ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যাংক

গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে টেকসই অর্থায়ন

গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে টেকসই অর্থায়ন
×

কোলাজ

ওবায়দুল্লাহ রনি

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ০০:০২ | আপডেট: ২৬ জুলাই ২০২৫ | ০৭:১৬

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণ। খাদ্য ও পানির অভাব, স্বাস্থ্য সমস্যা কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে রয়েছে এসব কারণ। যে কারণে কার্বন নিঃসরণ কমানোর চেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়ে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টেকসই ও সবুজ অর্থায়নে জোর দিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্বুদ্ধ করতে কয়েক বছর ধরে সাসটেইনেবিলিটি রেটিং বা টেকসই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে সম্প্রতি স্থিতিশীলতা রেটিং পাওয়া শীর্ষ ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স পলিসি অনুযায়ী টেকসই অর্থায়ন মূলত যে কোনো ধরনের আর্থিক পরিষেবা বোঝায়– যার মধ্যে বিনিয়োগ, বীমা, ব্যাংকিং, অ্যাকাউন্টিং, ট্রেডিং এবং আর্থিক পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত। যা গ্রাহক ও সমাজ উভয়ের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা বিবেচনা করে এবং ব্যবসা বা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে পরিবেশগত, সামাজিক ও পরিচালন মানদণ্ড একীভূত করে। পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন, টেকসই কৃষি, টেকসই সিএমএসএমই ও সামাজিক দায়বদ্ধ আর্থিক কার্যক্রম নিয়ে টেকসই অর্থায়ন গঠিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবিলিটি রেটিং করা হয় টেকসই অর্থায়ন, সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতে অবদান, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন, কোর ব্যাংকিংয়ের টেকসইতা ও সেবার মানের ভিত্তিতে। এসবের আওতায় ওই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতাসহ ১৫৪টি বিষয় দেখা হয়।  

টেকসই অর্থায়ন বলতে কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে পরিবেশ বিপর্যয় কমানোর পাশাপাশি বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এমন খাতে বিনিয়োগকে বোঝানো হয়। এ ছাড়া সামাজিক দায়বদ্ধতা– সিএসআর খাতে ব্যাংকগুলোর অবদান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচি থেকে ঋণ বিতরণ, কোর ব্যাংকিং সাসটেইনেবিলিটি তথা সার্বিক পরিস্থিতি টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ক্যামেলস তথা মূলধন পর্যাপ্ততা, ঋণের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, আয়, তারল্য পরিস্থিতি ও সংবেদনশীলতার বিষয়টি দেখা হয়। নিয়ম মেনে ঋণ বিতরণ করেছে কিনা, ব্যবস্থাপনার ওপর পরিচালনা পর্ষদের হস্তক্ষেপ এসবও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্যাংকের সেবার পরিধি– শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং, এটিএম বুথসহ বিভিন্ন স্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠানে ব্যাংক অর্থায়ন করছে এবং নিজস্ব স্থাপনায় কাগজের ব্যবহার, প্রতিষ্ঠানটিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ইত্যাদি দেখে রেটিং দেওয়া হয়। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পরিবেশ দূষণ ঠেকানোর পাশাপাশি এসডিজি অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমানোর শর্ত রয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে না পারলে নানামুখী সংকটে পড়বে দেশ। কেননা কার্বন নিঃসরণ কমাতে না পারলে সেসব দেশ থেকে কোনো পণ্য কিনবে না অনেক উন্নত দেশ। ফলে টেকসই অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

টেকসই অর্থায়ন বাড়ছে
ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টেকসই এবং সবুজ অর্থায়ন প্রতি বছর বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ সালে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ খাতে বিতরণ করেছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালে বিতরণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। গত বছর টেকসই অর্থায়ন ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০২৩ সালে ছিল ১৭ শতাংশ।

টেকসই অর্থায়নের দুটি অংশ বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করে বাংলাদেশ ব্যাংক; যা হলো টেকসই সম্পৃক্ত অর্থায়ন এবং সবুজ অর্থায়ন। গত বছর ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৪ লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার ‘টেকসই সম্পৃক্ত’অর্থায়ন করেছে। অন্যদিকে সবুজ অর্থায়ন করেছে ৩১ হাজার কোটি টাকা।

বছরের ব্যবধানে টেকসই অর্থায়ন বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, একটি সময় কেবল ৯টি খাতে বিতরণ করা ঋণকে টেকসই ও সবুজ অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দুই ধাপে তা বাড়িয়ে প্রথমে ১১টি, এখন ১৪টি খাতকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। অন্য অনেক ক্ষেত্রেও নীতিমালা শিথিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহী করতে টেকসই অর্থায়নের ভিত্তিতে প্রতি বছর শীর্ষ ব্যাংকের তালিকা প্রকাশ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং, নতুন শাখার অনুমোদনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেকসই অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। এসব কারণে টেকসই অর্থায়নের হার বাড়ছে।

