ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্বাধীনতা দিবস ২০২৬

ভাঙা হারমোনিয়াম

ভাঙা হারমোনিয়াম
×

ইরাজ আহমেদ

ইরাজ আহমেদ

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৮ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

একটা ভাঙা হারমোনিয়াম বাজছে। আমানউল্লাহর শুধু মনে হচ্ছে, তার মাথার ভিতরে সেই ভাঙা হারমোনিয়ামের রিডে চাপ দিচ্ছে কেউ। আর তাতে বিচিত্র শব্দের একটা ক্ষীণ ঢেউ ফিরে ফিরে আসছে। অক্টোবর মাসে হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছে এই মফস্বল শহরে। সকাল থেকে বিছানা ছাড়েননি আমানউল্লাহ। টিনের চালের ওপর একটানা বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে তার মাথার ভিতরে ভাঙা হারমোনিয়ামের কেমন ফেঁসে যাওয়া আওয়াজটাও মিশে যাচ্ছে; একঘেয়ে, বৃষ্টির আকাশের মতো ফ্যাকাশে। শীত অনুভব করেন আমানউল্লাহ। লিটনের বউ লিমা বিছানার পাশে টেবিলে দ্বিতীয় কাপ চা রেখে গেছে আরও কিছুক্ষণ আগে। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে চোখের ওপর একটা হাত আড়াআড়ি রেখে শুয়ে আছেন আমানউল্লাহ। প্রথম কাপ চা টেবিলে থেকেই ঠান্ডা হয়ে গেছে। লিমা নিঃশব্দে কাপটা ফিরিয়ে নিয়ে আরেক কাপ দিয়ে গেছে। খেতে ভালো লাগছে না তার। আসলে কোনো কিছুই মুখে দিতে ইচ্ছা করছে না। গতকাল বিকেল থেকেই কিছুই খাননি পানি ছাড়া। বাসার লোকজনও দু-একবার বলে চুপ করে গেছে। রাতে ছোট বোনের ছেলে লিটন কয়েকবার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থেকে আবার চলে গেছে। ছোট বোন রিনা কয়েকবার এসেছিল কিছু খাবে কিনা জানতে। হাত নেড়ে তাকে চলে যেতে বলেছেন আমানউল্লাহ। পুরো রাতটা শুয়ে থেকে এপাশ-ওপাশ করেছেন বিছানায়। শেষ রাতে আকাশে মেঘ ডাকার শব্দ টের পেয়েছেন, বৃষ্টি নামার শব্দ টের পেয়েছেন, সকাল হওয়ার পর টিনের চালের তলায় আশ্রয় নেওয়া একটা ঘুঘুর অবিশ্রান্ত ডাক শুনেছেন, প্রচণ্ড আঘাতে ভেঙে যাওয়া হারমোনিয়াম বাজার বিশ্রী আর একটানা আওয়াজও বিদায় নেয়নি মাথার ভিতর থেকে। 

