স্বাধীনতা দিবস ২০২৬
রণাঙ্গনের স্মৃতিগাথা
সত্রং চাকমা
সত্রং চাকমা
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার ডাকে সাড়া দিয়ে টগবগে তরুণ প্রীতি কান্তি ত্রিপুরা পাড়ি জমান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে– রাঙামাটি থেকে বান্দরবান। এরপরের গল্প শুধু ব্যক্তিগত নয়, তা এক বীরত্বগাথা। ১৯৭১ সালের মার্চের শেষ সপ্তাহে বান্দরবানে গঠিত হয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ। এই পরিষদের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত বাঙালি সৈন্যদের সহায়তা করা– খাদ্য, আশ্রয় এবং তথ্য দিয়ে। প্রীতি কান্তি ত্রিপুরা এ পরিষদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান, মোখলেছুর রহমান, মংস মিয়ান্ট (জনি বাবু), শফিকুর রহমান এবং ছাত্রনেতা আব্দুল ওয়াহাবসহ আরও অনেকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলেও তখন স্বাধীনতার স্বপ্ন ছড়িয়ে পড়েছে, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সবাই প্রস্তুত।
এপ্রিলের শেষ দিকে চট্টগ্রামের কালুরঘাট এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তীব্র লড়াই শুরু হয়। কিন্তু প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে বাঙালি সৈন্যরা একপর্যায়ে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হন। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে কর্নেল অলি আহমদ (তৎকালীন ক্যাপ্টেন), ক্যাপ্টেন নাসেরসহ অন্যান্য সৈনিকরা বান্দরবান হয়ে সরে যান এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিও সরিয়ে নেন। এই পশ্চাদপসরণের ফলে সংগ্রাম পরিষদের কার্যক্রম ভেঙে পড়ে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে নতুন কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজন দেখা দেয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রীতি কান্তি ত্রিপুরা ও তাঁর সহযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নেন– ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। রুমা হয়ে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তারা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের দেমাগ্রীতে পৌঁছান। তখনও প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালু হয়নি। তাই তারা কিছুদিন শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করেন। মে মাসের শেষদিকে প্রশিক্ষণ শুরু হলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন। এ ক্যাম্পটি ছিল ১ নম্বর সেক্টরের অধীন একটি সাব-সেক্টর। কঠোর শারীরিক অনুশীলন, অস্ত্র চালনা এবং গেরিলা যুদ্ধের কৌশল– সবকিছুই তারা শেখেন নিষ্ঠার সঙ্গে। জুলাই মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাদের প্রশিক্ষণ চলে। প্রশিক্ষণ শেষে ১৪ জুলাই তারা আবার দেশের মাটিতে ফিরে আসেন। মোট ৮০ জনের এই দলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। ছাত্রনেতা আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে ৪০ জনের একটি দল গালেঙ্গা পাহাড় অতিক্রম করে পদুয়া অঞ্চলের দিকে যায়। অন্য ৪০ জনের দলটি বান্দরবানের দিকে অগ্রসর হয়; যার মধ্যে প্রীতি কান্তি ত্রিপুরাও ছিলেন। বান্দরবান পাহাড়ে ঘেরা হওয়ায় এটি ছিল একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখান থেকে পার্শ্ববর্তী বাজালিয়া, দোহাজারী, চন্দনাইশ, পটিয়া ও কালুরঘাটসহ বিভিন্ন সমতল এলাকায় অভিযান পরিচালনা সহজ হবে– এই বিবেচনায় সেখানে একটি স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
