ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্যোগ

মাটির পণ্যে বাঁশ-বেতের ফিউশন

মাটির পণ্যে বাঁশ-বেতের ফিউশন
×

নিজের শাে রুমে জান্নাতুল সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাবা চাইতেন জান্নাতুল চিকিৎক হবেন। তবে সৃজনশীলতার প্রতি আগ্রহ থেকে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে স্থাপত্যে পড়েছিলেন তিনি। কিছুদিন চাকরিও করেছিলেন। উদ্যোক্তা হওয়ার তাগিদে একসময় চাকরি ছেড়ে দিয়ে গড়েন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘ভূমি আর্টিসান’। প্রচলিত মাটির তৈরি বিভিন্ন পণ্যের সঙ্গে নিজের ডিজাইনে বাঁশ-বেতের ফিউশন করা পণ্য বিক্রি করে এখন মাসে লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন জান্নাতুল। কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন অনেক পরিবারের।

জান্নাতুলের মতে, নিজের স্বপ্নের সঙ্গে থাকলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সে দৃষ্টিকোণ থেকেই যুক্ত হয়েছেন মৃৎশিল্পের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাজারে প্রচলিত মাটির পণ্যগুলোর কোনো বৈচিত্র্য থাকে না। একইসঙ্গে এসব পণ্যের মানও খুব বেশি ভালো নয়। এখানেই ভূমি আর্টিসান অন্যদের চেয়ে আলাদা। তারা মাটির তৈজসগুলোকে আরও সূক্ষ্ম ও পরিণতভাবে তৈরি করার পাশাপাশি বাঁশ-বেতের সংমিশ্রণের পণ্যগুলোকে আধুনিক ও নান্দনিক হিসেবে তৈরি করছেন। বর্তমানে মাটির ডাইনিং সেট, পানির জগ, মগ, টি-সেটসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার্য পণ্য এবং ঘর সাজানোর শোপিস তৈরি করছে ভূমি আর্টিসান।

মৃৎ ও কারুপণ্য নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা অনেক আগে থেকেই ছিল উল্লেখ করে জান্নাতুল বলেন, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে থাকতাম ধানমন্ডি এলাকায়। ক্লাসের সময় বাদে বাকি সময়টা আড়ং বা যাত্রার ক্রাফটিং সেকশনে গিয়ে বসে থাকতাম। তখন অনেকে মনে করত আমি চাকরি খুঁজতে এসেছি, সিভি দিতে বলত। তবে, আমার লক্ষ্য ছিল আলাদা। হ্যান্ডমেইড পণ্য নিয়ে আমি সবসময়ই খুঁতখুঁতে ছিলাম। তাদের বাঁশ, বেত ও মাটির পণ্যগুলো হাতে ধরে বোঝার চেষ্টা করতাম কীভাবে বানানো হয়েছে। মূলত এখান থেকেই আমার আগ্রহ জন্মে ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে কাজ করার।’
বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে এখন ভূমি আর্টিসানের তিনটি ওয়্যারহাউস রয়েছে। সেখানে ৫ জন স্থায়ী কর্মী ছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছেন ৩০ জনের বেশি কারিগর।

করোনাকালে জন্ম ভূমি আর্টিসানের
স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময়েই বিয়ে করেন জান্নাতুল। ২০১৮ সালে স্নাতক পাস করে বের হলেও চাকরি বা ব্যবসায় যুক্ত হওয়া হয়নি। এর মধ্যেই জন্ম নেয় প্রথম সন্তান। তবে, পড়াশোনা শেষ করেও কর্মক্ষেত্রে যুক্ত না হওয়ায় জন্ম নেয় হতাশা। তবে, থেমে থাকতে চাননি।
জান্নাতুল বলেন, ‘সন্তানকে যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি সিভি বানিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করতাম তখন। শেষে ২০২০ সালে একটা আর্কিটেকচারাল ফার্মে জয়েন করি। তবে প্রচলিত চাকরিও আমার ভালো লাগত না। স্বপ্ন ছিল উদ্যোক্তা হবো। এটিই আমাকে এগিয়ে দিয়েছে।’

