ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভাইরাল ভাইরাস

ভাইরাল ভাইরাস
×

হানিফ সংকেত, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:১৯ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:২২

ভাইরাল শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ভাইরাস থেকে। ভাইরাস যেমন দ্রুত ছড়ায়, তেমনি কোনো খবর, ছবি বা ভিডিও যখন মানুষের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে ভাইরাল বলা হয়। তবে ভাইরাল শব্দটির উৎপত্তি যেহেতু ভাইরাস থেকে– তাই এর অর্থ দেখে মনে হয় ভালো কিছুর বদলে বিষাক্ত, দূষিত, রোগ নামে ভূষিত কিছু মহামারির মতো সংক্রমিত হচ্ছে। কথায় আছে, ‘সুস্থতা সংক্রমিত হয় না– সংক্রমিত হয় রোগ’। ভাইরাসও যেহেতু এক ধরনের সংক্রমিত রোগ, সেই অর্থে ভাইরালও এক ধরনের রোগে পরিণত হচ্ছে। 

২০০০ সালে এই ভাইরাল শব্দটি জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ২০০৪ সালে ফেসবুক চালু হলেও ২০১০ সালের পর থেকে এটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে স্মার্টফোন আর দ্রুতগতির ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার পর থেকে এর ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যায়। মূলত এই ‘ভাইরাল’ শব্দটি ফেসবুক থেকে শুরু হলেও এখন ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারের (বর্তমান এক্স) মতো প্ল্যাটফর্মেও শুরু হয়েছে। অতিব্যবহারে ফেসবুকও কিন্তু এখন অনেকটা অসুখে পরিণত হয়েছে। অনেকে মাদকাসক্তের মতো এর প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েছেন। একটু অবসর মানে ফেসবুক দর্শন।

গুগল ট্রান্সলেটরে ভাইরালের আভিধানিক অর্থ হিসেবে বলা হয়েছে ‘ভাইরাস ঘটিত’ এবং ব্যবহারিক অর্থ হিসেবে বিষপূর্ণ, বিষাক্ত, দূষিত বা দুষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি কম্পিউটারের ক্ষেত্রেও সমস্যা হলে ভাইরাস বলে উল্লেখ করা হয়। বলা যায় এই ভাইরাল শব্দটিই এখন একটি ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই ভাইরাল হতে চায়। ভাইরালের উপকারিতা এবং অপকারিতা দুটোই রয়েছে। যেমন কোনো খবর, তথ্য বা ভিডিও ভাইরাল হলে অর্থাৎ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জরুরি তথ্য মানুষের কাছে সহজে পৌঁছানো যায়। কেউ বিপদে পড়লে দ্রুত সাহায্য পাওয়া যায়। আবার ভালো কোনো কাজ ভাইরাল হলে অনেকেই তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়, উৎসাহিত হয়। টিভি বা সিনেমায় অভিনয় না করেও ফেসবুকে বা টিকটকে ভাইরাল হয়ে অনেকেই তারকা বনে যাচ্ছেন। কোনো নিখোঁজ সংবাদ ভাইরাল হলে নিখোঁজ ব্যক্তিকে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়। 

ভাইরালের অপকারিতা বা খারাপ দিকগুলোও অনেক সময় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। অনেক ভুল বা মিথ্যে খবর ভাইরাল করা হয় কিংবা হয়ে যায়; যা সমাজের ক্ষতি করে। আবার ব্যক্তিগত কোনো ভিডিও বা ছবি ভাইরাল হলে কারও সম্মানহানি হয়। ভাইরাল হয়ে অনেকেই যেমন রাতারাতি তারকা হয়েছেন, আবার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে অনেকেই খলনায়কে পরিণত হয়েছেন।

তবে আজকাল অনেকেই বিখ্যাত হওয়ার জন্য নানাভাবে ভাইরাল হওয়ার চেষ্টায় মত্ত। কেউ ভাইরাল হচ্ছেন নিজের চেষ্টায়, আবার কেউ ভাইরাল হচ্ছেন অন্যের অপচেষ্টার ফাঁদে পড়ে। বিশ্ববাসী উগান্ডার কুখ্যাত অপরাধী জোসেফ কোনিকে চিনেছিল একটি ভাইরাল ভিডিওর কল্যাণে। তাঁর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের শিকার হয়েছিল শত শত শিশু। এখন শুধু সেলিব্রিটি বা নেতা-বক্তা হওয়ার জন্য নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রচার-প্রসারের জন্যও ‘ভাইরাল’ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ভালো নাকি খারাপ সেটা নির্ভর করে কী ভাইরাল হচ্ছে তার ওপর। অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার কারণে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে অনেকেরই। ফেসবুকেই দেখেছি ফুটপাতের ভাতের হোটেলের মালিক মিজানের কান্না। 

