সাক্ষাৎকার
সংকট কাটাতে নীতিগত সংস্কার ও সুদহার কমানো জরুরি
ড. আলী আফজাল, সভাপতি, রিহ্যাব
ড. আলী আফজাল সভাপতি, রিহ্যাব
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমকাল: আবাসন খাতে মন্দাভাব চলছে বলে জানাচ্ছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। আসলে পরিস্থিতি কী?
আলী আফজাল: আবাসন খাতে বর্তমানে মন্দাভাব চলছে, সেটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গত এক বছরে ফ্ল্যাট ও প্লটের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে পুরো দেশের বাজারকে একটি নির্দিষ্ট শতাংশ দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। এলাকা, প্রকল্পের ধরন ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর পরিস্থিতি ভিন্ন। নতুন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক প্রতিষ্ঠান সতর্ক। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ছোট ও মাঝারি ডেভেলপাররা। কারণ, তাদের পুঁজি সীমিত, ব্যাংক ঋণের খরচ বেশি এবং বিক্রি কমে গেলে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হয়।
সমকাল: বিক্রি কমার মূল কারণ কী?
আলী আফজাল: এখনও অনেক ক্রেতা আছেন, কিন্তু সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। পরিস্থিতি দেখছেন। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। তার ওপর গৃহঋণের সুদ বেশি। আগে একজন মধ্যবিত্ত ক্রেতা যে ঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কিনতে পারতেন, এখন আয় না বাড়াতে সেই কিস্তি বহন করা কঠিন।
সমকাল: গত দুই-তিন বছরে নির্মাণ ব্যয় কতটা বেড়েছে? বিক্রিতে মন্দাবস্থার মধ্যে দাম কমানোর সুযোগ আছে কিনা?
আলী আফজাল: প্রায় সব নির্মাণসামগ্রীর দামই বেড়েছে। জমির দামও বেড়েছে। নির্মাণ ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার পুরোটা ফ্ল্যাটের দামে যোগ করা হয়নি। কারণ, বাজারে ক্রেতা কম। ডেভেলপার পুরো বাড়তি ব্যয় ক্রেতার ওপর চাপালে ফ্ল্যাট বিক্রি আরও কঠিন হতো। অনেক প্রতিষ্ঠানই মুনাফা কমিয়ে কাজ করছে। কেউ কেউ নতুন প্রকল্পের কাজ ধীরে ধীরে করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম কমানোর সুযোগ সীমিত। সরকারের নীতিসহায়তার মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো গেলে ফ্ল্যাটের দাম সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব।
সমকাল: গৃহঋণের উচ্চ সুদ আবাসন বাজারকে কতটা প্রভাবিত করছে?
আলী আফজাল: ঋণের সুদ ১১ থেকে ১৪ শতাংশের আশপাশে। এই সুদে ৫০ লাখ বা এক কোটি টাকার ঋণ নিলে মাসিক কিস্তি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে যায়। ফলে অনেকে ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না। সুদহার এক অঙ্কে নামানো দরকার। ঋণের মেয়াদ দীর্ঘ করা এবং ডাউন পেমেন্টের বিষয়গুলোও বাস্তবসম্মত করা প্রয়োজন।
সমকাল: রিহ্যাব বিশেষ আবাসন তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছে। এই সুবিধা পেলে ক্রেতা নাকি ডেভেলপার–কারা কীভাবে উপকৃত হবেন?
আলী আফজাল: সরাসরি ক্রেতা উপকৃত হবেন। কারণ, বিশেষ তহবিলের উদ্দেশ্য হবে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া। একজন ক্রেতা ৮-৯ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পেলে তাঁর মাসিক কিস্তি অনেকটাই কমে আসবে। তখন তিনি ফ্ল্যাট খুঁজবেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই বিক্রি বাড়বে।
সমকাল: কর ও নিবন্ধন ব্যয় আবাসন বাজারের সংকট কতটা বাড়াচ্ছে?
