ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বগুড়ার ক্ষুদ্র শিল্পে সবুজ পরিবর্তন

বগুড়ার ক্ষুদ্র শিল্পে সবুজ পরিবর্তন
×

প্রথম ছবিতে ফাউন্ড্রি বর্জ্য, পরের ছবিতে বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব ব্লক। সম্প্রতি বগুড়া সদর উপজেলার সাবগ্রাম-কুরশাপাড়া এলাকা থেকে তোলা - সমকাল

জাহিদুর রহমান, বগুড়া থেকে ফিরে

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১০ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ার একটি ফাউন্ড্রি কারখানার আঙিনায় একসময় জমে থাকত কালচে স্ল্যাগ। লোহা গলানোর পর পড়ে থাকা শিল্পবর্জ্য ছিল কারখানার মালিকের কাছে বাড়তি ঝামেলা। সরাতে খরচ হতো, জায়গা দখল করে থাকত এবং পরিবেশ দূষিত হতো। এখন সেই বর্জ্যই অন্য কারখানার কাঁচামাল। স্ল্যাগ গুঁড়া করে তৈরি হচ্ছে হলো ব্লক, ইউনি ব্লক ও সলিড ব্রিকস। প্রতি মাসে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় আড়াই লাখ নির্মাণসামগ্রী।

বগুড়ার শিল্পাঞ্চলে এমন পরিবর্তনের গল্প অনেক। কোথাও কয়লার ফার্নেসের জায়গা নিয়েছে স্বয়ংক্রিয় ইন্ডাকশন ফার্নেস। কোথাও কারখানার ছাদে বসেছে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। কোথাও বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ব্যবহার হচ্ছে পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট (পিএফআই) প্রযুক্তি। পুরোনো লেদ মেশিনের পাশে জায়গা করে নিয়েছে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সিএনসি মেশিন। আবার কোথাও শ্রমিকের হাতে উঠেছে গ্লাভস, চোখে সুরক্ষা চশমা এবং মাথায় হেলমেট।

পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সম্পদ-সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন বা রিসোর্স-এফিশিয়েন্ট অ্যান্ড ক্লিনার প্রোডাকশন (আরইসিপি) পদ্ধতি। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) বাস্তবায়ন করছে সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট) প্রকল্প। দেশের ৫৪টি জেলায় বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে জলবায়ু সহনশীল, সম্পদ-দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করে তোলা। ২০২৮ সালের মধ্যে কৃষি, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সেবা খাতের প্রায় ৮০ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোগকে বিভিন্ন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে প্রকল্পটির।

বগুড়া ও নওগাঁয় প্রকল্পের সহযোগী সংস্থা গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (গাক)। হালকা প্রকৌশল খাতে প্রায় এক হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোগকে আরইসিপি পদ্ধতি গ্রহণে সহায়তা দেওয়ার কাজ করছে সংস্থাটি।

কয়লার ফার্নেস থেকে ইন্ডাকশন 
মো. শিহাব উদ্দিন সরকার ২০১৫ সালে বগুড়ায় সরকার মেটাল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং গড়ে তোলেন।  ২০২০ সালের দিকে এসে একসঙ্গে কয়েকটি ধাক্কা আসে। প্রতিষ্ঠানের প্রধান পণ্য টিউবওয়েলের বাজারে মন্দা দেখা দেয়। একই সময়ে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৫ থেকে বেড়ে ১০ টাকা হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। ২০২৪ সালে গাক-এর একটি কর্মশালায় অংশ নেন শিহাব। স্মার্ট প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত কর্মশালায় আরইসিপি নিয়ে আলোচনা হয়। তখনই তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়, উৎপাদন খরচ কমানো আর পরিবেশ রক্ষা দুটি কাজ একই সঙ্গে করা সম্ভব। এরপর প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং অর্থায়নের সুযোগ পান তিনি। ই-কমার্সভিত্তিক বিপণন ও পরিবেশগত সনদ নিয়েও প্রশিক্ষণ নেন। গাক-এর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকার কমন সার্ভিস ঋণ এবং স্বয়ংক্রিয় ইন্ডাকশন ফার্নেস স্থাপনের জন্য অনুদান পাওয়ার পর পুরোনো কয়লাভিত্তিক কাপোলা ফার্নেসের পরিবর্তে ইন্ডাকশন প্রযুক্তি গ্রহণ করেন।

