নবীন পেশাজীবী নারীর প্রতি খোলা চিঠি
লায়লা খন্দকার
প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
আন্তর্জাতিক উন্নয়নে দুই দশকের বেশি সময়ের কাজ আমাকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছে। লাইবেরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাপুয়া নিউগিনিতে থেকেছি, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। কাজ করেছি লন্ডন, মেলবোর্ন ও ব্যাংককেও। জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছি।
সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করা নারীরা মাঝেমধ্যে আমার পরামর্শ চান। আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক মানুষের জীবনের যাত্রা আলাদা; সাফল্যেরও একক সংজ্ঞা নেই। নিজের বাস্তবতা, আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যবোধ অনুযায়ী প্রত্যেককে জীবন গড়তে হয়। তারপরও আমার অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি কথা বলতে চাই।
বড় স্বপ্ন দেখুন, সাহসী হোন
নারীকে প্রায়ই শেখানো হয়–খুব বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়া ভালো নয়, দৃঢ় হওয়া যাবে না, নিজের অর্জন নিয়ে বেশি কথা বলা উচিত নয়। আপনি জীবনে কী করতে চান, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আপনার। উচ্চাকাঙ্ক্ষী হতে ভয় পাবেন না। বড় স্বপ্ন দেখুন, আত্মবিশ্বাসী হোন।
যে কাজ ভালোবাসেন, সেটিই বেছে নিন
যে কোনো ক্ষেত্রে অর্থপূর্ণ অবদান রাখতে কাজের প্রতি ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন। শুধু অর্থ বা সামাজিক মর্যাদার কথা ভেবে পেশা বেছে নেবেন না। এমন কাজ করুন, যা আপনাকে সত্যিই আগ্রহী ও অনুপ্রাণিত করে।
পড়াশোনা কিংবা পেশা নির্বাচনের সময় নারী-পুরুষের জন্য সমাজের তৈরি গৎবাঁধা সীমানায় আটকে থাকবেন না। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা, উন্নয়ন, শিল্পকলা–সব ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা রয়েছে। আপনার আগ্রহ ও সক্ষমতাই হোক নিজস্ব পথ বেছে নেওয়ার প্রধান বিবেচনা।
যা করবেন, ভালোভাবে করবেন
যে কাজই করুন, যতটা সম্ভব ভালোভাবে করুন। নিজের দক্ষতা ও কাজের মান দিয়ে প্রতিষ্ঠানে নিজের অবস্থান তৈরি করুন। তবে নিজেকে প্রমাণ করতে সব সময় অন্যদের চেয়ে দ্বিগুণ কাজ করতে হবে–এমন ফাঁদে পড়বেন না। কর্মক্ষেত্রে আপনার শ্রম, সময় ও দক্ষতার যথাযথ মূল্য পাওয়ার অধিকার আপনার রয়েছে।
শেখা কখনও বন্ধ করবেন না
কারিগরি, ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়িয়ে নিজেকে ক্রমাগত গড়ে তুলুন। পেশাসংশ্লিষ্ট কোর্স করুন, দেশে-বিদেশে সম্মেলনে অংশ নিন, বক্তৃতা বা উপস্থাপনার সুযোগ নিন। নিজের আগ্রহের বিষয়ে নিয়মিত পড়ুন, ভিডিও দেখুন। কাজের অভিজ্ঞতা থেকেও শিখুন। পেশাগত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলুন। যাদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ আছে, যারা আপনাকে অনুপ্রাণিত করেন বা প্রয়োজনের সময় পরামর্শ দিতে পারেন– তাদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করুন।
‘সুপারওম্যান’ হওয়ার ফাঁদে পড়বেন না
কর্মক্ষেত্রে সফল হতে হবে, সংসার নিখুঁতভাবে সামলাতে হবে, সন্তান থাকলে তাদের সব দায়িত্ব নিতে হবে, সবার প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে–নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই অসম্ভব চাপ প্রত্যাখ্যান করুন।
জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন কাউকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করুন, যিনি আপনার স্বপ্নকে সম্মান করবেন, সাফল্যে আনন্দিত হবেন এবং আপনার প্রতিভা বা স্বাধীনতায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন না। সংসারের কাজ ও সন্তানদের যত্ন– দুজনেরই দায়িত্ব। পরিবারেও সমতা নিয়ে কথা বলুন, পরিবারের সদস্যদের নিজের পেশাগত কাজের গুরুত্ব বোঝান।
বাধা এলে উঠে দাঁড়ান
জীবন ও কর্মক্ষেত্রে আপনাকে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আইন, নীতি ও নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি হতে হবে। এসব পরিবর্তনের উদ্যোগে যতটা সম্ভব যুক্ত থাকুন। প্রয়োজনে প্রতিবাদ করুন, তবে সব বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়াবেন না। নিজের শক্তি কোথায় ব্যয় করবেন এবং কোন লড়াই সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে শিখুন। সব বাধা দূর হওয়ার অপেক্ষায় বসে থাকবেন না। পেশাদারিত্ব ও দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যান।
লক্ষ্য ঠিক করুন, তবে পরিবর্তনের জন্যও প্রস্তুত থাকুন
পেশাগত জীবনে কোথায় পৌঁছাতে চান, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা ভালো। তবে সময়ের সঙ্গে অগ্রাধিকার, আগ্রহ ও পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তাই কখনও কখনও নিজের লক্ষ্য পুনর্মূল্যায়ন করুন। প্রয়োজন হলে ভিন্ন কিছু করুন। নতুন সুযোগ এলে শুধু এই ভেবে পিছিয়ে যাবেন না যে আপনি এখনও ‘পুরোপুরি প্রস্তুত’ নন। অনেক সময় কাজ করতে করতেই আমরা প্রস্তুত হয়ে উঠি।
সাফল্যের সংজ্ঞা নিজেই ঠিক করুন
সমাজের তৈরি মানদণ্ড অনুযায়ী ‘সফল’ হওয়ার চেষ্টা করবেন না। নিজেকে প্রশ্ন করুন–আপনার কাজটা কি নিজের কাছে অর্থপূর্ণ? কোন ধরনের জীবন আপনাকে পরিতৃপ্তি দেয়? আপনার জীবনে শান্তি, স্থিতিশীলতা, আনন্দ, সৌন্দর্য ও অবসর আছে?
নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নিন, আবার চেষ্টা করুন
জীবনে সাফল্য আসবে, ব্যর্থতাও থাকবে। সব সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ফল দেবে না। নিজের সিদ্ধান্ত ও তার ফলাফলের দায়িত্ব নিন। অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন। নিজের পেশাগত স্বপ্ন বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিন। নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন। ভালো থাকুন।
- বিষয় :
- নারী
- লায়লা খন্দকার
- কর্মজীবী নারী