ভাইরাল তাঁর সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। আগারগাঁওয়ের ফুটপাতের পাশে তাঁর ছোট্ট একটি ভাতের হোটেল। সহজ-সরল মানুষ এই হোটেলের মালিক মিজান। হোটেলে খাবার সাজানো থাকে, পরিচালনা করার কেউ নেই। বলা যায় মালিক ও কর্মীবিহীন হোটেল; যা একাই সামলান মিজান। সিএনজি আর রিকশাচালকরাই ছিল তাঁর হোটেলের প্রধান কাস্টমার। কাস্টমার এসে যে যার মতো খেয়ে প্লাস্টিকের একটি কৌটায় টাকা রেখে যান। অনেকেই হোটেলটিকে মানবিক হোটেল আখ্যা দিয়েছেন। এ হোটেলটি ইউটিউবে প্রচারের পর ব্যাপক ভাইরাল হয়। রিকশা-সিএনজির সঙ্গে গাড়ি চালিয়েও দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষ এ হোটেলের খাবার খেতে আসেন। মাঝেমধ্যে হোটেলের চিত্র দেখে মনে হয়েছে দেশে দুর্ভিক্ষ লেগেছে। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ ফুটপাতে বসে, কেউ হেঁটে হেঁটে ভাত খাচ্ছেন। মিজানের অভিযোগ– কনটেন্ট ক্রিয়েটররা দোকানে ভিড় করায় তাঁর ব্যবসা লাটে উঠেছে। অর্থাৎ ভাইরাল হয়েই যেন কপাল পুড়েছে মিজানের।

আবার তরমুজ বিক্রেতা রনি ভাইরাল হয়েছিলেন– ‘ওই কীরে কী, মধু, মধু... রসমালাই’, এসব শব্দ বলে। ভাইরাল হওয়ার পর রনি লুকিয়ে থাকেন, প্রকাশ্যে আসেন না। তাঁকে দেখলেই ইউটিউবার ভিড় করেন, এতে তাঁর তরমুজ বিক্রি করা হয় না। ভাইরাল হয়ে এমন আরও অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। 

আজকাল সুস্থ লেখা, নান্দনিক ভিডিও ছড়ায় না। ছড়ায় অশ্লীল কথা, অশ্লীল দৃশ্য, ফাঁস হওয়া নোংরা কল রেকর্ড। মোবাইল খুললেই এখন কানে আসে এক-দুই-তিন-চার কিংবা টিনের চালে কাউয়া, এর বাকি অংশ লেখার এবং শোনার অযোগ্য। এসবই ভাইরাল হচ্ছে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে অনেক বয়স্ক মানুষ, তরুণ-তরুণী এসব স্লোগান দিচ্ছেন, যা ভাইরাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফেসবুক, টিকটক, রিলসে। ইদানীং আবার কিছু শিশু ও নারীদের দিয়ে এআইয়ের মাধ্যমে সংলাপসহ অশ্রাব্য ও অশ্লীল দৃশ্য বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মাধ্যমে; যা আমাদের তরুণ প্রজন্ম এবং সমাজে খারাপ প্রভাব ফেলে।