গতকাল বিকেলে ওরা যখন এসেছিল আমানউল্লাহ স্কুলে ছিলেন না। তাঁর গানের স্কুলের দরজায় তালা ঝোলানো ছিল। তাঁর থাকার কথাও না। গান শিখতে বাচ্চারা আসে শুক্রবার দুপুরের পর। ওরা আসার আগেই পৈরতলা থেকে রিকশায় ইলেকট্রিক মার্কেটে পৌঁছে যান আমানউল্লাহ। দোতলায় উঠে ঘরটার দরজার তালা খোলেন। মার্কেটের দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সাদেক তাঁর পেছন পেছন ঘরে ঢোকে। ঘর ঝাড়ু দিয়ে চাদর পাতে মেঝেতে। হারমোনিয়াম, তবলা বের করে রাখে। তারপর আসে তরুণ আর মনির। ওরা দেশ নাট্য সম্প্রদায়ের নাট্যকর্মী। সুর বিতানে সপ্তাহে একদিন বাচ্চাদের গান শেখানোর দায়িত্ব ওদের। তরুণ ঘরে ঢুকে হারমোনিয়ামে সুর তুলতে শুরু করে। গুনগুন করে গাইতে থাকে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনিরের সঙ্গে নাটকের রিহার্সেল নিয়ে দু-একটা কথা হয়। বাচ্চাদের গান শেখা শেষ হলে ঘরটায় নাট্যকর্মীরা হাজির হতে শুরু করে–এরকম রুটিন চলে আসছে অনেক বছর ধরে। আমানউল্লাহ নিজে গান গাইতে পারেন না। কিন্তু এই শহরে তার গানের স্কুলটার বয়স বেড়েছে। 
গতকাল বিকেলে বাসায় এসে তাকে খবরটা জানায় সাদেক। লিমা অনেকবার নিষেধ করার পরেও রিকশা চড়ে চলে গিয়েছিলেন ইলেকট্রিক মার্কেটে। ঘরের দরজা ভাঙা, পুরোনো কাঠের পাল্লা ফ্রেম থেকে প্রায় খুলে গেছে। বোঝাই যায় লাথি মেরে ভাঙা হয়েছে। মেঝেতে পড়ে আছে হারমোনিয়াম, তবলা। একপাশে কাঠের টেবিলে রাখা কাগজপত্র, বই এক জায়গায় জড়ো করে আগুন দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগই পুড়ে গেছে। হারমোনিয়ামটা ধারালো কোনো কিছুর আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। যন্ত্রটার সুর তোলার আর কোনো সক্ষমতা নেই। 

দুপুরে একদল লোক এসেছিল। তারা মিছিল করে এসেছিল। তাদের চিৎকার আর স্লোগানে ভয় পেয়ে ইলেকট্রিক মার্কেটের সব দোকানের শাটার নেমে গিয়েছিল সশব্দে। দোতলায় উঠে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ওই মিছিলের লোকেরাই ভাঙচুর চালায়। তাদের থামাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। ভয় একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া। তিপ্পান্ন বছর আগে ভয় পেয়েছিলেন তিনি। এই শহরে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের এক দুপুরে ভয় তাঁর আত্মার দখল নিয়েছিল। তাদের পৈরতলার বাসায় তখন অনেক মানুষ। ঢাকা থেকে পালিয়ে এসেছে বড় চাচা, চাচি, তাদের ছেলে রফিক আর মেয়ে ঝরনা। সেজ খালা চলে এসেছে বড় ছেলে মানিক ভাইকে নিয়ে। খালুর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তিনি রয়ে গেছেন সৈয়দপুরে। সেখানে স্থানীয় বিহারিরা বাঙালিদের ধরে ধরে জবাই করেছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছিল। ভয় জমা হচ্ছিল সবার মনে। উদ্বেগ বরফে তৈরি এক ধারালো করাতের মতো সবার মনকে ফালা ফালা করছিল। অদৃশ্য করাতের ব্লেডে লাল রক্তের দাগ...রফিক ঢাকার রাস্তায় মানুষের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকার বিবরণ দিয়েছিল। বলেছিল, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বস্তি, ঘরবাড়ি। রাতের অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়া পাকিস্তানি সৈন্যদের বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে বহু ছাত্র-জনতা আর পুলিশ। 

