ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেতনের খাম জানে না সংবিধান কী বলে

বেতনের খাম জানে না সংবিধান কী বলে
×

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৭ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কামরাঙ্গীরচরের কোম্পানি ঘাটে সরু গলির শেষে টিনের একখানা ঘর। ১৯ বছরের সোনিয়া (ছদ্মনাম) সেখান থেকে ভোরে বেরিয়ে যান, ফেরেন রাতে। মাঝখানে ১২ ঘণ্টা কারখানার মেশিন। মাস শেষে হাতে আসে আট হাজার টাকা। পাশের সারিতে বসা পুরুষ সহকর্মী একই ঘণ্টা কাজ করে পান ১০ হাজার। দুই হাজার টাকার এই ফারাকের কোনো লিখিত ব্যাখ্যা নেই। ব্যাখ্যাটি অলিখিত এবং সবাই জানে।

প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে পূর্ব কাজলাপাড়া আদর্শ গ্রামে মোমেনা বেগমও ভোরে ক্ষেতে নামেন। স্বামী দিলদার আলী কখনও রিকশা চালান, কখনও কামলা খাটেন–কাজ সবদিন জোটে না। তাই মরিচ তোলা, ভুট্টা ভাঙা, ধান কাটা, নিড়ানি–সবই এখন মোমেনার হাতে। প্রতিবেশীরা টিপ্পনী কাটে, ‘মেয়েমানুষ, ক্ষেতে খাটে।’ মোমেনা জবাব দেন একটি প্রশ্নে–‘কাম না কইল্লে খামু কী?’ নদীভাঙনে ভিটেহারা এই গ্রামের ৬০টি পরিবারের কারও ঘরে সঞ্চয় নেই। সরকারি সহায়তা বলতে দুই ঈদে কয়েক কেজি চাল। মজুরির হিসাবটি আরও নির্মম–এ অঞ্চলে পুরুষ শ্রমিক দিনে পান ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা, নারী ২৫০ থেকে ৩০০। একই রোদ, একই ক্ষেত, অর্ধেক দাম। এই অর্ধেকের ভেতরেই বাংলাদেশের নারীর প্রায় পুরো গল্পটি লেখা আছে।

১৯৮৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ‘নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ’ বা সিডওতে যুক্ত হয়েছিল। ৪২ বছর পার হয়েছে। সংবিধানের ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদ বলছে নারী-পুরুষ সমান। 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বিষয়টিকে দেখেন একটি ফাটল হিসেবে। তাঁর ভাষায়, ‘আইন বলছে নারী-পুরুষ সমান কিন্তু সমাজ ও নীতিনির্ধারক কাঠামো নারীকে পূর্ণ সমতা দিতে সাহসী হয়নি। ফলে আইন ও জীবনের মাঝখানে গভীর এক ফারাক তৈরি হয়েছে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুসারে, মাত্র এক বছরে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ১৭ লাখ কমে গেছে। ২০২৩ সালের ৭.৩৪ কোটি থেকে কমে ২০২৪ সালে মোট শ্রমশক্তি দাঁড়ায় ৭.১৭ কোটিতে। পুরুষের অংশগ্রহণ মূলত ৪.৮ কোটিতে অপরিবর্তিত রয়েছে; যা ২০২৩ সালে ছিল ৪.৮১ কোটি। তবে একই সময়ে নারীর অংশগ্রহণ ২.৫৩ কোটি থেকে কমে ২.৩৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। 

যে পোশাকশিল্প এ দেশের রপ্তানির মেরুদণ্ড, সেখানে শ্রমিকের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নারী হলেও ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বে তাদের উপস্থিতি ১০ শতাংশেরও কম। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের লিঙ্গ ব্যবধান সূচকে বাংলাদেশ টানা এক দশক দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে অথচ সেই একই প্রতিবেদনের ‘অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ’ উপসূচকে দেশের অবস্থান ১৩০-এর নিচে–প্রায় তলানিতে। শীর্ষ আর তলানির এ দূরত্বটিই আমাদের সমতার প্রকৃত মানচিত্র।