২০২০ সালের কভিডকালে ‘গৃহকাব্য’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলে ঘর সাজানোর জিনিসপত্র পোস্ট করতে শুরু করেন। এর মধ্যেই নিজের ঘরের জন্য বেত ও মেটাল ব্যবহার করে গাছের স্ট্যান্ড তৈরি করেছিলেন জান্নাতুল। এই স্ট্যান্ডের ছবি পোস্ট করেন গ্রুপে। সেখান থেকেই এই পণ্য কেনার জন্য প্রচুর মানুষ মেসেজ করেন। রাত জেগে এসব মেসেজের উত্তর দেন জান্নাতুল। ওই বছর আগস্টে প্রথম পণ্য সরবরাহ করেন চট্টগ্রামের এক গ্রাহকের কাছে। পরে ফেসবুক গ্রুপটির নাম বদলে রাখেন ‘ভূমি আর্টিসান’, জন্ম নেয় আজকের এই সফল উদ্যোগ।
বর্তমানে ফেসবুক গ্রুপ, পেজ এবং আলাদা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া ধানমন্ডি ও বনানীর দুটি প্রতিষ্ঠানের অফিসেও এসব পণ্য প্রদর্শনী ও বিক্রি করা হয়। 

পণ্য তৈরি ৬ ক্লাস্টারে, ৩০ জনের কর্মসংস্থান 
শরীয়তপুর, সাভারসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আলাদা ৬টি ক্লাস্টারে ভূমি আর্টিসান মাটি, বাঁশ ও বেতের কাজগুলো করে থাকে। মূলত, হস্তশিল্পীদের নিজেদের এলাকায় স্বচ্ছন্দ এবং কাঁচামালের সহজলভ্যতার বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে এ ক্লাস্টারগুলো করা হয়েছে।
জান্নাতুল বলেন, ‘এসব পণ্য তৈরিতে দক্ষ কারিগর খুঁজে পেতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। এই ধরনের পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ডিজাইনের চেয়ে কারিগরদের দক্ষতার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই, আমি সবসময় তাদের স্বাধীনতা দেই যাতে তারা নিখুঁত ফিনিশিং ও মানসম্মত পণ্য তৈরি করতে পারে। আমাকে কারিগরদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বাইরেও পরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠতে হয়।’ 
জান্নাতুল বলেন, ‘‘উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রায় ব্র্যাক ব্যাংকের কাছে আমি অনেক দিক থেকেই কৃতজ্ঞ। ব্র্যাক ব্যাংকের তারা উদ্যোক্তা মেলায় অংশগ্রহণ আমার নেটওয়ার্ক বাড়িয়েছে, পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে সাহায্য করেছে। ব্র্যাক ব্যাংক থেকে প্রতিবছর উদ্যোক্তা উন্নয়নে অনেক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ‘আমরাই তারা’সহ আমি গত বছর এরকম দুটি প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলাম। এর মধ্যে নেদারল্যান্ডস থেকে আসা প্রশিক্ষক আমাদের উদ্যোক্তা মানসিকতা ডেভেলপ করতে শিখিয়েছেন। কারণ, একজন উদ্যোক্তা অন্য অনেকের চাইতে আলাদা, তাদের প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী চিন্তার মধ্যে থাকতে হয়। ব্র্যাক ব্যাংকের প্রশিক্ষণ আমাকে অনেক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।” 
পণ্য বিক্রির টাকা সংগ্রহের পাশাপাশিব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা অ্যাপ ব্যবহার করা অনেক সহজ হওয়ায় এই অ্যাপের মাধ্যমে ঘরে বসেই সব ব্যবসায়িক লেনদেন সম্পন্ন করেন বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

×