শিল্পীর স্বাধীনতাই সৃষ্টির প্রাণ
সৈয়দ আব্দুল হাদী, সংগীতশিল্পী
প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:২২ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৩৫
গণতন্ত্রের অর্থ কেবল ভোটের রাজনীতি নয়, এটি এক জীবনবোধ। মানুষের চিন্তা, অনুভব ও সৃষ্টিশীলতার স্বাধীনতা যেখানে অবাধ, সেখানেই গণতন্ত্রের শ্বাস নেওয়া যায়। রাষ্ট্র পরিচালনার মতো সংস্কৃতি অঙ্গনেও গণতন্ত্র অপরিহার্য। কারণ, সংস্কৃতি হলো জাতির আত্মা আর সেই আত্মাকে মুক্ত রাখা না গেলে জাতিও মুক্ত হতে পারে না।
আমরা যখন গান গাইতে শুরু করি, তখনকার সময়ে শিল্পী বলতে বোঝাত এক ধরনের সাধনাকে। যে সাধনার ওপর ভর করে সমাজের আনন্দ ও বেদনা নিজের কণ্ঠে বহন করেন শিল্পীরা। বেতার বা চলচ্চিত্রে গান গাওয়া তখন এক বিশাল দায়িত্ব। সেখানে কেউ কাউকে ঠেলে সরিয়ে দেয়নি, বরং প্রতিযোগিতা ছিল সৃষ্টিশীলতার, কণ্ঠের মানের, গানের কথার গভীরতার। এখন ফিরে তাকিয়ে দেখি, তখনকার সেই পরিসরই ছিল প্রকৃত সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রের প্রকাশ।
গণতন্ত্র মানে যে কেবল স্বাধীনভাবে কথা বলা তা নয়, এর মানে হচ্ছে ভিন্ন মত, ভিন্ন সুর, ভিন্ন ভাবনার প্রতি শ্রদ্ধা। একসময় বেতারে নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, লোকগান, আধুনিক গান, ক্লাসিক্যাল–সবকিছুই স্থান পেত। একেকটা ধারার মানুষ একে অন্যকে সম্মান করত, শেখার মনোভাব রাখত। আজও মনে পড়ে, আবদুল আহাদ ভাই বা সুবল দাসের মতো গুরুরা বলতেন– ‘গান শেখো সবদিক থেকে, কারণ সংগীতেও তো তন্ত্র আছে।’ অর্থাৎ এক ধারা বাদ দিলে সুরের সমাজই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আজকের দিনে আমি দেখি, সংগীতে একটি একমাত্রিক ধারা তৈরি হচ্ছে– যেখানে ব্যবসায়িকতা প্রাধান্য পাচ্ছে, অথচ সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। তরুণ শিল্পীরা অনেক মেধাবী, কিন্তু তাদের সৃষ্টিশীলতা বিকশিত হওয়ার আগে বাজারের চাহিদা তাদের দিক নির্ধারণ করে দেয়। এটা সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রের পরিপন্থি। গণতন্ত্র মানে হচ্ছে তুমি তোমার ভাবনা, তোমার সুর, তোমার প্রকাশ– যেভাবে চাও, সেভাবে তুলে ধরতে পারবে; কেউ সেটা নির্ধারণ করবে না। শিল্পীর নিজের স্বাধীনতাই সৃষ্টির প্রাণ।
একটা সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশে প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ থাকতে হয়। আমি যখন নতুন, তখন প্রবীণ শিল্পীরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারা কখনও আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেননি, বরং পথপ্রদর্শক ছিলেন। সেই আন্তরিকতা এখন কমে এসেছে। আমরা যদি তরুণদের জায়গা না দিই, তাদের ভুল করতে না দিই, তাহলে নতুন কিছু আসবে কীভাবে? গণতন্ত্র যেমন বিকল্প ধারণার প্রতি সহিষ্ণু, সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তেমন সহনশীলতা থাকা জরুরি।
আমি প্রায়ই ভাবি, আজকের প্রজন্মের গান যদি আমার শৈশবের কানে বাজত, আমি হয়তো অবাক হতাম। কিন্তু এটাই তো সময়ের দাবি। আমি যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক মনোভাব রাখি, তবে আমাকে শুনতে হবে এই সময়ের তরুণদেরও। তাদের ভাষা, তাদের বিট, তাদের বেদনা। সংস্কৃতিতে গণতন্ত্র মানে এই শোনার সাহস।
