অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:১১ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
ব্যাংকের যে ক্ষেত্রে অর্থায়ন করার কথা নয়, সে ধরনের বিশেষায়িত ও বিকল্প অর্থায়নের উৎস হিসেবে আশির দশকের শুরুতে দেশে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাত গড়ে উঠেছিল, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি (আইপিডিসি) নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে। এখন এ খাতে কোম্পানি ৩৫টি, যার তিনটি সরকারি, বাকিগুলো বেসরকারি মালিকানায়।
যাত্রা শুরুর চার দশকেই ধসে পড়ার দশায় এ খাত। বিশেষত গত এক দশকে এ খাত ভয়াবহ দুরবস্থার মধ্যে পড়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদন (এপ্রিল-জুন ২০২৫) এবং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ খাতের অর্ধেকের বেশি প্রতিষ্ঠান এখন টিকে থাকার সংগ্রামে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল-জুন প্রান্তিক শেষে এনবিএফআইগুলোর মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিক থেকে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ঋণ ও অগ্রিম মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৭৭ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা।
ঋণখেলাপির প্রবণতা
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে এনবিএফআই খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে প্রায় ৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আর বিতরণকৃত ৭৭ হাজার ৯৩ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে প্রায় ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার কোটি টাকার ওপরে। আর ২০টি দুর্বল প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ মোটের প্রায় ৮৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
যথেষ্ট তহবিলও পাচ্ছে না
গত জুনে সমাপ্ত আর্থিক হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ খাতের মোট আমানতের অর্ধেকই চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। এগুলো হলো– আইডিএলসি, আইপিডিসি, ডিবিএইচ এবং লংকাবাংলা ফাইন্যান্স। তারা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে মোট আমানত পেয়েছে ২৪ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা, যা মোটের ৪৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ফলে বাকি এনবিএফআইগুলোর অবস্থা সহজে অনুমেয়।
শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত ৬টি মুনাফায়
ঢাকার শেয়ারবাজারে ১৯টি খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি বর্তমানে ৩৬০টি। এর মধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি ২৩টি। এই ২৩টির মধ্যে মাত্র ছয়টি মুনাফায়, বাকিগুলো লোকসানে। সার্বিক বিবেচনায় শেয়ারবাজারে অন্যতম দুর্বল এ খাত।
তালিকাভুক্ত ২৩ কোম্পানির মধ্যে ২১টি এখন পর্যন্ত ২০২৪ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে মুনাফায় থাকা কোম্পানিগুলোর মোট মুনাফা ৪০ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৩৬০ কোটি টাকা। বিপরীতে ১৫ প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৩৮ কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালে ছিল তিন হাজার ১৮৫ কোটি টাকা। আগে যেসব খেলাপি ঋণকে নিয়মিত দেখানো হতো, তার উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি হিসেবে নথিভুক্ত করায় রুগ্ণ অবস্থা বের হয়ে আসছে।
এমন লোকসানের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক বেশি সুদে আমানত বা ধার করে অপেক্ষাকৃত কম সুদে অর্থায়ন করতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন শেষে এসব প্রতিষ্ঠানে আমানতের গড় হার ছিল ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে গড়ে ঋণ বিতরণ করেছে ১২ দশমিক ৮১ শতাংশ সুদ হারে। এই ব্যবধানে অর্থায়ন করে কোনো অবস্থায় লাভজনকভাবে টিকে থাকা অসম্ভব।
ফলে দুরবস্থা ক্রমে বাড়ছে। তালিকাভুক্ত লোকসানি ১৫ কোম্পানির পুঞ্জীভূত লোকসান ২০২৪ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা, যা আগের বছর শেষে ছিল ১৩ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ খাতের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান মূলধনের অনেক গুণ বেশি লোকসানে ডুবে আছে।
এর প্রতিফলন আছে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরেও। তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২৩ কোম্পানির মোট পরিশোধিত মূলধন পাঁচ হাজার ৪৫৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। গত বৃহস্পতিবার দিন শেষে সবগুলোর সব শেয়ারের বাজারমূল্য বা বাজার মূলধন ছিল আট হাজার ৬০৮ কোটি টাকা।
বাজারদরের চিত্রেও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপর্যয়কর অবস্থা আরও স্পষ্ট। তালিকাভুক্ত ২৩ এনবিএফআইয়ের মধ্যে ১২টি অভিহিত মূল্যের নিচে কেনাবেচা হচ্ছে। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে ফারইস্ট ফাইন্যান্সের শেয়ার মাত্র ৯৬ পয়সা দরে কেনাবেচা হয়েছে। এক টাকার নিচে কেনাবেচা হচ্ছে আরও দুইটি। আর সর্বোচ্চ দর আইসিবির ৩৮ টাকা ৬০ পয়সা। এক সপ্তাহ আগে এ চিত্র আরও করুণ ছিল।
লভ্যাংশ বিতরণেও পতন