সাইটেইনেবিলিটি রেটিংয়ে শীর্ষ যারা 
বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে ২০২৪ সালে সাসটেইনেবিলিটি রেটিং পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো– বেসরকারি খাতের ব্র্যাক, সিটি, ডাচ্‌-বাংলা, ইস্টার্ন, যমুনা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, এনসিসি, প্রাইম, পূবালী ও শাহাজালাল ইসলামী। তালিকায় থাকা দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো– আইডিএলসি ফাইন্যান্স ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স। ২০২৩ সালে শীর্ষ তালিকায় ছিল ব্র্যাক, সিটি, ইস্টার্ন, এক্সিম, যমুনা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, প্রাইম, ট্রাস্ট, ইউসিবি ও উত্তরা ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল আইডিএলসি ফাইন্যান্স, আইপিডিসি ফাইন্যান্স ও ইউনাইটেড ফাইন্যান্স।  

২০২২ সালের শীর্ষ রেটিং পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো– বেসরকারি খাতের ব্র্যাক, শাহজালাল ইসলামী, দ্য সিটি, প্রাইম, যমুনা, ট্রাস্ট ও ইউনাইটেড কমার্স ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো– আইডিএলসি ফাইন্যান্স, লঙ্কান অ্যালায়েন্স ফাইন্যান্স, অগ্রণী এসএমই ফাইন্যান্স কোম্পানি ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্স। এর আগে ২০২১ সালে সবচেয়ে ভালো রেটিং পাওয়া প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ছিল– ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সাউথইস্ট, ব্র্যাক, দ্য সিটি, ডাচ্‌-বাংলা, ইস্টার্ন, ব্যাংক এশিয়া, এক্সিম, এনআরবি ও পূবালী ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল– আইডিএলসি ফাইন্যান্স, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, অগ্রণী এসএমই ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স ও বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড। 

কার্বন নির্গমন কমাতে ব্যাংক কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিকভাবে আটটি শীর্ষ কার্বন নির্গমনকারী খাত চিহ্নিত করেছেন। এসব খাতের মধ্যে সবার শীর্ষে রয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। সারাবিশ্বে গড় কার্বন নির্গমনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ হয় এ মাধ্যমে। পর্যায়ক্রমে শিল্পকারখানা, পরিবহন, কৃষি উপজাত, জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম, ভূমি ব্যবহার ও জৈব জ্বালানি এবং বর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এখন কৃত্রিমতা ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়ছে এর ঝুঁকি। বিশেষ করে গ্রিনহাউস গ্যাস, তেজস্ক্রিয় পদার্থ, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, আর্সেনিকযুক্ত বর্জ্য, বালাইনাশক, আগাছানাশক, ধোঁয়া, ধূলিকণা, ময়লা আর্বজনা এসব পরিবেশ দূষণে বেশি ভূমিকা রাখে। 

বাংলাদেশে শিল্প প্রকল্প অর্থায়নের প্রধান উৎস ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বস্ত্র, জ্বালানি, সার, সিমেন্ট, ইস্পাত, কাগজসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রচুর কার্বন নিঃসরণ হয়। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সহায়তায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব উৎপাদন উৎসাহিত করতে সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তারা অর্থায়নের শর্ত হিসেবে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিচ্ছে। তারা পরিবেশগতভাবে টেকসই ও সামাজিকভাবে যৌক্তিক বিনিয়োগে গ্রাহকদের উৎসাহিত করছে। এর ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। তৈরি পোশাক খাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সবুজ কারখানার বেশির ভাগই বাংলাদেশে। টেকসই অর্থায়ন সামগ্রিকভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করছে।  

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ
প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার আলোকে নিজস্ব সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ইউনিট গঠন করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে টেকসই অর্থায়ন নীতি জারি করে। এর আলোকে প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব নীতি প্রণয়ন করেছে। তারা গ্রাহকদের উৎপাদন চর্চায় পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি অনুসরণ করছে। অর্থায়নের শর্তের সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়টি যুক্ত করছে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ প্রদানের মানদণ্ড অনুসরণে পরিবেশ ও সামাজিক ঝুঁকি পরিপালন নিশ্চিত করছে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও সামাজিক মূল্যায়ন করছে, উৎপাদন বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে পরিবেশ দূষণ না হয়। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি), নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সাশ্রয়ী প্রকল্প, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, হাইব্রিড বা বৈদ্যুতিক গাড়ি, সবুজ ভবন, সবুজ কারখানা ইত্যাদি খাতে অর্থায়ন বাড়িয়েছে। 

আরও পড়ুন

×