একজন শিল্পীর স্বাধীনতা কেবল তাঁর প্রতিভার ওপর নির্ভর করে না; সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির ওপরও নির্ভর করে। যখন শিল্পচর্চা করতে গিয়ে ভাবতে হয়, ‘এই গানটি বলা যাবে কিনা?’, ‘এই কথাটা রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল কিনা?’, তখন সৃজনশীলতা সংকুচিত হয়। গান, কবিতা, চলচ্চিত্র– সবই তখন ভয়ে আক্রান্ত হয়। অথচ একজন শিল্পী সমাজের বিবেক। তাঁর কাজ হলো প্রশ্ন করা, ভাবনার উদ্রেক করা। সেই প্রশ্নের পরিসর সংকুচিত হলে জাতির মানসিক বিকাশও থেমে যায়। আমি মনে করি, রাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক হতে চায়, তাহলে প্রথমেই সংস্কৃতিকে স্বাধীন হতে দিতে হবে। কারণ সংস্কৃতি হচ্ছে সেই ক্ষেত্র, যেখানে মানুষ শিখে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে। স্বাধীন চিন্তার মানুষই তো স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে।
গণতন্ত্রের মতো সংস্কৃতিও চর্চা ছাড়া টেকে না। একসময় আমরা প্রতিদিনের প্রোগ্রামে, কনসার্টে, টেলিভিশনের সরাসরি অনুষ্ঠানে অংশ নিতাম। সেখানে দর্শক ছিল অংশীদার, শিল্পী ছিল পথপ্রদর্শক। আজকাল এই যোগাযোগটি ক্রমেই ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিক্রিয়ার ঝড় ওঠে, কিন্তু সংলাপ থাকে না। মঞ্চের গণতন্ত্র হারালে শিল্পের প্রাণও নিভে যায়।
আমার মনে হয়, আমাদের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নতুন প্রতিভা তুলে আনার যে প্রক্রিয়া, সেটাকে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত করতে হবে। সুযোগ যেন যোগ্যতার ভিত্তিতে আসে, সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়। প্রকৃত গণতন্ত্র সেখানেই– যেখানে প্রতিভাই পরিচয়ের একমাত্র মানদণ্ড।
সংস্কৃতি অঙ্গনের গণতন্ত্র মানে যে সবকিছু চলবে, তা নয়। গণতন্ত্র মানে শৃঙ্খলার ভেতর স্বাধীনতা। সংগীত বা চলচ্চিত্র যদি নৈতিকতা হারায়, তবে সেটি আর গণতন্ত্র থাকে না, বিশৃঙ্খলা হয়ে যায়। শিল্পীর দায়িত্ব হচ্ছে শ্রোতাকে শুধু আনন্দ দেওয়া নয়, তাকে ভাবতে শেখানো। গান যদি মানুষকে বোধশীল না করে, তাহলে তা কেবল শব্দের কারিগরি।
আমি সব সময় বলি– আমাদের সংস্কৃতি যদি মানুষকে মানুষ বানাতে না পারে, তবে সেই সংস্কৃতি মেকি। গণতন্ত্রের মর্মও তো এখানেই–মানুষের মর্যাদা রক্ষা।
আমি আশাবাদী মানুষ। আমার দেখা নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা যেমন প্রযুক্তিতে দক্ষ, তেমনি তাদের মনেও একটি নৈতিক স্পন্দন আছে। তারা গান গাইছে, চলচ্চিত্র বানাচ্ছে, কবিতা লিখছে নিজের ভাষায়, নিজের ভাবনায়। কেবল দরকার তাদের জন্য একটি উন্মুক্ত পরিসর, যেখানে কেউ তাদের থামাবে না, কিন্তু কেউ তাদের পথভ্রষ্টও করবে না। এই ভারসাম্যই সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রের প্রাণ।
আমরা যদি সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য– সব ক্ষেত্রেই সহনশীলতা, মেধা ও সততার চর্চা ফিরিয়ে আনতে পারি, তাহলে রাজনীতির গণতন্ত্রও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মজবুত হবে। কারণ সংস্কৃতি হচ্ছে সমাজের মেরুদণ্ড, আর গণতন্ত্র তার রক্তপ্রবাহ।
শেষ করার আগে একটা ব্যক্তিগত কথা বলতে চাই। আমি জীবনের নানা সময়ে দেখেছি শিল্পীকে সম্মান দেওয়া যায় না আইন দিয়ে; তাঁকে সম্মান দিতে হয় শ্রদ্ধা দিয়ে। এই শ্রদ্ধার সংস্কৃতিই প্রকৃত গণতন্ত্রের ভিত্তি।
- বিষয় :
- শিল্পী
- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
- সৈয়দ আব্দুল হাদী
