ব্যাটারিতে চলছে স্পিনিং মিল
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে বিকল্প ভরসা
লিথিয়াম ব্যাটারিতে সঞ্চিত বিদ্যুতের সহায়তায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে আশুলিয়ার লিটল স্টার স্পিনিং মিলস সমকাল
আবু হেনা মুহিব
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
জ্বালানি সংকটে শিল্প খাত এখন বড় দুঃসময় পার করছে। গ্যাসের অভাবে ধুঁকছে বস্ত্র ও পোশাক খাতের উৎপাদন। টিমটিম করে যেসব কারখানা চালু রাখা হয়েছে, সেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম। গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ নেই, তার ওপর আছে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলা। এতে মাঝপথে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় থাকা বস্ত্র কিংবা পোশাক তখন আর রপ্তানির উপযোগী মানসম্পন্ন হয় না। অর্থাৎ একে তো শিল্পের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না, আবার যতটুকু উৎপাদন হচ্ছে সেটুকুও বিদেশি ব্র্যান্ড-ক্রেতাদের শর্ত ও মান অনুসারে হচ্ছে না। এ রকম বস্ত্র ও পোশাকের গায়ে লাগছে পরিত্যক্ত পণ্যের ট্যাগ।
জ্বালানির অভাবে শিল্পের এই পরিণতির অভিঘাত বহুমুখী। আস্থা হারাচ্ছে ব্র্যান্ড-ক্রেতারা। রপ্তানি আয় ও আদেশ কমছে। উদ্যোক্তা রপ্তানিকারকরা পড়ছেন আর্থিক ক্ষতির মুখে। কারখানা মালিকের এই লোকসানের কারণে নিম্নতম মজুরি বোর্ড অনুযায়ী মজুরি পরিশোধ নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিকের আয়ে চলছে বড় কাটাকাটি। কারণ তাদের বেলায় ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে–‘কাজ নেই, তো মজুরি নেই।’
জানা গেছে, জ্বালানি সংকটের এই পরিণতি নিয়ে বিদেশি ক্রেতারাও এখন বেশ সতর্ক। তারা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন। সময়মতো পণ্য হাতে পাওয়া যাবে না–এ শঙ্কায় রপ্তানি আদেশ অন্তত ৩ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে তারা। যতটুকু রপ্তানি আদেশ আছে তাও সরবরাহ করা যাচ্ছে না বিঘ্নিত উৎপাদন পরিস্থিতিতে। দীর্ঘদিনের এই সংকট প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চরম আকার নিয়েছে।
বস্ত্র ও পোশাক খাতের এই দুর্দিনের বিপরীতে প্রায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনকাজ চলছে দেশের আশুলিয়ার চিত্রশাইলের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস কারখানায়। উৎপাদন, রপ্তানি, ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি, আয়-ব্যয় সব চলছে মোটামুটি ঠিকঠাক। বস্ত্র খাতের করুণ দশার বিপরীতে লিটল স্টারের এই বাজিমাতের রহস্য জাপানি প্রযুক্তির এক সেট লিথিয়াম ব্যাটারি। আস্ত কয়েকটি আলমারি আকারের এই ব্যাটারি জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে রাখে। গ্রিডের বিদ্যুৎ চলে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হয়ে ওঠে সরবরাহ। মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। লিটল স্টারের চাহিদার পুরো জোগান হয় না এতে। তবে জ্বালানির দুঃসময়ে বড় ধরনের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে এতে, যা দিয়ে মোটামুটি চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে উৎপাদন।
