ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার : এ. কে. এম. জহিরুল হক

পরিবেশবান্ধব রূপান্তর ব্যবসার খরচ কমায়

পরিবেশবান্ধব রূপান্তর  ব্যবসার খরচ কমায়
×

এ. কে. এম. জহিরুল হক প্রকল্প সমন্বয়কারী স্মার্ট প্রকল্প, পিকেএসএফ

জাহিদুর রহমান 

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল: স্মার্ট প্রকল্পের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতের কোন কোন সমস্যার সমাধান করতে চায় পিকেএসএফ?

এ. কে. এম. জহিরুল হক: ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতের কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, পুঁজির ঘাটতি। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় পুঁজি অনেক সময় থাকে না। আবার তাঁদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নও সহজলভ্য নয়। এই ঘাটতি পূরণে স্মার্ট প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতের বড় একটি অংশ এখনও কম দক্ষ ও পুরোনো প্রযুক্তির বেড়াজালে আটকে আছে। ফলে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না। এ পরিস্থিতি থেকে উদ্যোক্তাদের বের করে আনতে প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণে সহায়তা করা হচ্ছে। এর একটি ভালো উদাহরণ বগুড়ার হালকা প্রকৌশল খাত। সেখানে উদ্যোক্তারা কয়লাচালিত চুল্লির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক চুল্লি স্থাপন করেছেন। একই সঙ্গে প্রচলিত হাতে পরিচালিত যন্ত্রের পাশাপাশি কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহার করছেন। এতে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তৃতীয় বিষয় হলো পরিবেশগত সচেতনতা ও উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সম্পদ হলো জ্বালানি ও পানি। এগুলোর অপচয় কমিয়ে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ সাশ্রয় করছেন। আবার সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করার উদাহরণও তৈরি হয়েছে। স্মার্ট প্রকল্পের লক্ষ্য হলো ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোগকে এ ধরনের বিভিন্ন সেবার আওতায় নিয়ে আসা। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতে সবুজ প্রবৃদ্ধির গতি আরও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।

সমকাল: কারখানাকে পরিবেশবান্ধব করা এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, এটি এক ধরনের মানসিকতা ও কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তনও। এ ক্ষেত্রে আপনি কতটুকু আশাবাদী?

এ. কে. এম. জহিরুল হক: আপনি ঠিকই বলেছেন। এটি নিছক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; বরং মানসিকতা ও কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তন। এই পরিবর্তন রাতারাতি ঘটে না। তবে মাঠপর্যায়ে আমরা যে অভিজ্ঞতা পাচ্ছি, তাতে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। যেসব উদ্যোক্তা একবার সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, তাঁরা নিজেরাই দেখতে পাচ্ছেন যে বর্জ্য কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের উৎপাদন খরচও কমছে। একই সঙ্গে কর্মী ধরে রাখার হারও বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি এবং ব্যবসায়িক লাভ পরস্পরবিরোধী নয়; বরং একে অপরের পরিপূরক। একজন উদ্যোক্তা যখন দেখেন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ একই সঙ্গে তাঁর ব্যবসার খরচ কমাচ্ছে এবং উৎপাদন বাড়াচ্ছে, তখন তিনি স্বাভাবিকভাবেই তা গ্রহণে আগ্রহী হন। আরেকটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একজন উদ্যোক্তা যখন একই এলাকার অন্য একটি কারখানার সফলতা নিজের চোখে দেখেন, তখন তিনিও অনুপ্রাণিত হন। সমকক্ষ উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে শেখার এই প্রক্রিয়া পরিবর্তনকে দ্রুততর করছে। আমরা মনে করি, দীর্ঘ মেয়াদে এই পরিবর্তন টেকসই হবে। কারণ, এটি উদ্যোক্তাদের ওপর বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়ম নয়। বরং তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারছেন যে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন পদ্ধতি তাঁদের ব্যবসার জন্যও লাভজনক। এটিই এই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

সমকাল: হালকা প্রকৌশল খাতে সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন পদ্ধতির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

এ. কে. এম. জহিরুল হক: হালকা প্রকৌশল বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্প। কৃষি যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পর্যন্ত নানা ধরনের পণ্য এই খাতের উদ্যোক্তারা তৈরি করেন। ফলে এ খাতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে পড়বে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রথম প্রভাব হবে উৎপাদন খরচ কমা এবং পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি। এর ফলে উদ্যোক্তারা দেশীয় বাজারে আরও ভালোভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন। একই সঙ্গে দূষণ কমলে কারখানা ও আশপাশের এলাকার পরিবেশগত স্বাস্থ্যও উন্নত হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হলে দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখাও সহজ হবে। জাতীয় পর্যায়ে এ খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও কাঁচামালের মতো সম্পদের দক্ষ ব্যবহার দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই রূপান্তর একটি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। হালকা প্রকৌশল খাতে সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সাফল্য অন্য ক্ষুদ্র শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদেরও অনুপ্রাণিত করবে। এভাবে দীর্ঘ মেয়াদে দেশে একটি সবুজ ও টেকসই ক্ষুদ্র উদ্যোগভিত্তিক শিল্পব্যবস্থা গড়ে ওঠার পথ তৈরি হবে।

 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর রহমান 

আরও পড়ুন

×