খাগড়াছড়িতে সঙ্গী হবে নিসর্গ
দীঘিনালার তোজেংমা ছড়া ঝর্ণা -সমকাল
প্রদীপ চৌধুরী, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৬ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৪:১৪
পাহাড়, উপত্যকা, ঝর্ণা, সুড়ঙ্গ আর বিস্তৃত অরণ্যভূমি মিলে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যর এই জনপদ যেন বিস্তীর্ণ সবুজের বহুমাত্রিক এক সমারোহ।
সড়কপথে চট্টগ্রাম থেকে মানিকছড়ি আর ঢাকা থেকে রামগড়। যেদিক দিয়েই আসবেন, খাগড়াছড়ির সীমানার আগে থেকেই প্রকৃতি আপনাকে স্বাগত জানাবে, নিসর্গই যেখানে ভ্রমণে সঙ্গ এনে দেবে। প্রবেশের দুই দিকেই কাকতালীয়ভাবে পেয়ে যাবেন ফটিকছড়ির দুটি চা বাগান। খৈয়াছড়া ব্র্যাক টি এস্টেট আর রামগড় টি এস্টেট নামের এই দুটি চা বাগানে কিছুটা সময় কাটিয়ে এসে পড়বেন খাগড়াছড়ি জেলার ভেতরে। মানিকছড়ি সদরেই দেখতে পাবেন কয়েক শতাব্দী প্রাচীন মং রাজবাড়ি। যেটি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিরল অবদান রাখা এক স্মৃতিচিহ্ন। আর রামগড় তো মুক্তিযুদ্ধের অনেকটা ট্রানজিটওয়ের মতোই।
খাগড়াছড়ির আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে আলুটিলা, রহস্যময় গুহা, তারেং, রিছাং ঝর্ণা, দেবতাপুকুর, শতবর্ষী বিস্ময় বটগাছ, তৈদুছড়া ঝর্ণা, তোজেংমা ছড়া, তুয়ারি মাইরাং, জেলা পরিষদ পার্ক অন্যতম। এ ছাড়া অনেকে পানছড়ির অরণ্যকুটির, ভাইবোনছড়া মায়াবিনী লেক, শহরের নিউজিল্যান্ড বিলও ঘুরে দেখেন।
রহস্যময় গুহা আর তারেং
খাগড়াছড়ির প্রধান পর্যটন কেন্দ্র আলুটিলা। রহস্যময় গুহা এখানকার প্রধান আকর্ষণ। এ ছাড়া কেন্দ্রের ভেতরে দুটি ঝুলন্ত ব্রিজ, নন্দনপার্ক, অ্যাম্ফিথিয়েটার আপনাকে মুগ্ধ করবে। আলুটিলার চূড়া থেকে মন ভরে চোখজুড়িয়ে পুরো শহরটি আর প্রধানতম নদী চেঙ্গীর সর্পিল রূপ আপনাকে মুগ্ধতা এনে দেবে। সুড়ঙ্গে পথ চলার জন্য লাগবে টর্চলাইট বা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট। ভেতরে ঢুকতেই গা ছমছম শীতল জলের প্রলেপ, পাথুরে পথ বেয়ে জলের ধারা বয়ে যাচ্ছে সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে। মশালের আলোয় সুড়ঙ্গের ঘুটঘুটে অন্ধকার দূর করে সামনে এগোতেই মনে হবে এ এক প্রকৃতির অন্য খেলা। যেখানে পাহাড় ভেদ করেছে জলের অবিরত চলাচল। পাথুরে পিচ্ছিল পথের গুহায় হাঁটতে বেশ সাবধান হতে হয়।
এ ছাড়া আলুটিলা থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বে আরেক নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র তারেং। যেখানে বর্ষা মৌসুমে মেঘেরা এসে জড়াজড়ি করে আপনার চারপাশেই। নিরিবিলি ছবি তুলতে, ঘুড়ি ওড়াতে এবং স্নিগ্ধ সকাল কাটানোর এই এক নান্দনিক নিসর্গ। এখান থেকেও দেখা যায় শহর খাগড়াছড়ি।
রিছাং ঝর্ণা
খাগড়াছড়ি শহর থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে রিছাং ঝর্ণা। যেখানে এ পাহাড় ও পাহাড় থেকে নেমে আসা বিন্দু বিন্দু জল যেন নামছে উচ্ছল এক নদীর মতো।
রিছাংয়ের পথের দুই পাশের নানা বন আর বুনো প্রকৃতির মিতালী পথের ক্লান্তি ভোলাবে। ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় বসতি, প্রান্তিক জীবনধারা আর উৎপাদিত নানা ফল আর সবজির বাহারও মনের ভাবনার খোরাক জোগাবে।
দেবতা পুকুর
খাগড়াছড়ির আরেকটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র দেবতা পুকুর। পাহাড় চূড়ায় বৃহৎ এক প্রাকৃতিক জলাধার। দেবতা পুকুরে যেতে বেশ উঁচু পাহাড় বেয়ে উঠতে হয়। প্রায় এক হাজার ৬০০ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে দেখা মিলবে এই পুকুরের।
জেলা পরিষদ পার্ক
