ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভবেরপাড়ার নারীদের হস্তশিল্পের চাহিদা ইউরোপজুড়ে

ভবেরপাড়ার নারীদের হস্তশিল্পের চাহিদা ইউরোপজুড়ে
×

ফারুক হোসেন, মেহেরপুর

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৪৮

মেধা, শ্রম আর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা নারীর জীবনেও এনে দিতে পারে সাফল্য। নারীও পুরুষের মতো জয়ী হয়ে সমাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভবেরপাড়া গ্রামের বেশ কিছু নারী উদ্যোক্তা।

এই উদ্যোক্তাদের মধ্যে কেউ বিধবা, কেউ অতিদরিদ্র, আবার কারও সংসারে একেবারেই নেই উপার্জনক্ষম মানুষ। এমন সব নারীই সংসারের দৈনন্দিন কাজ শেষ করে পাটের তৈরি মাদুর, ম্যাট, ফুলদানি, টেবিল ম্যাট, দোলনা, খেলনা মাছ, ক্রিসমাসের তারকা, ব্যাগসহ নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি করে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। পরিবর্তিত হচ্ছে মেহেরপুরের গ্রামীণ অর্থনীতি। বেইজ নামে খুলনার একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের পাটপণ্য কিনে নিয়ে বিক্রি করছে ইউরোপের স্পেন, ইতালি, জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং আমেরিকার বিভিন্ন বাজারে। পাট দিয়ে তৈরি এসব হস্তশিল্প সামগ্রী ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৪-১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ভবেরপাড়া গ্রামটি মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বাগওয়ান ইউনিয়নে। ভারত সীমান্তবর্তী গ্রামটির নারীরা পাটপণ্য তৈরি করে ইতোমধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছেন। গত ১৭ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে ভবেরপাড়া চার্চের পাশে একটি ভবনে গিয়ে দেখা যায় ১৬ জন নারী একসঙ্গে বসে পাট দিয়ে নানা ধরনের পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত। সেখানে সন্ধ্যা মণ্ডল নামে এক নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ২০১৭ সালে পাঁচজন মিলে পাটপণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন কণা রানী নামে এক নারী। কণা রানী বার্ধক্যজনিত কারণে এখন আর কাজ করতে পারেন না। তবে তাঁর দেখানো পথ ধরে এখন শতাধিক নারী এই কাজে যুক্ত রয়েছেন। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
সন্ধ্যা মণ্ডলের ভাষ্য, নারীরা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের অর্ডার অনুযায়ী পাট ও ডিজাইন নিয়ে বাড়িতে যান। সংসারের কাজ সেরে লেগে যান পাটপণ্য তৈরিতে। আবার যাদের বাড়িতে কাজ নেই, তারা এখানে বসেই পাটপণ্য তৈরি করেন। তৈরি পণ্য বিক্রিতে কোনো সমস্যা নেই। খুলনার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বেইজে দিলে তারাই বিদেশে পাঠিয়ে বিক্রি করে। মজুরিও নিজেরাই নির্ধারণ করে থাকেন। এক কেজি পাট কিনতে লাগে ৭০ টাকা। ওই পাট দিয়ে তৈরি পণ্য ১৪০ টাকায় কিনে নেয় রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ফলে পাটের দামের দ্বিগুণ দাম পান তারা। এখন চাহিদা বাড়ায় সংসারের কাজ সেরে সকাল-সন্ধ্যা সবসময় কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। পাটপণ্য তৈরির কাজে বেশি সময় দিতে পারলে একেকজন নারী প্রতিদিন ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। সন্ধ্যা মণ্ডল বলেন, সংসারে দৈন্য আছে। তারপরও স্বামী মারা যাওয়ায় এ কাজ করে ছেলেমেয়েদের 

লেখাপড়া শিখিয়েছেন। জমি কিনে বাড়ি করেছেন। এখন ভালো আছেন। তবে তিনি তাঁর আগের নারীদের প্রসঙ্গ টেনে জানান, কাজ করতে করতে যারা বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, কাজ করার ক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের যদি সরকার সহায়তা করত, বয়স্কভাতা বা বিধবা ভাতা দিয়ে সহায়তা করলে বাকি জীবনটা কোনো রকমে সম্মানের সঙ্গে কেটে যেত। অন্য নারীরাও এ কাজে এগিয়ে এলে তাদের বিদেশ যাওয়ার দরকার পড়বে না।

পাটপণ্য তৈরির জন্য চকচকে সোনালি রঙের পাট দরকার। মেহেরপুরে এমন পাট পাওয়া যায় না বললেই চলে। এ জেলার পাট কালো রঙের। এ কারণে ফরিদপুর থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এখন অর্ডার করলেই ফরিদপুর থেকে পাট পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আফরোজা খাতুন নামে একজন বলেন, মেহেরপুরের পাট সাধারণত কালো রঙের হয়। ফলে মেহেরপুরের পাট দিয়ে কাজ হয় না। রপ্তানিযোগ্য পাটপণ্য তৈরির জন্য ফরিদপুর থেকে পাট কিনে আনতে হয়। ফরিদপুরের পাট সোনার মতো চিকচিক করে। তাতে খরচ বেশি হয়ে যায়। সাশ্রয়ীমূল্যে পাট পেলে আরও বেশি লাভবান হতে পারতেন তারা।