শিল্পকর্ম :: নাজিব তারেক

তাদের এই শহরটাও তখন আর নিরাপদ ছিল না। মেঘনা নদী বেয়ে অজানা জলচর প্রাণীর মতো ভেসে এসেছিল গানবোট। সৈন্যরা থমথমে আর মৃত শহরে পাটের গুদাম, বাজার আর কলেজে আগুন লাগিয়েছিল। সেই বহ্নুৎসবে বাজারের সবচাইতে পুরোনো চালের আড়তের মালিক সুধাংশু সাহাও পুড়ে গিয়েছিল। সৈন্যরা তাকে একটা ঠুনির সঙ্গে বেঁধে রেখেছিল আগুন দেওয়ার সময়। সব দেখেছিলেন আমানউল্লাহ। সাইকেল নিয়ে বের হয়ে ঘুরে ঘুরে দেখেছিলেন লঞ্চ ঘাটে প্রাণ ভয়ে পালাতে চাওয়া মানুষের ভিড়, পোড়া কলেজ ভবনের সামনে তখনও কাগজপত্রের ওড়া ছাই শান্ত বাতাসে ভেসে যাচ্ছে। দেখেছিলেন খাসির শরীরের মতো ঠুনিতে উল্টো করে বাঁধা সুধাংশু সাহার পুড়ে কালো হওয়া শরীর। ভয় তো পাওয়ারই কথা। কিন্তু ১৯৭১ সালের সেই জুলাই মাসে আরও এক ভয় তাঁর গলা টিপে ধরেছিল যখন রঞ্জু ভাই একটা বাজারের ব্যাগে  দুটো পিস্তল আর বড় আমড়ার সাইজের তিনটি বস্তু দিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। আমড়ার মতো বস্তুগুলোর নাম গ্রেনেড। সন্ধ্যাবেলা তাঁকে ডেকে বাসা থেকে বের করে রঞ্জু ভাই নির্দেশ দিয়েছিল, অস্ত্র পৌঁছে দিতে হবে শহরের লাল মাটি পাড়ার সিরাজদের বাসায়। তারপর নেমে আসা সন্ধ্যার অন্ধকার গায়ে চাদরের মতো জড়িয়ে রঞ্জু ভাই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। ব্যাগ হাতে কিছুক্ষণ আমানউল্লাহ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের বাসা থেকে একটু দূরে ডোবাটার পাশে। ভয়ের মতো অন্ধকার নেমে আসছিল তখন। রাস্তায় কোনো মানুষজন নেই। গলিটার মুখে তাহেরও তার মুদির দোকানে তালা লাগিয়ে চলে গেছে। ব্যাগ হাতে বাসায় ঢোকার সময় কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল শরীরে। এশার নামাজের আজান দিচ্ছে মসজিদে। বাসার সবাই নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমানউল্লাহ সহজেই বাসায় ঢুকে যেতে পেরেছিলেন সেদিন। মুক্তিযুদ্ধ শব্দটা কয়েকদিন আগেও এই শহরে মানুষের ফিসফিস করে বলা কথার মধ্যে বেঁচে ছিল। অত বছর আগে আমানউল্লাহর হঠাৎ মনে হয়েছিল যুদ্ধটা তাঁর পড়ার টেবিলের পাশে রাখা কাঠের আলমারির পিছনে ঢুকে পড়েছে। তার মনে হচ্ছিল, নিরীহ বাজারের ব্যাগটা তীব্র দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছে। ঘরে কেউ আসার আগে ব্যাগের মুখ খুলে একবার দেখেছিলেন শান্তভাবে ঘুমিয়ে থাকা অস্ত্রগুলোকে। ভীষণ ভয়ে তাঁর মনে হয়েছিল বমি হয়ে যাবে তখনই। কিন্তু হয়নি। রাতে তাঁর সঙ্গে ঘুমাতে আসা রফিককেও কিছু বুঝতে দেননি। তাঁর শুধু মনে হচ্ছিল ব্যাগের ভিতরে থাকা অস্ত্রগুলো তাঁকে দেখছে, তাদের শরীর ক্রমশ ফুলে উঠে মাংশপেশির আকার ধারণ করছে একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায়।