শিক্ষার ছবিও দ্বিমুখী। প্রাথমিকে মেয়েদের ভর্তি বেড়েছে কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় ঝরে পড়া থামেনি। বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্য সেখানে দুই ফলা কাঁচি। ফেনীর ১৭ বছরের কোহিনুর (ছদ্মনাম) বলেন, ‘কভিডে স্কুল বন্ধ থাকায় আমাকে বিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে মারধরের শিকার হয়ে গ্রামে ফিরে আসি। পড়ার ইচ্ছা ছিল, সুযোগ পাইনি।’ একটি বাক্যেই ভেঙে পড়ে তিনটি অধিকার–শিক্ষা, শরীর, নিরাপত্তা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশে ৩১৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় কম মনে হলেও ভেতরের প্রবণতা শীতল আতঙ্ক জাগায়। ধর্ষণের পর হত্যার হার ২০২৫ সালের প্রায় ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। অর্থাৎ সাক্ষ্য মুছে ফেলতে ভুক্তভোগীকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সবচেয়ে বিপন্ন ১৩ থেকে ১৮ বছরের কিশোরীরা (৭৩ জন), এরপরই ৭ থেকে ১২ বছরের শিশুরা (৬৮ জন)। যে ঘরকে আশ্রয় বলা হয়, সেখানে ছয় মাসে ৯১ জন নারী খুন হয়েছেন স্বামীর হাতে, ২১ জন শ্বশুরবাড়ির লোকজনের হাতে; নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ৬৭ জন। এগুলো ব্যক্তিগত হতাশা নয়–দীর্ঘস্থায়ী নির্যাতনের অবধারিত পরিণতি, কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড।

সবচেয়ে বড় প্ররোচনার নাম বিচারহীনতা। ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০’-এ মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সংশোধনীতে বিচারের সময়সীমাও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। অথচ গবেষণা বলছে, এ ধরনের মামলায় চূড়ান্ত সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে দেশে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র মাত্র ১৩টি, আর ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সহায়তা মাত্র পাঁচ দিনের।

আগামী ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিডও কমিটির ৯৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিবেদন পর্যালোচিত হবে; প্রি-সেশন এ বছরের শেষে। মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, ‘দুই দশকের পুরোনো দাবিটি এখনও অপূর্ণ–সনদের ২ এবং ১৬ (১) (গ) ধারার ওপর রাখা সংরক্ষণ প্রত্যাহার।’ ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ ১৩ (ক) ও ১৬ (১) (চ) ধারার সংরক্ষণ তুলে নিলেও বাকি দুটি রয়ে গেছে; যার একটিতে আছে বৈষম্য বিলোপের মূল চেতনা, অন্যটিতে পারিবারিক সম্পর্কে সমান অধিকার। ‘বিবেচনা করছি’ বলে আর কালক্ষেপণ নয়, এবার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা চান অধিকারকর্মীরা। মালেকা বানুর উদ্বেগ আরও কয়েকটি–কোটা বিলোপের পর সরকারি চাকরি ও প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারীর ওঠার সিঁড়িটিই সরে গেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন স্থগিত থাকায় তৃণমূলে নারী প্রতিনিধি নেই। আবার সামাজিক মাধ্যমে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রকাশ্য সাফাই গেয়ে মীমাংসিত প্রশ্নগুলোকে নতুন করে খুলে দেওয়া হচ্ছে।

জেন্ডার ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ফেরদৌসী সুলতানা বেগম আঙুল রাখেন আরেক জায়গায়–‘সংরক্ষণ যতক্ষণ প্রত্যাহার হচ্ছে না, ততক্ষণ হাতে যে আইন আছে সেটাই বা যথাযথভাবে প্রয়োগ করছি না কেন?’ বিদ্যমান আইনের ইতিবাচক অংশটুকুর সঠিক প্রয়োগেও অনেক মানুষ প্রতিকার পেতে পারেন।

নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন হক দায়টি রাষ্ট্রের কাঁধেই রাখেন–‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও নারীবিদ্বেষ দুটোরই দায় রাষ্ট্রের। আইনের পাশাপাশি দরকার নিরপেক্ষ তদন্ত, পুলিশের প্রশিক্ষণ, ২৪ ঘণ্টা মেডিকো-লিগ্যাল পরীক্ষার ব্যবস্থা আর সেবাদানকারীদের জবাবদিহি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরী ধরিয়ে দেন ভেতরের মনস্তত্ত্বটি–অনিরাপত্তাবোধ থেকে নারী নিজেই নিজের পরিসর ছোট করে আনেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কাজে যান না। সম্পদ থেকে বঞ্চনাও এক ধরনের নির্যাতন–‘অর্থনৈতিক নির্যাতন’। আর্থিকভাবে নির্ভরশীল নারীকে বশে রাখা সহজ। এই বৃত্তেই আটকে থাকে ক্ষমতায়ন।

আরও পড়ুন

×