অর্ডার অনুযায়ী পণ্য তৈরি করে সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহ করেন উদ্যোক্তারা। ক্রেতারাই নিয়ে যান। তাদের কোনো জায়গায় যেতে হয় না। সততা, ন্যায়-নিষ্ঠতা ও কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারলে ঘরে বসেই জীবন ধারণের জন্য যা প্রয়োজন তা উপার্জন করা সম্ভব। তাদের এখানে কর্মরত মেয়েদের প্রশংসা ইউরোপজুড়ে। তাদের এই কাজ বিদেশে প্রশংসিত হওয়ায় নিজেরা গর্ববোধ করেন বলে জানালেন কয়েকজন নারী।

নারী উদ্যোক্তা মালা রানী বলেন, ‘আমাদের হাতের তৈরি পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। মাঝেমধ্যে বিদেশিরা আসেন, আমাদের প্রশংসা করেন, খুব ভালো লাগে। এখন আর কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয় না। কয়দিন আগে ইতালি, স্পেন ও আমেরিকা থেকে লোক এসে আমাদের কাজ দেখে গেছেন। তারা আরও বেশি করে পাটপণ্য কেনার আগ্রহ দেখিয়েছেন।’

ভবেরপাড়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তা সন্ধ্যা মণ্ডল জানান, সংসারে আয়-রোজগার করার লোক না থাকায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটছিল তাঁর। 
এ সময় এই পাটপণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজে নেমে পড়েন। প্রথমে দ্রুত কাজ না করতে পারায় আয়-রোজগার কম হতো। এখন দ্রুত ও সুন্দর করে কাজ করতে পারায় আয়-রোজগার ভালো হচ্ছে। বিদেশে পাটপণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এলাকার অসহায় ও দরিদ্র নারীরা দিন দিন এই কাজে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। ব্যাপক চাহিদা থাকায় সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। অনেক নতুন নতুন নারী কাজ শিখে যোগ দিচ্ছেন তাদের সঙ্গে। এখন ভালো আছেন।

পাটপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বেইজের বাংলাদেশ অফিসের পরিচালক সৌরভ আনছারীর ভাষ্য, গ্রামীণ নারীদের হস্তশিল্প সামগ্রী বিদেশে রপ্তানি করার সুযোগ করে দিচ্ছেন তারা। তাদের লক্ষ্য গ্রামীণ নারীদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা। নারীরা ঘরে বসে না থেকে কাজ করলেই সাফল্য তাদের দোরগোড়ায়।

মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পলাশ মণ্ডল বলেন, বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মুজিবনগরের নারী উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভালো মানের পাট উৎপাদনে চাষিদের বিভিন্নভাবে পরামর্শ দেওয়ার জন্য কৃষি বিভাগকে বলা হয়েছে। আশা করছি আগামীতে চাহিদা অনুযায়ী পাট মেহেরপুরে উৎপাদন হলে এ জেলার নারীরা আরও লাভবান হবেন। পাটপণ্য বিদেশে রপ্তানি করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করায় নারী উদ্যোক্তাদের উপজেলা প্রশাসন থেকে সব ধরনের সহায়তা করা হবে।

জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা নাসিমা খাতুন জানান, ‘আমরা আর্থিকভাবে মেয়েদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। পুঁজির জন্য ঋণের ব্যবস্থাও করে থাকি। ভবেরপাড়া গ্রামের পাটপণ্য দেখে আমরা খুব খুশি। যে মানুষই ওইসব পাটপণ্য দেখবেন তারই কিনতে ইচ্ছে করবে। আমাদের নারীরা এখন ঘরে বসে বিশ্বমানের পাটপণ্য তৈরি করছেন। বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। বিষয়টি যথেষ্ট গৌরবের।’

মেহেরপুর জেলা পাট কর্মকর্তা শাহীন আলম বলেন, মেহেরপুরে প্রবহমান পানি সমস্যার কারণে পাট কালো হয়। এ বছর ভারী বর্ষণের কারণে প্রচুর পানি ছিল। এ কারণে অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর পাট ভালো হয়েছে। চাষিরা দামও ভালো পাচ্ছেন। তবে শোপিস হিসেবে পাটপণ্য তৈরির প্রয়োজনীয় পাট মেহেরপুরে খুব বেশি হয় না। তাই ফরিদপুর থেকে সোনালি রঙের পাট কিনতে হয় নারী উদ্যোক্তাদের। 

আরও পড়ুন

×