ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস

নদী যেখানে সমাধি

নদী যেখানে সমাধি
×

কোলাজ:: বোরহান আজাদ; কোলাজে ব্যবহৃত ছবি:: মোশফিকুর রহমান জোহান

মোশফিকুর রহমান জোহান

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ১৫:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগ শাসনামলে বাংলাদেশে সময় সরলরেখায় বইত না। একই দেশে পাশাপাশি দুটি জগৎ টিকে ছিল। একটিতে সকালের নাশতা, অফিস, উন্নয়ন, ক্যারিয়ার, উৎসব, হাসি-কান্না ও ভান– নব্য-স্বাভাবিক এক জীবন। তার নিচে চাপা পড়ে ছিল আরেকটি জগৎ, যেখানে ওপরের আলো কোনো দিন পৌঁছায়নি। চোখের জল ঝরেছে, রক্ত ঝরেছে, শোক জমেছে কিন্তু একটি শব্দও শোনা যায়নি। গুম ছিল সেই নৈঃশব্দ্যের নাম; যার চূড়ান্ত পরিণতি স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়া।

এই মিলিয়ে যাওয়া কোনো বিক্ষিপ্ত নিষ্ঠুরতা ছিল না। রাষ্ট্রযন্ত্র একে বানিয়ে তুলেছিল আমলাতান্ত্রিকভাবে পুনরাবৃত্তিযোগ্য এক প্রক্রিয়া–জনপরিসর থেকে মানুষ মুছে ফেলার নিয়ম। তুলে নেওয়ার মুহূর্তেই গুম শেষ হয় না। পেছনে পড়ে থাকা পরিবারের কাছে অনুপস্থিতি বারবার উপস্থিতির মতো অনুভূত হয়; মৃত্যুর আশঙ্কার পাশে ক্ষীণ আশাও বেঁচে থাকে। 

ছয় বছরের বেশি সময় ধরে গুম হওয়া মানুষের পরিবারের সঙ্গে কাজ করছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর কয়েকজন সহকর্মীসহ পরিবারগুলোকে মামলা দায়েরে সহায়তা করেছি। সাক্ষী থেকেছি ১১৮টি মামলা জমা পড়ার। সেখানে একটি বিষয় বারবার চোখে পড়েছে–পরিবারগুলো দায়ী বাহিনীর নাম লিখতে পারেনি। তারা জানত না এমন নয়; নাম নেওয়াটাই ছিল ঝুঁকির। থানায় পুলিশ কর্মকর্তারা প্রায়ই বাহিনীর পরিচয় উল্লেখ করতে দেননি। ফলে মামলার ভাষা হয়ে উঠেছিল অনিশ্চয়তার ভাষা–‘নিখোঁজ’, ‘তুলে নেওয়া হয়েছে’, ‘সাদা পোশাকের লোক’, ‘আর ফিরে আসেনি’। 

শব্দের এই রাজনীতির বিপরীতে পরিবারগুলো নিজেরাই হয়ে উঠেছে তদন্তকারী, তথ্য সংগ্রাহক ও সাক্ষী। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভাইকে হারানো সানজিদা ইসলাম তুলি নদীকে বর্ণনা করেন ‘বিশাল গোরস্তান’ হিসেবে। তিনি জানতেন, লাশের সঙ্গে ইট বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। যে নদী অন্যদের কাছে যাতায়াত বা জীবিকার পথ, তাঁর কাছে তার ভাইয়ের মরদেহ লুকিয়ে রাখার সম্ভাব্য আধার। তিনি মাঝিদের কাছে জানতে চেয়েছেন, কেউ কি দেখেছে সেতু বা নৌকা থেকে কাউকে ফেলে দিতে?