মো. শিহাব উদ্দিন বলেন, নতুন প্রযুক্তিতে উৎপাদন ব্যয় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কমেছে। পণ্যের মান বেড়েছে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বর্জ্য প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কাপোলা ফার্নেসে কাঁচামালের প্রায় ১০ শতাংশ অপচয় হয় এবং প্রতি টন উৎপাদনে প্রায় ৫৫০ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়। এতে প্রতি টন উপকরণ উৎপাদনে প্রায় ২৫০ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের পাশাপাশি ১০০ কেজি কয়লা লাগে।

এই প্রযুক্তি শুধু দূষণ কমায়নি, উৎপাদনের সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। শিহাব তাঁর প্রতিষ্ঠানের জমিতে ১ হাজার ২০০টির বেশি কাঠ ও ফলদ গাছ লাগিয়েছেন। শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

ঢালাই বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব পণ্য 
বগুড়ার দ্বিতীয় বাইপাস সড়কের সাবগ্রাম-কুরশাপাড়া এলাকায় জেড এইচ স্টার ব্লকস অ্যান্ড ব্রিকসের কারখানায় ঢুকলে চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য। এক পাশে স্তূপ করে রাখা কালচে স্ল্যাগ। পাশে পাথরের গুঁড়া ও বালু। আরেক পাশে সিমেন্টের বস্তা। স্ল্যাগই এখন কারখানাটির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। ২০২০ সালে এখানে ‘হলো ব্রিকস’ উৎপাদন শুরু হয়। তৈরি হতো সলিড ব্রিকস, ইউনি ব্লক, হলো ব্লক ও রেজিং ব্লক। এত দিন এসব তৈরিতে সিমেন্ট, বালু ও পাথরের কুচি ব্যবহার করা হতো। পাথরের কুচি আনতে হতো বিদেশ থেকে। এক ঘনফুট পাথরের কুচির দাম ছিল প্রায় ১৪০ টাকা।

২০২৩ সালে গাক-এর কর্মকর্তারা পাথরের কুচির পরিবর্তে ফাউন্ড্রি স্ল্যাগ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। স্থানীয় একটি ফাউন্ড্রি থেকে স্ল্যাগ এনে পরীক্ষামূলকভাবে ইউনি ব্লক তৈরি করা হয়। গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য নমুনা পাঠানো হয় হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (এইচবিআরআই)। পরীক্ষায় স্ল্যাগ দিয়ে তৈরি ইউনি ব্লকের শক্তিমাত্রা ২ হাজার ১০৫ পিএসআই পাওয়া যায়।
জেড এইচ স্টার ব্লকস অ্যান্ড ব্রিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাখলিমুর রহমান বলেন,ফাউন্ড্রি স্ল্যাগ পুনর্ব্যবহার করে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন করায় পরিবেশ যেমন রক্ষা হচ্ছে, তেমনি উৎপাদন খরচও কমেছে।

