দুর্যোগের আগে অর্থায়ন ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা কিংবা তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর আঘাত হানে। এসব দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নষ্ট হয় কৃষকের গবাদি পশু, ফসল ও উৎপাদনশীল সম্পদ। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ স্থগিত করে। পরিবারকে বিক্রি করতে হয় সঞ্চয় বা উৎপাদনশীল সম্পদ। ফলে দুর্যোগের ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়; এর প্রভাব দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিয়মিত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বছরে প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) কমে যেতে পারে। ভয়াবহ বন্যার বছরে এই ক্ষতি জিডিপির ৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলাকে কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় নতুন একটি ধারণা সামনে এসেছে ফোরকাস্টবেসড্ ফাইন্যান্সিং বা পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনারসের সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, কীভাবে দুর্যোগের পূর্বাভাসকে আগাম অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করে বাংলাদেশ ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্পদ রক্ষা করতে পারে। নিবন্ধটি লিখেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরামর্শক নওরীন তাসনিম।
নিবন্ধে বলা হয়, প্রচলিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামো সাধারণত এমন–দুর্যোগ, ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ ছাড় এবং এরপর পুনরুদ্ধার। কিন্তু পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়নে এই প্রক্রিয়া উল্টে যায়। আবহাওয়া বা দুর্যোগের পূর্বাভাস নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছালে আগে থেকেই অর্থ ছাড় করা হয় এবং সেই অর্থ দিয়ে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান দুর্যোগের আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক। যেমন, বন্যার আগেই কৃষক গবাদি পশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারেন, কৃষি উপকরণ রক্ষা করতে পারেন। ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য ও মজুত নিরাপদ করতে পারে। স্থানীয় প্রশাসনও আগেভাগে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সম্পদ প্রস্তুত রাখতে পারে। ফলে একই পরিমাণ অর্থ দুর্যোগের পরে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার পরিবর্তে আগে ব্যয় করলে অনেক বড় ক্ষতি এড়ানো সম্ভব।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এই ধারণার পক্ষে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আগাম পদক্ষেপে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ ডলার থেকে ক্ষতি ও অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৭ ডলার পর্যন্ত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশে এর কার্যকারিতার বাস্তব প্রমাণও পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও বিশ্বব্যাংকের একটি পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে বন্যাপ্রবণ বাংলাদেশ ও নেপালের কিছু পরিবারকে বন্যার সর্বোচ্চ সময়ের আগেই নগদ অর্থ দেওয়া হয়। পরে দেখা যায়, আগাম অর্থ পাওয়া পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা তুলনামূলক ভালো ছিল এবং তাদের সংকট মোকাবিলায় উৎপাদনশীল সম্পদ বিক্রি বা অন্যান্য ক্ষতিকর পদক্ষেপের ওপর নির্ভরতা কমেছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু মানুষ জানে না যে দুর্যোগ আসছে–অনেক সময় তারা জানলেও আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার মতো নগদ অর্থ তাদের হাতে থাকে না।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় অনেক অবকাঠামো ইতোমধ্যেই রয়েছে। ২০২৪ সালে ডব্লিউএফপি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০টি জেলায় ১৫টি আগাম পদক্ষেপের কর্মসূচি চালু করে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার মানুষকে দুর্যোগ আঘাত হানার আগেই সহায়তা দেয়।
ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে বড় শক্তি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নিবন্ধিত হিসাব ছিল ২৩ কোটি ৮০ লাখের বেশি। ফলে দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়া গেলে দ্রুত ও সরাসরি মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে।
- বিষয় :
- দুর্যোগ মোকাবিলা