বিস্ময়, ভয় আর মায়াবী সুন্দরবন
সুন্দরবনের তিনকোনা দ্বীপ। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনে পশু-পাখির মিতালি। ছবি- মারুফ হাসান আবিদ
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২২:০৩
ঘন সবুজে মোড়া জল আর জঙ্গলের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। একদিকে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের রহস্যময় উপস্থিতি, অন্যদিকে খালবিলে রোদ পোহানো কুমির, ছুটে চলা হরিণের পাল আর পাখির কোলাহল–সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির এক অনন্য মহাকাব্য। শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই এটি এক অমূল্য সম্পদ। বিস্ময়, ভয় আর মায়াবী রোমাঞ্চের হাতছানি যেন প্রতিটি পদে পর্যটককে ডাক দেয় গভীর অরণ্যের ভেতরে।
বাঘের মতোই সুন্দরবনের রহস্যময় আকর্ষণ ছড়িয়ে আছে নদী-খালজুড়ে। নিরিবিলি খালে গেলে দেখা মেলে বিশাল কুমিরের, কখনওবা হরিণের পাল ছুটে যায় চোখের সামনে। গাছে গাছে খেলা করে বানর, আকাশ ভরে ওঠে নাম না জানা পাখির কলতানে। তবে ভাটার সময় খালের পানি শুকিয়ে গেলে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়, যা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। জোয়ার আসতে সময় লাগে কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা। ততক্ষণে কুমির বা বাঘ হয়ে উঠতে পারে প্রাণহানির হুমকি।
দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলাজুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। এর আগেই ১৯৯২ সালে সুন্দরবন রামসার সাইট হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। বনটির পুরোটাই সংরক্ষিত; এর মধ্যে ৫৩ দশমিক ৫২ ভাগ এলাকা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত, যেখানে সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কটকা, কচিখালী, নীলকমল–এসব অভয়ারণ্য এলাকার মধ্যেই পড়েছে। বিশেষ অনুমতি নিয়ে ওই এলাকায় ভ্রমণ করা যায়।

কী নেই সুন্দরবনে
সুন্দরবনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উদয় হলে নির্দ্বিধায় পাল্টা প্রশ্ন করা যায়–কী নেই সেখানে। বাংলাদেশে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আশ্রয়স্থল এই বন। ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপে বনে ১২৫টি বাঘ রয়েছে বলে জানায় বন বিভাগ।
সুন্দরবনে রয়েছে ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিড। বিশ্বের প্রকৃত ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের ৩৫ প্রজাতির সব ক’টিই পাওয়া যায় এখানে। সুন্দরবনে রয়েছে প্রায় ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী, যার মধ্যে ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও আট প্রজাতির উভচর। ৩০০ প্রজাতির পাখির আবাস এ বনেই। সুন্দরী হাঁস বা কালামুখ প্যারা পাখি নামে পরিচিত মহাবিপন্ন মাস্কড ফিনফুট ২০০-২৫০টির বাস সুন্দরবনে। এ ছাড়া আছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৩ প্রজাতির কাঁকড়া ও ৪২ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক।
কখন ও কীভাবে যাবেন
নিষিদ্ধ কয়েক মাস ছাড়া সারাবছরই বনে ঘুরতে যাওয়া যায়। তবে সুন্দরবন ভ্রমণের সর্বোৎকৃষ্ট সময় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস। কারণ পানির ভেতর বেড়ে ওঠা বনে ঘোরার একমাত্র মাধ্যম নৌপথ। সমুদ্রের কোলঘেঁষে থাকা বনে যাতায়াত নদীগুলো বছরের অন্যান্য সময় থাকে উত্তাল। শীতের সময়টা নদী ও সমুদ্র শান্ত থাকায় সহজেই সব পর্যটন স্পটে ঘুরে বেড়ানো যায়।
সুন্দরবনের ভেতরে পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করেছে বন বিভাগ। এর মধ্যে লোকালয়ের কাছে তৈরি হওয়া পর্যটনকেন্দ্র করমজল, হাড়বাড়িয়া, আন্ধারমানিক, কলাগাছিয়া, কালাবগী ও শেখের টেকে এক দিনে ভ্রমণ করা যায়। এর জন্য আগে খুলনা, মোংলা অথবা সাতক্ষীরা যেতে হবে। সেখান থেকে যেতে হবে এসব কেন্দ্রে।
তবে কটকা, কচিখালী বা নীলকমলের মতো গভীর বনাঞ্চলে যেতে হলে কমপক্ষে দুই দিন সময় লাগবে এবং রাতে থাকতে হবে আবাসিক জলযানে। সম্প্রতি বনের পাশের এলাকায় গড়ে উঠেছে ইকো কটেজ, যেখানে কিছুটা হলেও বনের আবহ পাওয়া যায়।
বন ভ্রমণের খরচ
সুন্দরবন ভ্রমণের খরচ নির্ভর করে লঞ্চের মান, ভ্রমণস্থল এবং দিনের ওপর। সাধারণ লঞ্চে তিন দিন দুই রাতের ভ্রমণে জনপ্রতি আট থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। বিলাসবহুল লঞ্চে এ খরচ ১৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। খুলনা থেকে এসব ট্যুর শুরু হয়। অন্যদিকে এক দিনের ভ্রমণের জন্য খুলনা, মোংলা বা সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ থেকে ট্রলার ভাড়া করে কাছাকাছি পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ট্রলার ভাড়া এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে।
- বিষয় :
- ভ্রমণ
- পর্যটন কেন্দ্র
- সুন্দরবন
