কার্ডের ব্যবহার ও লেনদেন পাঁচ বছরে দ্বিগুণ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
পকেটে নগদ টাকা রাখার দিন যেন ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে। একসময় যে কেনাকাটা বা লেনদেনের জন্য মানুষকে সব সময় সঙ্গে বড় অঙ্কের নোট রাখতে হতো, এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে ছোট্ট একটি প্লাস্টিকের কার্ড। বর্তমান সময়ে ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড এবং প্রি-পেইড কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন ক্রমে প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সম্প্রতি কার্ডের ব্যবহার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে দেশে কার্ড ব্যবহারের হার এবং লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
যদিও সাম্প্রতিক তথ্যে কিছুটা ভিন্ন চিত্রও আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় চলতি বছরের জুন শেষে দেশের বাজারে ইস্যুকৃত ব্যাংকিং কার্ডের সার্বিক সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ডেবিট কার্ড সামান্য কমলেও দেড় লাখের বেশি কমেছে ক্রেডিট কার্ড। তবে এ ধারার বিপরীতে বেড়েছে প্রি-পেইড কার্ডের সংখ্যা। মূলত বিদেশ ভ্রমণে যেতে অনেকে নগদের পরিবর্তে কার্ডে লেনদেনের জন্য প্রি-পেইড কার্ড নিচ্ছেন। অবশ্য প্রি-পেইড কার্ড ইস্যু বাড়লেও দেশে ডেবিট কার্ড, বিদেশে ক্রেডিট কার্ডেই বেশি লেনদেন হয়।
গত ৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে কার্ড ইস্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। ২০২১ সালের জুলাই মাসে যেখানে ক্রেডিট, ডেবিট এবং প্রি-পেইড কার্ডের মোট সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৬৩ লাখের কিছু বেশি, ২০২৬ সালের জুন নাগাদ তা বেড়ে পাঁচ কোটি ১৭ লাখ ছাড়িয়েছে।
শুধু কার্ডের সংখ্যাই বাড়েনি, লেনদেনের পরিমাণও সমানতালে বেড়েছে। এই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৯১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৮১৩ কোটি টাকায়।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিগত অভিযোজন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন। বিশেষ করে কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে কেনাকাটায় পাওয়া বিভিন্ন ছাড় এবং ব্যবহারের সুবিধা মানুষকে কার্ডের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে।
ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার বেশি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে
বাংলাদেশের ব্যাংকের প্রতিবেদনে থাকা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের ভেতরে ক্রেডিট কার্ডে গত মে মাসের তুলনায় জুন মাসে লেনদেন বেড়েছে ৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ৫০ দশমিক ৯৫ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি লেনদেন হচ্ছে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের সহজলভ্যতা, কার্ডের মাধ্যমে পেমেন্টে বিভিন্ন অফার এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার ফলে সাধারণ মানুষ এখন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কার্ড ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
এ ছাড়া খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সেবা গ্রহণ (১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ), ইউটিলিটি বিল পরিশোধে (৮ দশমিক ২৭ শতাংশ) ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। মজার বিষয় হলো, ক্রেডিট কার্ডের মোট লেনদেনের ৯১ দশমিক ১১ শতাংশই খরচ করা হয়েছে কেনাকাটায়। আর নগদ টাকা উত্তোলনে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। নগদ অর্থ উত্তোলনে সুদহারসহ অন্য খরচ অনেক বেশি হওয়ায় ক্রেডিট কার্ড থেকে নগদে টাকা গ্রহণ কম।
সাম্প্রতিক প্রবণতা
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বাজারে মোট কার্ডের সংখ্যা কমেছে এক লাখ ৫৪ হাজার ৮০২টি। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে যেখানে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রি-পেইড মিলিয়ে মোট কার্ড ছিল পাঁচ কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৭৩টি। গত জুন শেষে তা নেমেছে পাঁচ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার ৯৭১টিতে।
সার্বিকভাবে কার্ডের সংখ্যা কমার কারণ ক্রেডিট কার্ড। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে যেখানে ব্যাংকগুলোর ইস্যুকৃত ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ এক হাজার ৪৯০টি, গত জুন শেষে তা এক লাখ ৫০ হাজার ৯৭৭টি কমে ২৭ লাখ ৫০ হাজার ৫১৩টিতে নেমেছে।
একই সময়ে ডেবিট কার্ডের সংখ্যায় বড় ধরনের পরিবর্তন না হলেও কিছুটা কমেছে। ডিসেম্বরের চার কোটি দুই লাখ ৮৯ হাজার ৮১০টি ডেবিট কার্ড থেকে ২১ হাজার ৬৪টি কমে জুনে এর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে চার কোটি দুই লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৬-তে।
তবে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের সংখ্যা কমলেও প্রি-পেইড কার্ডের বাজারে বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। এই ছয় মাসে প্রি-পেইড কার্ডের সংখ্যা ১৭ হাজার ২৩৯টি বেড়ে ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার ৪৭৩টি থেকে ৮৬ লাখ ৯৬ হাজার ৭১২টিতে উন্নীত হয়েছে।
