ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যেতে হবে টেকসই পর্যটনের পথে

যেতে হবে টেকসই পর্যটনের পথে
×

আশিকুর রহমান সমী ও সাজিয়া আফরিন

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:০১ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৪:০২

গত বছর কলম্বিয়ার ক্যালি শহরের পাশে একটি জাতীয় উদ্যান– ফারালোনস দ্য ক্যালি ন্যাশনাল ন্যাশনাল পার্ক পর্যবেক্ষণের সুযোগ হয়। অর্থনৈতিকভাবে দেশটি আমাদের দেশ থেকে পিছিয়ে, কিন্তু আশ্চর্য হয়েছিলাম তাদের পরিচ্ছন্নতা এবং সৌন্দর্য দিয়ে প্রকৃতিকে সংরক্ষণ ও উপভোগের বিষয়টি দেখে। উদ্যানের বেশ কিছু অংশ আছে। তবে ঢোকার পথেই জানিয়ে দেওয়া হলো, কোনো রকম প্লাস্টিক বা পলিথিন নিয়ে সেখানে প্রবেশ একেবারে নিষিদ্ধ এবং স্থানীয় জনসাধারণ ও পর্যটকরা সেই নিয়মটি মেনে চলেছেন। ঢোকার পর প্রকৃতির নীরবতা বা নিস্তব্ধতায় মানুষের প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ বা প্রকৃতি থেকে প্রশান্তি খুঁজে পাওয়ার বিষয়গুলো চোখে পড়ল। যতটুকু হেঁটেছি, কোথাও কোনো প্লাস্টিক বা পলিথিন দূষণ নেই। নেই কোনো শব্দ, বায়ু বা আলো দূষণ। নেই কোনো রকমারি পণ্যের দোকান। শুধু একটি ছোট্ট টং ঘর, যা পার্কের মূল ফটকের বাইরে। এখানে তৈরি হয় স্থানীয়দের হাতে তৈরি হালকা নাশতা। 

এবার ফিরে আসি বাংলাদেশে। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ২০২৪ সালের শুরুর দিকের কথা। জঙ্গলের সামনে হরেক রকম বাহারি পণ্যের দোকান থেকে শুরু করে খাবার, প্রসাধনীসহ সবকিছুর দোকান, সংরক্ষিত এলাকার মধ্য দিয়ে হর্ন বাজিয়ে ছুটছে যানবাহন, পার্কে ঢুকছে যে যার মতো খাবার নিয়ে, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে হইহুল্লোড়, কেউবা উচ্চ শব্দে বাজাচ্ছে গান। বানর-হনুমান জাতীয় প্রাণী দেখলে সেখানে হচ্ছে মানুষের বিকৃতভাবে মজা নেওয়া। যত্রতত্র পলিথিন, প্লাস্টিক ফেলে স্থানটি করা হচ্ছে দূষিত। বেশির ভাগ পর্যটক হতাশ। কারণ তারা ‘কিছু দেখতে পায়নি’ এই ভেবে। সুনামগঞ্জের হাওরে হাউসবোটগুলো থেকে প্লাস্টিক, পলিথিন, দূষক পদার্থ, নির্গত তেল থেকে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে হাওর। 

আমাদের দেশে এখন প্রাকৃতিক পরিবেশে পর্যটন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন মনে জাগে, এ বিষয়ে মানুষ কতটা ওয়াকিবহাল আর কতটা সচেতন। পরিবেশবান্ধব পর্যটনে তারা কতটা আগ্রহী! পাশাপাশি তারা কি প্রকৃতির মাঝে আসলেই নৈসর্গিকতা খুঁজে পায়! প্রশান্তি নিয়ে নিজ আবাসস্থলে ফেরেন?