এ অনুমানকে পরে রাষ্ট্রীয় নথিই সত্য বলে স্বীকার করেছে। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি জমা দেওয়া গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এক হাজার ৯১৩টি অভিযোগের মধ্যে এক হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনা হিসেবে যাচাই হয়েছে। ২৮৭ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘নিখোঁজ ও মৃত’ হিসেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতেই সবচেয়ে বেশি লাশ ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ পরিবারগুলো যা এতকাল অনুমান করেছে, তদন্ত কেবল তাকেই দেরিতে ধরতে পেরেছে।

গুম যে একটি চলমান প্রক্রিয়া, তা বোঝা যায় দৈনন্দিনের ভেতরেও। রাইতা বাবার গুমের কয়েক বছর পর একটি গোপন আটককেন্দ্রে গিয়ে একটি ভবন দেখে তীব্রভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, বাবা ভেতরেই আছেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর আবার সেখানে গিয়ে জেনেছেন, বাবাকে সত্যিই ওই ভবনের সেলে রাখা হয়েছিল। বাবাকে বের করে আনতে না পারার আক্ষেপ তাঁকে আজও কুরে কুরে খায়। নিপা এখনও জানালার পাশে স্বামীর ডাক শোনেন। যেমন তিনি রাতে ফিরে ডাকতেন। একবার শ্বশুর, দেবরসহ সবাই সেই ডাক শুনেছেন। বাইরে গিয়ে কাউকে পাননি। তরিকুল ইসলাম তারার স্ত্রী বেবি ভিড়ের ভেতর অচেনা মানুষের মুখ খুঁটিয়ে দেখেন–স্বামীর গুমের দিনে তরিকুলের পরা শার্টের মতো শার্ট দেখলেই থমকে দাঁড়ান।

এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, গুম নির্দিষ্ট মুহূর্তের অপরাধ নয়; ব্যক্তির পরিণতি অমীমাংসিত থাকা পর্যন্ত এটি চলতেই থাকে। সে কারণেই প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ গুরুত্বপূর্ণ। তার কার্যকারিতা নির্ভর করছে একটি মৌলিক প্রশ্নে–অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানই যখন তদন্তের অংশ, তখন তদন্ত করবে কে?

গত ১০ এপ্রিল মোংলার ৩০ বছর বয়সী জেলে মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়া এ প্রশ্নেরই জ্বলন্ত উদাহরণ। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যে, কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাঁকে নিয়ে যান। স্ত্রী মুক্তা খাতুনকে প্রথমে বলা হয়েছিল, তাঁর স্বামীকে নিয়ে অভিযানে গেছে। পরে বলা হয়, ওই নামে কেউ নেই। ১২ জুলাই হাইকোর্ট তাঁকে হাজির করার নির্দেশ দিলেও আজও খোঁজ মেলেনি। অভিযুক্ত বাহিনীর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক অনুসন্ধান কখনোই কাঠামোগতভাবে পৃথক স্বাধীন তদন্তের সমকক্ষ নয়। পরিবারকে তখন দুটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়–মিরাজের কী হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারাই কি সত্য বের করবেন?

প্রস্তাবিত কাঠামোয় তদন্তভার দেওয়া হয়েছে পুলিশকে–অথচ অধ্যাদেশে তা ছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে। কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটনের পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট–আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা পুলিশ যথাযথভাবে তদন্ত করেছে, এমন নজির নেই। সমালোচকরা কমান্ড দায়বদ্ধতা দুর্বল করা এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বাদ দেওয়ার দিকেও আঙুল তুলছেন। স্বাধীন তদন্ত কেবল ভুক্তভোগীর প্রয়োজন নয়, রাষ্ট্রেরও। তা বানোয়াট অভিযোগ থেকে সত্যকে আলাদা করে, ব্যক্তির দায় চিহ্নিত করে, নিরীহ কর্মকর্তাকে ঢালাও সন্দেহ থেকে বাঁচায় এবং বাহিনীর পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরায়। প্রতিষ্ঠান ফলাফল থেকে শেখে; বিশ্বাসযোগ্য পরিণতি না থাকলে শিক্ষাটি হয় সহজ–অভিযোগ হজম করা যায়। সত্য উদ্‌ঘাটনের বদলে আইন যখন পদ্ধতিগত দায়মুক্তির নিশ্চয়তা দেয়, তখন রাষ্ট্র ও নাগরিকের মৌলিক বিশ্বাসটিই ভেঙে পড়ে। স্বাধীন তদন্ত তাই নিছক আইনি কারিগরি নয়– সত্যের অপরিহার্য পূর্বশর্ত।

আরও পড়ুন

×