দেশে প্রি-পেইড কার্ডের সংখ্যা বাড়লেও ব্যবহারে এর তুলনায় ক্রেডিট কার্ড অনেকটা এগিয়ে। এমনকি কিছু ব্যাংক ডেবিট কার্ডেও দেশের বাইরে ডুয়াল কারেন্সি কার্ড সুবিধা দেওয়ায় এর ব্যবহার ক্রমে বাড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশি কার্ডধারীরা দেশের বাইরে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশিরা ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রি-পেইড কার্ডের মাধ্যমে দেশের বাইরে সর্বমোট পাঁচ হাজার ৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। আর গত বছরের জুলাই থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত এক বছরের এর পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৫৫৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
দেশের বাইরে কার্ডের মাধ্যমে খরচের ক্ষেত্রে কার্ডভিত্তিক আলাদা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরাবরের মতোই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি খরচ করছেন বাংলাদেশিরা। গত জুনে দেশের বাইরে মোট এক হাজার ৩৭ কোটি টাকার লেনদেনের মধ্যে ৫৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকাই খরচ হয়েছে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে।
এর ঠিক পরের অবস্থানেই রয়েছে ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড, যার মাধ্যমে জুনে খরচ হয়েছে ৪২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। আর প্রি-পেইড কার্ডের মাধ্যমে জুনে আন্তর্জাতিক লেনদেন হয়েছে মাত্র ৬১ কোটি ১০ লাখ টাকা।
এর আগের মাসের চিত্রও ছিল প্রায় একই রকম। এ সময় বিদেশে বাংলাদেশিরা ক্রেডিট কার্ডে ৪২৫ কোটি টাকা, ডেবিট কার্ডে ৩৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং প্রি-পেইড কার্ডে ৫১ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। মে মাসের তুলনায় জুন মাসে এসে সব ধরনের কার্ডেই দেশের বাইরে বাংলাদেশিদের ব্যবহার বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে কার্ডের ব্যবহার বেশি
কেবল দেশের ভেতরেই নয়, বিদেশে ভ্রমণ বা কাজের সূত্রে গিয়ে কার্ডের মাধ্যমে অনেকে লেনদেনে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। গত জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইস্যু করা কার্ডের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৭ কোটি টাকা, যা মে মাসের তুলনায় ২৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ বেশি।
দেশের বাইরে খরচের তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছেন ক্রেডিট কার্ডধারীরা। তারা বিদেশে মোট ৫৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এর পরই আছে ডেবিট কার্ড (৪২৩ কোটি ২০ লাখ টাকা) এবং প্রি-পেইড কার্ড (৬১ কোটি ১০ লাখ টাকা)।
দেশভিত্তিক তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশি কার্ডধারীরা সবচেয়ে বেশি খরচ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে (১৫ দশমিক ৯২ শতাংশ)। এর পরের অবস্থানে আছে সৌদি আরব (৯ দশমিক ৪১ শতাংশ), যুক্তরাজ্য (৯ দশমিক ২১ শতাংশ) এবং ভারত (৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ)। এ ছাড়া থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন ও মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশিদের কার্ডের মাধ্যমে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
গত জুনে বিদেশি নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে কার্ডের মাধ্যমে খরচ করেছেন ২৪২ কোটি টাকা। বাংলাদেশে খরচ করা বিদেশিদের মধ্যে শীর্ষস্থানে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা (২০ দশমিক ৬০ শতাংশ)। এর পরই আছেন যুক্তরাজ্য এবং ভারতের নাগরিকরা।
বৈচিত্র্যময় ব্যবহার
বিদেশে যাওয়ার সময় মানুষ এখন আর শুধু নগদ ডলারের ওপর নির্ভর করেন না। ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড এবং প্রি-পেইড কার্ড এখন ট্রাভেলারদের প্রিয় সঙ্গী। বিদেশে ডেবিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সরকারি ফি বা সেবা নিতে মানুষ এই কার্ড সবচেয়ে বেশি (২২ দশমিক ১৯ শতাংশ) ব্যবহার করছেন। এরপর ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ খরচ হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে এবং ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ খরচ হয়েছে ব্যবসায়িক কাজে।
প্রি-পেইড কার্ডের ক্ষেত্রেও সরকারি সেবা নেওয়ার হার সবচেয়ে বেশি (২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ)। এ ছাড়া নগদ টাকা উত্তোলনে ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ১৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ খরচ করা হয়েছে।
প্রি-পেইড কার্ডের দ্রুত প্রসার
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রি-পেইড কার্ড বর্তমানে দেশের দ্রুততম বর্ধনশীল কার্ড সেগমেন্ট। ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ডেবিট কার্ডের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ এবং ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা ৩০ শতাংশ বাড়লেও প্রি-পেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে অভাবনীয় ১৫৭ শতাংশ।
মানুষের হাতে তাৎক্ষণিক খরচের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা রাখার প্রবণতা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছাড়াই পেমেন্ট সুবিধার কারণে প্রি-পেইড কার্ড তরুণ প্রজন্ম ও ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। আর ২০২১ সালের জুলাই থেকে হিসাব করলে প্রি-পেইড কার্ড ইস্যুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৮১১ শতাংশ। দেশে বর্তমানে ৬১টি তপশিলি ব্যাংক এবং ৩৫টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সেবা প্রদান করে। এর মধ্যে ৫৬টি ব্যাংক এবং একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্ড সেবা প্রদান করছে।
- বিষয় :
- ব্যাংক