কিন্তু পরিকল্পনার শুরুতেই তারা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েন। ১৫ জুলাই ভোরে সাঙ্গু নদীর তীরে ক্যাচিংঘাটা এলাকায় তাদের নৌকায় অতর্কিত হামলা চালায় শত্রুপক্ষ। শান্তি কমিটির সদস্যরা আগে থেকেই ওত পেতে ছিলেন। গুলিবর্ষণে তাদের তিনজন সহযোদ্ধা শহীদ হন। আকস্মিক এ আক্রমণে অনেকেই হতচকিত হয়ে পড়েন। কারণ বেশির ভাগই তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রাণ বাঁচাতে কেউ নদীতে ঝাঁপ দেন, কেউ বালির ঢিবির আড়ালে আশ্রয় নেন। দলনেতা আব্দুল ওয়াহাব সাহসিকতার সঙ্গে পাল্টা গুলি চালাতে থাকেন, যা অন্যদের সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা দুদিন দুই রাত লুকিয়ে থাকার পর চন্দনাইশের ধোপাছড়ি রিজার্ভ ফরেস্টে অবস্থানরত একটি গেরিলা দলের সঙ্গে যোগ দেন। মোখলেছুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই দলে স্থানীয় যুবক, ইপিআর, ইবিআর ও পুলিশের সদস্যরা ছিলেন। তারা ধোপাছড়িকে ঘাঁটি করে বিভিন্ন এলাকায় গেরিলা অভিযান পরিচালনা করতেন। লোহাগড়ার রাজঘাটা মাদ্রাসা অপারেশন ছিল তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্যের একটি উদাহরণ।
তবে গোলাবারুদের সংকট দেখা দিলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আবার ভারতে ফিরে যান। প্রীতি কান্তি ত্রিপুরাও আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে পুনরায় ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তিনি অশোক মিত্র কারবারীর নেতৃত্বাধীন ১০৪ জনের একটি ফ্রিডম ফাইটার (এফএফ) কোম্পানিতে যোগ দেন। এই কোম্পানি পরে বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে।
শিলক ও পদুয়া অঞ্চলে তাদের স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এখান থেকে আশপাশের এলাকায় নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালিত হতো। একদিন খবর আসে– পাকিস্তানি বাহিনী একটি গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রতিআক্রমণ চালান। তীব্র গুলিবর্ষণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। যদিও সেই হামলায় কয়েকজন নিরীহ গ্রামবাসী প্রাণ হারান। তবুও মুক্তিযোদ্ধাদের এ প্রতিরোধ স্থানীয় মানুষের মধ্যে সাহস ও আস্থা জাগিয়ে তোলে।
এর কিছুদিন পর পাকিস্তানি বাহিনী আরও বড় আকারে আক্রমণের পরিকল্পনা করে। প্রায় ৩০০ সদস্যের একটি বাহিনী দুদিক থেকে অগ্রসর হতে থাকে– একটি দল কর্ণফুলী নদী পার হয়ে চন্দ্রঘোনা ও কোদালা হয়ে, আরেকটি দল বান্দরবান থেকে পদুয়া হয়ে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলগতভাবে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে প্রায় ৬ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েন। নির্দিষ্ট সময়ে একযোগে আক্রমণ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। তারা ধারণা করে, বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা তাদের ঘিরে ফেলেছে। ফলে তারা হতাহত হয়ে দ্রুত পিছু হটে। এই সফল অভিযানের পর ওই এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনী আর বড় ধরনের আক্রমণ চালানোর সাহস পায়নি।
ডিসেম্বরের শুরুতে মিত্রবাহিনী ও ভারতীয় তিব্বতি বাহিনীর একটি কোম্পানি ওই এলাকায় অবস্থান নেয়। এরপর কোদালা চা বাগানে পাকিস্তানি বাহিনীর ঘাঁটি দখলের জন্য অভিযান চালানো হয়। মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ মানুষের বেশে বাগানের কাছে পৌঁছালেও পরে জানা যায়, শত্রুপক্ষ আগের রাতেই পালিয়ে গেছে। এ সময় আকাশপথে মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণ এবং গেরিলা বাহিনীর লাগাতার আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে।
১৬ ডিসেম্বর রাতে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে কালুরঘাট এলাকায় অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক সেই সময় খবর আসে– পাকিস্তানি বাহিনী বিকেলেই আত্মসমর্পণ করেছে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে, জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সেই খবর শুনে প্রীতি কান্তি ত্রিপুরা ও তাঁর সহযোদ্ধারা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। আনন্দ, বিস্ময় আর স্বস্তির এক অভূতপূর্ব অনুভূতি তাদের ঘিরে ধরে।
লেখক
সত্রং চাকমা
স্টাফ রিপোর্টার
রাঙামাটি
- বিষয় :
- স্বাধীনতা