শুধু তাই নয়, গুণীজনদের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করে ভাইরাল হতে চেষ্টা করছে কেউ কেউ। এটাকে ‘ভাইরাল’ না বলে ‘ভাইরাল ক্রাইম বা প্রতারণা’ বলাই শ্রেয়। একসময় প্রয়াত কয়েকজন গুণী এন্ড্রু কিশোর, আবদুল কাদের, এটিএম শামসুজ্জামানসহ অনেক খ্যাতিমান শিল্পীর অসুস্থতার সময় কিছু মানুষ নামের অমানুষ তাদের জীবিত অবস্থাতেই ফেসবুকে মৃত্যু সংবাদের গুজব রটিয়ে বিকৃত আনন্দ উপভোগ করেছেন, আর এই মানুষগুলোর পরিবার ও স্বজনরা দেশ-বিদেশে অঝোরে কেঁদেছেন। এসব মিথ্যে তথ্য বা খবর মানুষকে যেমন কষ্ট দেয়, তেমনি মিথ্যে তথ্য, ভুল তথ্য, গুজব সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। যে কোনো পোস্ট বা খবরে লাইক, শেয়ার, কমেন্টের চাহিদা থাকতেই পারে কিন্তু অবশ্যই তা যেন ভুল বা ভুয়া তথ্যনির্ভর না হয়।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, ভাইরাল মানেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। আসলে সমাজমাধ্যমে যেহেতু উচিত-অনুচিত দেখার জন্য কোনো সম্পাদক নেই– তাই যা ইচ্ছা তাই শেয়ার করা যায়, নিষেধ করার কেউ নেই। কারণ এখন অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগ। কিন্তু এ ধরনের খবর বা ছবির বাধাহীন প্রবাহ কোনোক্রমেই কাম্য নয়। খারাপ বা ক্ষতিকর কিছু ভাইরাল হলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া উচিত। এ ধরনের ভাইরাল বিষয় তরুণ প্রজন্মের ওপর প্রভাব ফেলে। এগুলো থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। পরিবার, স্কুল এবং বন্ধুদের মধ্যে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা উচিত। যাতে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাই বুঝতে পারে। প্রয়োজনে সোশ্যাল মিডিয়াতেই এ বিষয়ে ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। স্কুল-কলেজে সেমিনার-কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে।

সরকারকেও এসব খারাপ জিনিস ছড়ানো বন্ধে আরও কঠোর হতে হবে। প্রয়োজনে আইন করতে হবে, নইলে সমাজ আরও দূষিত হবে। মিডিয়ার স্বাধীনতা মানে যাচ্ছেতাই প্রচার করা নয়।

একসময় টেলিভিশনে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে কোনো অনুষ্ঠান, নাটক বা ছবি দেখলে কিংবা গান শুনলে আমরা প্রশংসা করে বলতাম– বাহ্‌ চমৎকার, খুব ভালো হয়েছে, শ্রুতিমধুর, নান্দনিক, অনবদ্য, অসাধারণ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর এখন কোনো কিছু দেখলে এর মূল্যায়ন মানদণ্ড হচ্ছে কত মিলিয়ন ভিউ হয়েছে কিংবা কনটেন্টটি ভাইরাল হয়েছে কিনা। অন্তর্জালের এই দুনিয়ায় নির্মিত কিছু কিছু কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু কতটা জনপ্রিয় জানি না। তবে এদের কারণে অশ্লীল শব্দের উৎপাতে ভাইরাল নামক শব্দটি অন্তর্জাল ভরিয়ে বেশ ছড়িয়েছে। সমাজ সমর্থন অযোগ্য বহুবিধ অসামাজিক কনটেন্টে ভরপুর এখন অন্তর্জাল। ভাইরাল শব্দটি ভাইরাস না হলেও নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত, রুচি ও বিবেকবোধহীন কিছু মানুষ এই ভাইরালকে ভাইরাসে পরিণত করেছে।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, ভাইরাল নিয়ে যে যতই তর্জন-গর্জন করুন না কেন সাময়িকভাবে এসব কনটেন্ট অর্থ এনে দিলেও এগুলোর স্থায়িত্ব কম। কত ভাইরাল এলো-গেল কিন্তু যেসব ছবি, নাটক, গল্প বা কনটেন্টের আবেদন এখনও আছে, সেগুলো কিন্তু ভাইরাল মানদণ্ডে বিবেচিত নয়।

ভাইরাল হওয়া ভালো যদি তা সমাজবান্ধব বা মানবকল্যাণে সহায়ক ভূমিকা রাখে, সময়কে ধরে রেখে মানুষের নীতি-নৈতিকতা জাগিয়ে তোলে, মানুষকে সুস্থ বিনোদন দেয়, মনকে প্রফুল্ল রাখে। তবে যে ভাইরাল-ভাইরাস হয়ে ভীতি ছড়ায়, এ ধরনের সমাজ দূষণ করা ভাইরাল হওয়া অশ্লীল-অকল্যাণকর অসামাজিক কনটেন্ট-গান-ছবি থেকে বর্তমান প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এখনই এসব ভাইরাল ভাইরাসের প্রতিষেধক প্রয়োজন। কারণ মৌলিক অধিকারের পাশাপাশি সমাজের সুস্থতাও জরুরি।

আরও পড়ুন

×