মুনাফায় থাকা ছয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচটি (আইডিএলসি, আইপিডিসি, লংকাবাংলা, ডিবিএইচ ও ন্যাশনাল হাউজিং) শেয়ারহোল্ডারদের স্টকসহ মোট ১৯৪ কোটি ২৮ লাখ টাকার লভ্যাংশ দিয়েছে এ বছর। আগের বছর সাতটি কোম্পানি দিয়েছিল ২৩২ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে লভ্যাংশের পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা বা ১৬ শতাংশ। খাতটির বাজারে আস্থাহীনতা এতটাই বেড়েছে যে গুটিকয়েক ভালো কোম্পানি ছাড়া বিনিয়োগকারীরা প্রায় সবাই এ খাতে বিনিয়োগে লোকসান করছেন।
ঋণ বিতরণে কাঠামোগত দুর্বলতা
ব্যাংকের বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল বিশেষায়িত অর্থায়ন করা। প্রথাগতভাবে যেখানে ব্যাংকের অর্থায়ন করার কথা নয়, সেই দীর্ঘমেয়াদি ও প্রকল্প অর্থায়ন করার কথা ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের। বাস্তবে ব্যাংক সব ধরনের অর্থায়ন করে, যেখানে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি এ খাত। ফলে ক্রমে পিছিয়ে পড়েছে। লাইসেন্স নেওয়ার সময় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের অর্থায়ন ব্যবসা করবে বলে ঘোষণা দিয়েছিল, তা রক্ষা করেনি কেউ। বাংলাদেশ ব্যাংকও তা তদারক করেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন ২০২৫-এর ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে এনবিএফআইগুলোর মোট বকেয়া ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৬১ কোটি টাকা, যা খাতটির মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
ব্যাংক ও এনবিএফআই: অসম প্রতিযোগিতা
আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মূল শক্তি ছিল দীর্ঘমেয়াদি, বিশেষায়িত ও প্রকল্প অর্থায়ন। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে একই ধরনের অর্থায়ন করছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তা নিয়ন্ত্রণ করা হয় না। ফলে এনবিএফআইগুলোর মূল বাজার সংকুচিত হয়েছে। বড় ও লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের কাছেই টাকা জমা রাখে এবং সেখান থেকে ঋণ নেয়।
ব্যাংকগুলো স্বল্প সুদে আমানত গ্রহণ করে কম সুদে ঋণ দিতে পারে। বিপরীতে এনবিএফআইগুলোকে ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে অর্থ ধার নিতে হয়, যা তারা আরও বেশি সুদে ঋণ হিসেবে দেয় অপেক্ষাকৃত দুর্বল গ্রাহককে, যাদের অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ব্যর্থ হয়। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ব্যাংক থেকে উচ্চসুদের আমানত নিয়ে আরও বেশি সুদে ঋণ বিতরণ করতে হচ্ছে এনবিএফআইকে।
অবসায়নের শঙ্কায় ৯টি
২০১৭ সালেই বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক পর্যালোচনায় প্রায় ১৭টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা হয়। যদিও তখন তা গোপন করা হয়েছিল, এমনকি পরিস্থিতি উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
এখন অতি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবসায়ন করার কথা ভাবছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, বর্তমানে এ খাতের ৯টি প্রতিষ্ঠান এমন অবস্থায় আছে, যাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় নেই। এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অবসায়ন করতে হবে। এগুলো হলো– পিপলস লিজিং, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, আভিভা ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিএফআইসি), প্রিমিয়ার লিজিং, জিএসপি ফাইন্যান্স এবং প্রাইম ফাইন্যান্স।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিমত
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক এনবিএফআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অনেকটা হাতে ধরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে মেরে ফেলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তরা যেমন জড়িত ছিলেন; ব্যাংক খাতে ঋণের নামে যেমন লুট হয়েছে, তা এনবিএফআইতেও হয়েছে। কেউ কেউ তা ব্যক্তিগতভাবে লুট করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবই জানত, কখনও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংককেও দায় নিতে হবে।
ইউনিয়ন ক্যাপিটালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএনএম গোলাম সাব্বির বলেন, এ খাত ধ্বংসের নেপথ্যে একক কারও দায় নয়, এ দায় সম্মিলিত। এখন সময় এসেছে ভুল শুধরে নিয়ে সামনে এগোনোর। এ খাতসংশ্লিষ্ট হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের স্বার্থে শুধু নয়; একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির জন্য টেকসই অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়তে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
এনবিএফআই খাতের অস্তিত্ব এখন পুনর্গঠন, নীতি-সহায়তা ও সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করছে– এমন মত গোলাম সাব্বিরের। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকও স্বীকার করেছে, এনবিএফআই খাতের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।
এ জন্য কিছু সংস্কার পদক্ষেপ দরকার মত দিয়ে গোলাম সাব্বির বলেন, এই সংস্কারের মধ্যে থাকতে পারে দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প সুদে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন, দুর্বল প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ বা অবসায়ন, নতুন তত্ত্বাবধান কাঠামোতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং ব্যাংক ও এনবিএফআইয়ের অর্থায়ন স্পষ্টভাবে পৃথক করা। তবে যে কোনো প্রতিষ্ঠানকে নয়, যাদের সুশাসন মেনে ঋণ অর্থায়ন করে টাকা ফেরত নেওয়ার সক্ষমতা আছে তাদের নগদ সহায়তা দিতে হবে।
- বিষয় :
- আর্থিক প্রতিষ্ঠান
