ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পলাশকান্দার শহীদ সিরাজ

পলাশকান্দার শহীদ সিরাজ
×

শহীদ সিরাজ

ফয়সাল শাহরিয়ার

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৪ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৩:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই’।
শহীদ সিরাজুল হক ১৯৫০ সালে ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার বোকাইনগর গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মনফরউদ্দিন ছিলেন গৌরীপুর আর. কে. হাই স্কুলের শিক্ষক। শহীদ সিরাজ ওই স্কুল থেকেই ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তরুণ সিরাজ গৌরীপুর কলেজের এইচএসসির শিক্ষার্থী ছিলেন।

শহীদ সিরাজ কৈশোর থেকে সংগীতের প্রচণ্ড অনুরাগী ছিলেন। বাসার ফিলিপস দুই ব্যান্ডের রেডিওটি ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। পরিবারের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও তিনি প্রতি সপ্তাহে দুই দিন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত অদূরবর্তী ময়মনসিংহ শহরের মুকুল ফৌজে নিয়মিত তৎকালীন প্রসিদ্ধ সংগীতগুরু মিথুন দের কাছে সংগীতের তালিম গ্রহণ করতেন।

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষ পর্যায়ে বাঙালি জাতির স্বাধিকার অর্জনের সংগ্রাম অতি দ্রুত বেগবান হয়ে ওঠে। বিশেষত, ১৯৭০ সালে বাঙালিদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সম্ভাবনা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গৌরীপুর কলেজের তরুণ ছাত্র সিরাজুল হকও ওই প্রবণতা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অকল্পনীয় নৃশংসতায় নিরস্ত্র বাঙালি জনগণের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লে সমগ্র পরিস্থিতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন ঘটে। বাংলাদেশের সর্বত্রই বাঙালি সৈনিক এবং তদানীন্তন ইপিআরের সহযোগিতায় বাঙালি জনগণ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

ফলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ২২ এপ্রিল ১৯৭১-এর পূর্বে তদানীন্তন জেলা শহর ময়মনসিংহে প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। ইতোমধ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সৈনিক এপ্রিল, ১৯৭১-এর প্রথম সপ্তাহ থেকেই গৌরীপুর আর. কে. হাইস্কুলের মাঠে স্থানীয় তরুণদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিচালনা শুরু করেন। তরুণ সিরাজুল হক ছিলেন ওই ক্যাম্পের একজন অত্যুৎসাহী প্রশিক্ষণার্থী।

কিন্তু ২২ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জেলা শহর ময়মনসিংহে প্রবেশ করলে সমগ্র পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়; গৌরীপুর আর. কে. হাইস্কুলের মাঠে অবস্থিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিও স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ হয়ে যায়। তরুণ সিরাজুল হক পরবর্তী সময় হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে গমন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তিনি তাঁর প্লাটুনের সঙ্গে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশের পরে ব্রিগেডিয়ার কাদেরের অধীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৯৩তম ব্রিগেড ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের সদরদপ্তর স্থাপন করে। ওই ৯৩তম ব্রিগেডের আওতাধীন দুটি পদাতিক ব্যাটালিয়নের মধ্যে ৩১তম বালুচ রেজিমেন্ট মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়ই তদানীন্তন জামালপুর মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) নিয়োজিত ছিল। অন্য পদাতিক ব্যাটালিয়নটি, অর্থাৎ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৩৩তম পাঞ্জাব রেজিমেন্ট অধিকাংশ সময়ই ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করলেও প্রয়োজন অনুযায়ী ওই পদাতিক ব্যাটালিয়নের এক অথবা একাধিক কোম্পানি তদানীন্তন মহকুমা শহর কিশোরগঞ্জ (বর্তমানে জেলা) অথবা তদানীন্তন ময়মনসিংহ জেলার অন্যত্র দায়িত্ব পালন করত। স্বাভাবিকভাবেই ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়ক ওই ব্যাটালিয়নের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে সমগ্র বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কার্যত মুক্ত এলাকায় পরিণত হয়। সমগ্র জাতি তখন অদূর ভবিষ্যতে বিজয় অর্জনের আশায় উদ্বেলিত। এই সময় মুক্তিবাহিনীর একটি প্লাটুন ময়মনসিংহ শহরের অদূরে গৌরীপুর এবং ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মধ্যবর্তী পলাশকান্দা গ্রামে অবস্থান গ্রহণ করেন।
তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজও ওই প্লাটুনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কে ন সেনাবাহিনীর চলাচল বাধাগ্রস্ত করার মাধ্যমে অতি দ্রুত তদানীন্তন মহকুমা শহর কিশোরগঞ্জকে জেলা শহর ময়মনসিংহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।

১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর। শীতের শেষ বিকেলের আলোয় ময়মনসিংহের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ তুলনামূলকভাবে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সিরাজুল হকসহ এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা পূর্ববর্তী দুই দিন ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর এবং ঈশ্বরগঞ্জ থানার সীমান্তে অবস্থিত পলাশকান্দা গ্রামে অবস্থান করছিলেন। ৩০ নভেম্বরের শেষ বিকেলে অতর্কিতভাবে স্থানীয় সহযোগীসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক কোম্পানি সৈন্য তিন দিক থেকে তাদের অবস্থান ঘিরে ফেলে প্রচণ্ড গুলি বর্ষণ শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুনের কোনো যোদ্ধাই সুবিধাজনক অবস্থান গ্রহণ করার সুযোগ পাননি। তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ একটি খড়ের গাদার আড়ালে অবস্থান নিয়ে তাঁর স্বল্প রেঞ্জের স্টেনগানটি দিয়ে যথাসাধ্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা প্লাটুনটির প্রধান লক্ষ্য ছিল সূর্যাস্তের পরে কোনো সুবিধাজনক অবস্থানে সরে যাওয়া। ঠিক এই সময়ে পাকিস্তানিদের   একটি গুলি এসে তরুণ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজের বাঁ ঊরুতে বিদ্ধ হয়। প্রচুর রক্তক্ষরণ ছাড়াও সিরাজ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েন।

‘হাতিয়ার ডাল দো, শালা বাঙালি … আভি বাহার নিকাল’; মাত্র ১৫-২০ গজ দূর থেকে একজন পাকিস্তানি সৈনিকের হুঙ্কার শুনতে পেয়ে তরুণ সিরাজ তাঁর সংকটাপন্ন অবস্থার গুরুত্ব প্রকৃষ্টরূপে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সাত-আটজন পাকিস্তানি সৈনিক দ্বারা ঘেরাও হয়ে যান। একজন মধ্যবয়স্ক পাকিস্তানি সুবেদার তরুণ সিরাজের রক্তাক্ত বাঁ ঊরুতে তাঁর বুটের প্রচণ্ড এক লাথি কষায়। ‘পাঞ্জাবি কো সাথ লাড়েগা তু? শালা বাঙালি ...। আ তুজে ম্যায় লাড়না সিখাতাহু’– বলে পাকিস্তানি সুবেদারটি সিরাজের আহত বাঁ ঊরুতে পুনরায় লাথি কষায়। তীব্র ব্যথায় জ্ঞান হারানোর পূর্ব মুহূর্তে সিরাজ তাঁর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি উপলব্ধি করতে পারেন। 
লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন

×