সত্য ঠেকিয়ে রাখা যায় না
জেড আই খান পান্না
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২৩ | ২০:২৭
বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন নিউইয়র্কের ম্যালকম এক্স এবং মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো, রাশিয়ায় ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন, চীনের মাও সে তুং এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম সূচিত হয়েছিল ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে। সর্বক্ষেত্রেই বিজয় সূচিত হয়েছিল ব্যক্তিকে কেন্দ্রে রেখে এবং সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। সেটা প্রাচীন রোম হোক, গ্রিস হোক বা পারস্য হোক বা আফ্রিকা হোক। সর্বক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি, ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠীতে প্রভাবিত হতে। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে কার্যক্রমের দিক থেকে বহুভাবে সংবিধানকে এড়িয়ে, পাশ কাটিয়ে এবং অবজ্ঞা করে নিজেদের মনমতো, যে যখন ক্ষমতাসীন, সে তার মনমতো, আইনবহির্ভূতভাবেও আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার বলে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেড়ে নিচ্ছে। এ রকম অনেক উদাহরণ বাংলাদেশে আছে, এভাবে চলছে, এবং ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা জনগণের কাছে এখন মাত্রাতিরিক্ত অসহনীয়। অসংখ্য মিডিয়া ও সংবাদপত্র আছে, অথচ তাদের ওপর জনগণের আস্থা নেই। এমতাবস্থায় আমরা দেখতে পাই আইসিটি আইন, পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন এবং তারও পরে সাইবার সিকিউরিটি আইন মূলত মত প্রকাশের বিপরীতে এবং আমলাতান্ত্রিকতার পক্ষে অবস্থান করছে। যেহেতু বিবিধ বিকল্প পথের মধ্যে মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মত প্রকাশের স্থান হিসেবে ব্যবহার করছে এবং সেখানেও যাতে কোনো ব্যক্তি স্বাধীনভাবে তার মত প্রকাশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে না করতে পারে, তাই তাদেরকেও এই আইনের আওতায় এনে এক ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
আমরা রামুর ঘটনা উল্লেখ করতে পারি। প্রকৃত অপরাধীর খোঁজ না করে উত্তম বড়ুয়া নামক এক ‘সংখ্যালঘুর’ নাম ব্যবহার করে যে তাণ্ডব রামুতে চালানো হয়েছে তা কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা কোনোদিন ভুলতে পারবে না। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে নাসিরনগরের ঘটনায় এক জেলে, যার অক্ষরজ্ঞান পর্যন্ত নেই, সেই রসরাজ নামের ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং বিবিধ তাণ্ডবলীলা চালানো হয়েছে। ফলে রসরাজ দাস এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে চট্টগ্রামে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছে। উল্লেখ্য, রসরাজ কিন্তু দীর্ঘকাল কারাভোগ করেছে পক্ষান্তরে যারা লুটপাট, অগ্নিসংযোগের সাথে জড়িত তাদের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। ঝুমন দাস তার ফেসবুকে হেফাজত নেতা মামুনুল হকের এক ভাষণের বিরোধিতা করে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য মন্তব্য সুপারিশ আকারে পেশ করেন প্রধানমন্ত্রী সমীপে। অতঃপর শালনা থানার জনৈক পুলিশ কর্মকর্তা বাদী হয়ে মামলা দিয়ে ঝুমন দাসকে গ্রেপ্তার করে। পরপরই স্থানীয় কিছু ব্যক্তি দলবদ্ধ হয়ে শালনা গ্রামের ৩০০ থেকে ৩৫০ হিন্দু জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে। অথচ এ ব্যাপারে পুলিশ নীরব। বাধ্য হয়ে ঘটনার দু’দিন পর ঝুমন দাসের মা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। আসামিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মের অনুসারী বিধায় তারা রাতারাতি জামিন পেয়ে যায়। অথচ মহামান্য হাইকোর্ট ঝুমন দাসের জামিন মঞ্জুর করেন প্রায় এক বছর পেরিয়ে। ইতিপূর্বে আরেক ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলায় কার্টুনিস্ট কিশোর ও লেখক মোস্তাককে গ্রেপ্তার করা হয়। এখনও মামলা ঝুলে আছে ফটোজার্নালিস্ট শফিকুল আলম কাজলের। বাংলাদেশের সব সংবাদপত্র থেকে উঠে গেছে কার্টুন। কোনো সংবাদপত্রের মালিক বা সম্পাদক বা রিপোর্টার বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না তিনি নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে তার মত প্রকাশ করতে পারেন। সেই সাহস আজ আর নেই। দু’একজন মফস্বল সাংবাদিক, স্থানীয় প্রশাসন বা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে এই আইনে কারাভোগ করেছেন। সর্বশেষে আমি একটি কথা উল্লেখ করতে চাই, ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমলে বিচারপতি মুহাম্মাদ রুস্তম কায়ানি আইয়ুব খানের ক্ষমতায় আরোহণের বিরুদ্ধে এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। তিনি নট দ্য হোল ট্রুথ, হাফ ট্রুথ, সাম মোর ট্রুথ বইগুলো লিখেছিলেন এবং সেজন্য আইয়ুব খান তাঁকে বরখাস্ত করেননি বা মামলা করেননি। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করা হয় তখন ঢাকার ইত্তেফাক, বরিশালের সাপ্তাহিক খাদেম, খুলনার দ্য ওয়েভ এগুলো বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করা হয়। তখন মুসলিম লীগ নেতা মাওলানা আকরম খাঁ মালিকানাধীন পত্রিকা দৈনিক আজাদে আগরতলা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার জন্য ফয়েজ আহমেদ দুঃসাহসিকতার সাথে মামলার সওয়াল জবাবসহ সমস্ত বর্ণনা দিয়ে লেখা প্রকাশ করেন। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৯-এর আন্দোলনের মাধ্যমে নিঃশর্ত মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু এবং পরবর্তী প্রেক্ষাপট আমাদের সকলেরই জানা। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনকে যে নামেই ডাকা হোক, সবটাই হলো মত প্রকাশে বাধা।
ভারতের অরুন্ধতী রায় বা অবিভক্ত ভারতের ইকবাল স্বদেশে নন্দিতের চেয়ে নিন্দিতই হয়েছেন যাঁর যাঁর সময়ে। ইকবাল তো ‘শিকওয়া’ লেখার কারণে আমৃত্যু কোনো ঈদের জামাত বা জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি সমগ্র বিশ্বের কাছে সমাদৃত এবং পঠিত। জুলিয়াস ফুচিকের “লেটারস ফ্রম গেলোস (ফাঁসির মঞ্চ থেকে) প্রকাশিত হয়েছে। এ থেকে কি আমরা এই শিক্ষা নিতে পারি না যে সত্য ধামাচাপা থাকে না? তার চেয়ে কি এই ভালো নয় যে মত প্রকাশে বাধা না এসে বরং বিকশিত হওয়ায় সহায়তা আসুক? মত প্রকাশের স্বাধীনতা যে আমাদের সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃত। সভ্যতার মাপকাঠি জামাকাপড়, রাস্তাঘাট, উঁচু ইমারতে সীমাবদ্ধ নয়, বরঞ্চ শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশের মধ্যে নিহিত, যা মত প্রকাশের স্বাধীনতার সাথে অঙ্গাঙ্গি জড়িত।
লেখক চেয়ারপারসন আইন ও সালিশ কেন্দ্র