কৃষিযন্ত্রে স্থানীয় উদ্ভাবন 
শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ ইউনিয়নের মহিপুর এলাকায় সরকার এগ্রো ইঞ্জিনিয়ারিং মাল্টিপল ওয়ার্কশপ। প্রায় দুই যুগ ধরে প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র তৈরি করছে। আমদানি করা যন্ত্রপাতির আদলে তৈরি হলেও এসব যন্ত্রের দাম তুলনামূলক কম। এখন প্রায় ৪০ ধরনের কৃষিযন্ত্র তৈরি হচ্ছে এখানে। 
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. সাইদুজ্জামান সরকার বলেন, এত দিন পুরো কারখানাটি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। স্মার্ট প্রকল্পের সহায়তায় এখন সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানো হয়েছে। প্রশিক্ষণের পর কর্মীদের গ্লাভস, মাস্ক, চশমা ও হেলমেট ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বিদ্যুতের অপচয় কমানোর চেষ্টা 
বিদ্যুৎ ব্যবহারে অপচয় সেটি কমানোর উদ্যোগও শুরু হয়েছে বগুড়ার কিছু হালকা প্রকৌশল কারখানায়। স্মার্ট প্রকল্পের সহায়তায় ব্যবহার করা হচ্ছে পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট বা পিএফআই প্রযুক্তি। মোটর, ওয়েল্ডিং মেশিন, লেদসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানোর সময় পাওয়ার ফ্যাক্টর কাঙ্ক্ষিত মাত্রার কাছাকাছি রাখতে সাহায্য করে এ ব্যবস্থা। ফলে একই পরিমাণ কার্যকর শক্তি ব্যবহারের জন্য অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বিদ্যুৎপ্রবাহ কমানো যায়। এ ধরনের প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎও। বগুড়ার কিছু হালকা প্রকৌশল কারখানার ছাদে বসানো হয়েছে সোলার প্যানেল। দিনের বেলায় উৎপাদনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রিডের বিদ্যুৎও নেওয়া হচ্ছে।

গাক-এর মাধ্যমে প্রকল্পের আওতায় রিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, রেদওয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস ও হক মেটাল ওয়ার্কশপকে মডেল ওয়ার্কশপ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এসব কারখানায় সোলার প্যানেলের পাশাপাশি পিএফআই, এলইডি বাতি ও স্বচ্ছ টিন ব্যবহার করা হয়েছে। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ফ্যান, ভেন্টিলেশন ও ইনসুলেশনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নিরাপদ কর্মপরিবেশ 
স্মার্ট প্রকল্পের আওতায় তাই শুধু প্রযুক্তি পরিবর্তন নয়, কর্মীদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এখন শ্রমিকের হাতে গ্লাভস, চোখে সুরক্ষা চশমা, মাথায় হেলমেট ব্যবহার হচ্ছে। কারখানার ভেতরে আলাদা করে চিহ্নিত করা হচ্ছে চলাচলের জায়গা। বৈদ্যুতিক সংযোগ নিরাপদ করার চেষ্টা চলছে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। আলো-বাতাস বাড়ানো হচ্ছে। যন্ত্রের চারপাশের অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল সরিয়ে কাজের জায়গা করা হচ্ছে আরও গোছানো। ভালো আলো-বাতাস, নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ, যন্ত্রের সুরক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা, পরিষ্কার মেঝে, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম–সবকিছুকেই টেকসই উৎপাদনের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পুরোনো লেদ থেকে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মেশিন 
হালকা প্রকৌশল খাতে এক সময় একটি যন্ত্রাংশ তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগত। মাপের সামান্য ভুল হলে পুরো ধাতব টুকরাটিই বাতিল হয়ে যেত। এখন কম্পিউটারে নকশা নির্ধারণ করে দিলে সিএনসি মেশিন নির্দিষ্ট মাপে একের পর এক যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারে।
সনাতন লেদ মেশিনের পাশাপাশি বসছে সিএনসি লেদ, মিলিং ও রাউটার মেশিন। এতে উৎপাদনে নির্ভুলতা বাড়ছে, কমছে কাঁচামালের অপচয়। আর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে আরইসিপির ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে আরও দক্ষ ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে ছোট কারখানাগুলো।

গাক-এর জ্যেষ্ঠ পরিচালক ড. মো. মাহবুব আলম বলেন, বিশ্বব্যাংক, পিকেএসএফ ও গাকের অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক দক্ষতা, জাতীয় নীতি এবং তৃণমূল পর্যায়ের নেটওয়ার্ককে এক জায়গায় এনেছে। সফল কারখানাগুলোকে ঘিরে উদ্যোক্তাদের মধ্যে পারস্পরিক শেখার একটি যোগাযোগও তৈরি হচ্ছে।
পিকেএসএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিয়র রহমান বলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোগে অদক্ষ সম্পদ ব্যবহার, অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং কর্মপরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় স্মার্ট প্রকল্প কাজ করা করছে। 

আরও পড়ুন

×