পর্যটনের নামে প্রাকৃতিক পরিবেশের দূষণ ঘটিয়ে প্রতিনিয়ত পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি আমরা। প্রাকৃতিক পরিবেশের এই দূষণের ফলে পর্যটন স্পটগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছে তাদের প্রাকৃতিক অবস্থা আর সৌন্দর্য, বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশের প্রাকৃতিক গুণাগুণ এবং হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। অথচ পৃথিবীতে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়, যা ইকোট্যুরিজম নামে পরিচিত। এর অন্যতম উদাহরণ কোস্টারিকা, যেখানে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূমি সংরক্ষিত বন ও জাতীয় উদ্যান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। ভুটান ‘উচ্চ মূল্য, নিম্ন প্রভাব’ নীতির মাধ্যমে সীমিত পর্যটক প্রবেশ নিশ্চিত করে এবং সংগৃহীত পরিবেশ কর ব্যবহার করে বন ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করে। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যটন চালু রয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটককে অনুমতি দেওয়া হয় এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় স্থানীয় গাইড বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নরওয়ের ফিয়র্ডসে দূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক ফেরি ও কার্বনমুক্ত ভ্রমণ চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে কেনিয়ার মাসাই মারা অঞ্চলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে। 

ভারতের কেরালা রাজ্যে ‘রেসপনসিবল ট্যুরিজম’ কর্মসূচি স্থানীয় জনগণকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখছে। পাশাপাশি তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সংরক্ষিত এলাকা বিশেষভাবে সংরক্ষণের। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার সিগিরিয়া ও ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে উঠেছে। নেপালের অন্নপূর্ণা সংরক্ষিত এলাকায় ইকোট্যুরিজমের আরেকটি সফল উদাহরণ, যেখানে ট্রেকিং পর্যটন থেকে প্রাপ্ত আয় স্থানীয় জনগণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণে ব্যবহার করা হয়। এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে, পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই ভ্রমণ নিশ্চিত করা সম্ভব। এক কথায় এটাই ইকোট্যুরিজম।

পরিবেশবান্ধব পর্যটনের নানা দৃষ্টান্ত বাংলাদেশকেও অনুপ্রেরণা দিতে পারে। বাংলাদেশের সুন্দরবন, সিলেটের চা-বাগান অঞ্চল, রাঙামাটির হ্রদ অঞ্চল বা কক্সবাজারে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। যদি ভুটান, নেপাল বা কেরালার মতো নীতি গ্রহণ করে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা হয়, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় আয় ব্যবহৃত হয়; তবে বাংলাদেশেও পরিবেশবান্ধব পর্যটন অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

পৃথিবীতে কোরাল দ্বীপ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের কয়েকটি সফল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশকেও অনুপ্রেরণা দিতে পারে। যেমন– অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে পর্যটন নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে প্রবাল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। মালদ্বীপে পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সৌরশক্তি ব্যবহার এবং কোরাল পুনর্গঠনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। একইভাবে পালাউ দ্বীপপুঞ্জে ‘প্রিসটিন প্যারাডাইস’ নীতির আওতায় পর্যটকদের কাছ থেকে পরিবেশ কর আদায় করা হয়, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ব্যয় হয়। এর তুলনায় বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপ একটি ভঙ্গুর কোরাল দ্বীপ, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক দূষণ ও অতিরিক্ত মাছ ধরা প্রবাল প্রাচীরকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন নীতি গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই দ্বীপ সংরক্ষণ করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব। কারণ যদি প্রকৃতিই ধ্বংস হয়ে পড়ে, তাহলে তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটনও টিকে থাকতে পারবে না।

পরিবেশবান্ধব পর্যটন টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য– সুন্দরবন, সিলেটের হাওর, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি, কক্সবাজার ও মহেশখালীর সমুদ্রসৈকত, প্রবাল দ্বীপ এবং নদী অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য– পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য অপরিসীম সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এই প্রাকৃতিক এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে এমনভাবে– যাতে বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার, পানি ও মাটির দূষণ, প্রবাল প্রাচীর ক্ষতি এবং অন্যান্য পরিবেশগত চাপ রোধ করা যায়। স্থানীয় জনগণকে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত করলে তারা বিকল্প আয়ের সুযোগ পাবে এবং প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য আরও দায়বদ্ধ হবে। কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম (সিবিটি) এবং হোমস্টে ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যটকরা স্থানীয় জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস, নৃত্য, গান, উৎসব ও হস্তশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হবে, যা সংস্কৃতি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট এবং পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের সময় পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সরকারের পক্ষ থেকে নীতি ও আইন প্রণয়ন, পর্যটন প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি কার্যক্রম পরিবেশবান্ধব পর্যটনের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে। 

আশিকুর রহমান সমী: বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ
সাজিয়া আফরিন: প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×