খাগড়াছড়ি শহরের সবচেয়ে অদূরের পর্যটনকেন্দ্র খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ পার্ক। শহরের শাপলা চত্বর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের দূরত্ব। ইজিবাইক, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এখানে যাওয়া যায়। এখানে আছে একটি ঝুলন্ত সেতু। পার্কজুড়ে নানা রং ও বর্ণের ফুল ও ফলের সমাহার।
মায়ুংকপাল বা হাতি মাথা পাহাড়
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার পেরাছড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত দুর্গম এলাকা মায়ুংকপাল পাড়া। এটি ত্রিপুরা অধ্যুষিত এলাকা। প্রাকৃতিকভাবে হাতির অবয়বে পাহাড়ের গঠন হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে এই জায়গা ‘মায়ুংকপাল বা হাতির মাথা’ হিসেবে পরিচিত। অনেক উঁচুতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। তাই এটিকে ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ও বলছেন বাসিন্দারা। খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কে অটোরিকশা, ইজিবাইক বা মাহিন্দ্রে চড়ে পেরাছড়া পৌঁছে চেঙ্গী নদী পেরিয়ে দেড়-দুই ঘণ্টা হেঁটে যাওয়ার পর উঁচু উঁচু পাহাড়। হাতির মাথার চূড়া থেকে খাগড়াছড়ির সুউচ্চ পাহাড় সারির সৌন্দর্য বেশ উপভোগ্য। পাহাড়ের চূড়ায় উঠলে পাখির চোখে দেখা যায় খাগড়াছড়ি জেলার বিশাল এলাকা।
মাটিরাঙ্গার শতবর্ষী বটবৃক্ষ
খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের তিন কিলোমিটারের মধ্যে মাটিরাঙ্গার শতবর্ষী বটবৃক্ষ। দূর থেকে ডালপালা দেখে অনেকগুলো গাছ মনে হলেও কাছে গেলেই বোঝা যায়, পুরোটা মিলে একটাই বৃক্ষ। মাতৃবৃক্ষের শাখা থেকে মাটিতে নেমে জন্ম নিয়েছে আরও অসংখ্য শাখাবৃক্ষ। সব ক’টি শাখা মূল গাছের সঙ্গে সংযুক্ত। প্রায় এক একর জায়গার এই বটগাছের ব্যাপ্তি সত্যিই এক বিস্ময়।
দীঘিনালার তোজেংমা ঝর্ণা
পৃথক দুটি জলের ধারা একই খুমে জলতরঙ্গ তুলেছে তোজেংমা ঝর্ণায়। জলযুগলের এই রূপ তোজেংমাতেই দেখা মেলে। পথ চলতে চলতে দেখা মিলবে জুম জীবনের সুখ-দুঃখের মিশেল এক রূপ। কোথাও জুমক্ষেত, যা শুধু সাধারণ চাষ নয়।
জুম ক্ষেতের পাশ দিয়ে যেতে হবে ঝিরি পর্যন্ত। ঝিরিপথ মানেই তো ট্র্যাকিংয়ের কষ্ট অর্ধেক কমে যাওয়া। বন্য পরিবেশের ঝিরির পানি কেটে কেটে সামনে যেতে হবে। বড়-ছোট পাথরে ভরা ঝিরির পথ। কোথাও কোথাও ঘন সবুজ আচ্ছাদন। বড় বড় লতা নেমেছে গাছের ওপর থেকে। দীঘিনালা থেকে সরাসরি মোটরবাইকে যেতে হবে বিষ্ণু কার্বারি পাড়া। পাড়া থেকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ৩০ মিনিটের মধ্যে ঝর্ণায় পৌঁছানো যাবে।
তৈদুছড়া এক ও দুই
পুরোটা পথ ট্র্যাকিং করতে হয়। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার জামতলী হয়ে ঢুকলে তুলনামূলক সহজ ট্রেইল পাওয়া যায়। ট্রেইলের ধরন– ঝিরি ও উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ। তবে তৈদুছড়া-১ থেকে তৈদুছড়া-২ যাওয়ার পথটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। আসা-যাওয়ায় ছয়-সাত ঘণ্টার ট্র্যাকিং।
তুয়ারি মাইরাং ঝর্ণা
দীঘিনালা উপজেলায় অবস্থিত ‘তুয়ারি মাইরাং’ ঝর্ণা। ত্রিপুরা ভাষার এই শব্দের বাংলা অর্থ– থালার আকৃতি। এটি খাগড়াছড়ি জেলার নতুনভাবে চেনা ঝর্ণাগুলোর মাঝে একটি। বর্ষাকালে ঝর্ণার পানিপ্রবাহ বছরের অন্য সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। প্রায় ১০০ ফুট উঁচু ঝর্ণাটি পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার সীমানা পাড়ায় অবস্থিত। গাড়িতে করে খাগড়াছড়ি সদর থেকে প্রথমে নয়মাইল এলাকায় নামতে হবে। সেখান থেকে সীমান্ত পাড়া হেঁটে যাওয়া যায়। সীমান্ত পাড়া থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিলে ‘তুয়ারি মাইরাং’ ঝর্ণার দেখা পাওয়া যাবে।