গত রোববার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিন দেখা যায়, লিটল স্টার স্পিনিং মিলস কারখানার আশপাশে আশুলিয়ার চিত্রশাইলের অন্যান্য কারখানায় আলো-আঁধারির মাঝে বসে অলস সময় পার করছেন শ্রমিকরা। পাশেই লিটল স্টার মিলসে সুতা তৈরির কাজ চলছে সশব্দে। কাঁচা তুলা প্রথমে জঞ্জালমুক্ত হয়। পরবর্তী প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে একের পর এক মেশিন পার হয়ে কুণ্ডলী পাকায়। পরিণত হয় মিহি সুতায়। কখনও তুলা-রেয়নের মিশেলে তৈরি হচ্ছে মিশ্র সুতা। মেশিনের টানে কখনও সুতা ছিঁড়ে যায়। মুহূর্তেই সেই ছেঁড়া সুতা জোড়া লাগিয়ে দিচ্ছে সারি বাঁধা রোবটগুলো। উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন কাউন্টের সুতা। কাউন্ট হলো সুতার সূক্ষতা বা স্থূলতা নির্দেশক। কাউন্ট যত বেশি, সুতা তত সূক্ষ্ম বা মিহি। উৎপাদিত বিভিন্ন কাউন্টের সুতা চলে যাচ্ছে ক্রেতার গোডাউনে। সারাবছর থাকে সুতার চাহিদা।
বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের এই ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন পণ্য উৎপাদনের সহায়তার পাশাপাশি ব্যয়সাশ্রয়ীও। প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় ব্যাটারি থেকে পাওয়া এই বিদ্যুতের ব্যয় ১৭ শতাংশ কম। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হয়ে ওঠে ব্যাটারির বিদ্যুৎ। উৎপাদন কাঠামো থাকে নির্বিঘ্ন। লিটল স্টার স্পিনিং মিলের উৎপাদন ক্ষমতা ৫৪ হাজার স্পিন্ডল।। সঞ্চিত বিদ্যুতে বড় উৎপাদন কাঠামোর সব বিভাগের অন্তত ৩ ঘণ্টা উৎপাদন চালানো যায়। বিকল্প উৎসের বিদ্যুতের এই ব্যবস্থার প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা বেশি। এ প্রযুক্তি মান, আকারের লিথিয়াম ব্যাটারির মূল উৎস থেকে সংগ্রহ করতে ব্যয় হয় পাঁচ হাজার ডলারের মতো। তবে ফরমায়েশ দিয়ে চীন থেকে অর্ধেকের মতো সাশ্রয়ী দামে তৈরি করে আনা হয়েছে লিটল স্টার স্পিনিং মিলের ব্যাটারি। সংরক্ষণ সক্ষমতা ৬০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। প্রাথমিক ব্যয় বেশি হলেও বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কম হওয়ায় চূড়ান্ত বিচারে এ ধরনের প্রযুক্তি সাশ্রয়ী। এর ফলে কম সময়ের মধ্যেই বাড়তি ব্যয় আবার উঠে আসে।
বিকল্প বিদ্যুতের এই ব্যবস্থা সম্পর্কে লিটল স্টার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাইকা একবার ঢাকায় বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে এই প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে একটা উপস্থাপনা দেয়। সেখান থেকে বোঝা গেল প্রযুক্তিটি যথেষ্ট ব্যয়বহুল। এ কারণে বিকল্প প্রযুক্তির বিষয়ে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেন তিনি। একপর্যায়ে ৬০০ কিলোওয়াট-ঘণ্টার এই লিথিয়াম ব্যাটারি তিনি চীন থেকে নিয়ে আসেন অনেকটা সাশ্রয়ী দামে। প্রাথমিক একটা বাড়তি ব্যয় হলেও সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে তার উৎপাদন ব্যয় ১৭ শতাংশ কম। এতে প্রতি মাসে যে পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হয়, তার মোট দাম দেড় কোটি টাকার মতো। তিনি বলেন, লিথিয়াম ব্যাটারির বাইরে সৌরবিদ্যুৎ, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও গ্যাস– এই মোট চার উৎসের যখন যেখান যতটুকু পাওয়া যায়–তা দিয়ে চলছে কারখানাটি। এতে লিথিয়াম ব্যাটারিই এখন বড় ভরসা। সব মিলিয়ে ৫০-৬০ শতাংশ উৎপাদন চালু রাখতে পেরেছেন।
- বিষয় :
- গ্যাস