আলী আফজাল: জমি, নির্মাণসামগ্রী, শ্রম, ব্যাংক ঋণের সুদ, অনুমোদন, ভ্যাট, কর এবং নিবন্ধন–বিভিন্ন পর্যায়ে ফ্ল্যাটের খরচ যুক্ত হয়। নির্মাণসামগ্রীর ওপর কর বাড়লে সেটিও শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দামের ওপর পড়ে। আবার নিবন্ধনের সময় ক্রেতাকে বড় অঙ্কের অর্থ দিতে হয়। তবে জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর নতুন কর আরও বড় সংকট তৈরি করছে। আবাসনকে বিলাসপণ্য হিসেবে না দেখে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে। কর ও নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে।
সমকাল: মধ্যবিত্তের জন্য আবাসন কতটা নাগালের মধ্যে আছে?
আলী আফজাল: তাদের জন্য ফ্ল্যাট কেনা কঠিন হয়ে উঠছে। মধ্যবিত্তের চাহিদা ছোট ও সাশ্রয়ী ফ্ল্যাট। ডেভেলপারকে শুধু কম দামের ফ্ল্যাট বানাতে বললেই হবে না; তাকে কম খরচে বানানোর সুযোগও দিতে হবে। সরকার যদি স্বল্পসুদের দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণ দেয়, কর সুবিধা দেয় এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করে, তাহলে ছোট আকারের সাশ্রয়ী ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
সমকাল: আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে বড় বাধাগুলো কী?
আলী আফজাল: প্রকল্পের অনুমোদন পেতে অনেক সময় লাগে। শুধু রাজউক নয়, বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন, নকশা, জমির ব্যবহার, ভবনের উচ্চতা, ইউটিলিটি এবং অন্যান্য বিষয় সমন্বয় করতে হয়। অনুমোদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল ও সময় সীমাবদ্ধ হোক। একটি কার্যকর ওয়ান স্টপ ব্যবস্থা থাকুক; যেখানে একজন উদ্যোক্তাকে একাধিক জায়গায় ঘুরতে না হয়। পরিকল্পনা ও পরিবেশের বিষয়গুলো অবশ্যই থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবায়নযোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব ব্যবস্থাও দরকার।
সমকাল: অনেক ডেভেলপারের বিরুদ্ধে প্রকল্প শেষ করতে বিলম্ব, টাকা নিয়ে কাজ বন্ধ রাখা, অনুমোদনের বাইরে নির্মাণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে রিহ্যাব কী ব্যবস্থা নিচ্ছে?
আলী আফজাল: কারও বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। তবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যার কারণে আবাসন খাতের সব প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে দেখা উচিত নয়। রিহ্যাব সদস্যদের জবাবদিহির মধ্যে রাখে এবং ক্রেতাদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। তবে ফ্ল্যাট কেনার আগে প্রতিষ্ঠানের রিহ্যাব সদস্যপদ, কোম্পানির বিগত সময়ের কার্যক্রম, প্রকল্পের অনুমোদন, জমির কাগজপত্র এবং চুক্তির শর্ত ভালোভাবে যাচাই করা দরকার। ডেভেলপারদেরও সময়মতো প্রকল্প হস্তান্তর, স্বচ্ছ চুক্তি এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ নিশ্চিত করতে হবে।
সমকাল: আগামী পাঁচ বছরে এ খাতকে কোন অবস্থানে দেখতে চান?
আলী আফজাল: আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ শিল্পের সঙ্গে সিমেন্ট, রড, সিরামিকসহ সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২৬৯টি শিল্পখাত জড়িত। এ খাতের প্রবৃদ্ধি মানেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পায়নে গতি তথা অর্থনীতি শক্তিশালী হওয়া। আগামী পাঁচ বছরে এমন আবাসন খাত দেখতে চাই যা হবে পরিকল্পিত, প্রযুক্তিনির্ভর, পরিবেশবান্ধব, বিনিয়োগবান্ধব এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী। সরকার ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জসিম উদ্দিন বাদল
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার