একটি ভয়াবহ বাস্তবতায় বিশেষ করে নারীর জন্য; যেখানে ঘরের বাইরে যাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত, সেখানে আশার আলো হয়ে এসেছে ‘ইউএন উইমেন’-এর একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। জাপান সরকারের অর্থায়নে এবং স্থানীয় অংশীদারদের সহযোগিতায় ইউএন উইমেন কান্দাহার, হেলমান্দ ও নিমরোজ প্রদেশে জলবায়ু-সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। এ প্রকল্পের আওতায় নূরহায়া, খাদিজাসহ ৬৪ জন নারীকে সৌরচালিত গ্রিনহাউসের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে স্বয়ংক্রিয় সেচযন্ত্র চালানো হয়। সঙ্গে রয়েছে পানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তি। গ্রিনহাউসের ভেতরের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকায় এখন আর প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ওপর নির্ভর করতে হয় না। শুষ্ক মাটির ওপর বিছানো কালো সেচ-নলের সাহায্যে পরিমিত পানি পৌঁছে যায় গাছের শিকড়ে।

এই প্রকল্পের আওতায় নারীর কেবল সরঞ্জাম দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, বরং গ্রিনহাউস ব্যবস্থাপনা, সেচ প্রযুক্তি, ফসল উৎপাদন এবং ব্যবসার মৌলিক ধারণার ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। নূরহায়াকে একটি গ্রিনহাউস, উন্নত বীজ, কৃষি সরঞ্জাম, ছয়টি সোলার প্যানেল, একটি পানির ট্যাঙ্ক এবং কূপ থেকে সহজে পানি তোলার যন্ত্র দেওয়া হয়েছে। ফলাফলও এসেছে জাদুকরি। নূরহায়া এখন বছরে তিন থেকে চারবার সবজি উৎপাদন করতে পারছেন। ঘরের মেঝেতে বসে নিজের উৎপাদিত তরতাজা সবজি কাটতে কাটতে তৃপ্তির হাসি হাসেন। বলেন, ‘আমরা বাজারে শসা বিক্রি শুরু করেছি। সেই টাকায় এখন পরিবারের জন্য আটা, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারি। বৈরী আবহাওয়া সত্ত্বেও এই গ্রিনহাউস আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।’

হেলমান্দের খাদিজাও (ছদ্মনাম) তাঁর গ্রিনহাউসে টমেটো, ধুন্দল এবং বেগুন চাষ শুরু করেছেন। গ্রিনহাউসের ভেতর ছোট সন্তানকে পাশে বসিয়ে মাটি প্রস্তুত করার সময় তাঁর চোখেমুখে এখন আর হতাশা নেই, আছে নতুন দিনের প্রত্যয়। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে। এখন আমরা প্রায় প্রতিদিনই তাজা সবজি খেতে পারি, পরিবারের স্বাস্থ্যও আগের চেয়ে ভালো। আগে ধারদেনা করে চলতে হতো। এখন আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি আশাবাদী।’

আরও পড়ুন

×