সেই জুলাই মাসের রাতে ঘুম আসেনি আমানউল্লাহর। সকালে বাড়ির মানুষদের ঘুম ভাঙার আগেই ব্যাগটা নিয়ে বের হয়ে পড়েছিলেন। লাল মাটি এলাকাটা মূল শহর থেকে একটু দূরে। ১৯৭১ সালে খুব বেশি রিকশা চলত না তাদের শহরে। ঘুর পথে অনেকটা হেঁটে যেতে হয়েছিল লাল মাটি। গোটা পথে তাঁর সঙ্গী ছিল ভয় আর আতঙ্ক। কাঠপট্টি পার হয়ে নিউ কলোনির ভিতর দিয়ে সেদিন সিরাজকে ব্যাগটা পৌঁছে দিয়েছিলেন আমানউল্লাহ। পথে প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে যাবেন। কেউ তাকে দাঁড় করাবে, উদ্যত রাইফেলের নল জানতে চাইবে, কী আছে ব্যাগটার ভিতরে?  
সেদিন ব্যাগ পৌঁছে দিয়ে সোজা বাসায় ফেরেননি আমানউল্লাহ। শূন্য আর মৃত শহরটাকে অতিক্রম করে চলে গিয়েছিলেন মেঘনার ঘাটে। সেখানেও ভৌতিক নির্জনতা ভাসছিল নদীতে, লোহার পন্টুনের গায়ে ঢেউ আছড়ে পড়ে ফিরে যাচ্ছিল, পাখির দল নিরাপদ আকাশ থেকে কিছুটা নেমে এসে আবার উড়ে চলে যাচ্ছিল, দূরে গাছপালা ঘেরা সন্ত্রস্ত গ্রাম নিশ্চুপ হয়েছিল। 
একটা বন্ধ রুটি-কলার দোকানের সামনে ফেলে যাওয়া কাঠের বেঞ্চিতে অনেকক্ষণ বসেছিলেন আমানউল্লাহ। তাঁর শরীরকে আক্রমণ করা ভয়ের জ্বরটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছিল তখন। তাঁর মনে হয়েছিল, রঞ্জু ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করা প্রয়োজন। কিন্তু তখনও আমানউল্লাহ রঞ্জুর গোপন ঠিকানা জানতেন না। 
২.
চোখ থেকে হাত সরিয়ে বিছানায় উঠে বসেন আমানউল্লাহ। পুরো বাসায় চেপে বসেছে নৈঃশব্দ্য। পাখির ডাক শুনতে পান। তিনি বুঝতে পারেন, তার বৃহত্তর পরিবারের সদস্যরা গতকালের ঘটনাটা নিয়ে চিন্তিত। তাঁর মানসিক অবস্থার কথা ভেবে সবাই নিশ্চুপ হয়ে আছে। যতদূর সম্ভব নিঃশব্দে চলাফেরা করছে, নিচু স্বরে কথা বলছে। 
‘সুর বিতানের বয়স কত হলো?’ মাঝে মাঝে প্রশ্নের উত্তরটা ভুলে যান আমানউল্লাহ। গত কয়েক বছর হলো লিমা স্কুলের জন্মদিন মনে করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে। অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে। তাঁর গানের স্কুলের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়েনি। বরং কমেছে। তবুও স্কুলের দরজা বন্ধ করেননি আমানউল্লাহ। তাঁর নিজের পকেটের টাকা ঢেলে হাত আড়াল দিয়ে ধরে রেখেছেন শিখাটুকু। দেশ নাট্য সম্প্রদায়কে রিহার্সেল দেওয়ার জায়গা তারই উদ্যোগ। আমানউল্লাহ বিশ্বাস করেন কোথাও না কোথাও লড়াইটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আঠারো-উনিশ বছর বয়সী এক কিশোর হয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধে জড়িয়ে গিয়েছিলেন। এই শহরে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র আনা-নেওয়া, নিরাপদ আশ্রয়স্থল তৈরি করার কাজগুলো তাঁর মনের মধ্যে ভয়ের জ্বরকে জয় করেছিল। গোটা শহরে পাকিস্তানি সৈন্যরা যখন মুক্তিবাহিনীর খোঁজে টহল দিয়ে ফিরছে, রাজাকার বাহিনী ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়ায় পাড়ায় তখন নিজেকে আশ্চর্য কৌশলে বাতাসের ভিতরে অদৃশ্য রেখে এক কিশোরকে চলাচল করতে দেখেন আমানউল্লহ। অস্ত্রের মতো, গোপনে রাখা বিষ্ফোরকের মতো তখন তাঁর শরীরেও যেন শক্তিশালী পেশির বিস্তার ঘটছে। সব জীবন্ত হয়ে উঠছে ভীষণ এক বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। সেই বিস্ফোরণের অন্য নাম স্বাধীনতা। 
আমানউল্লাহ দেখতে পান ঘরে একা থাকা তিপান্ন বছর আগের টেবিলের পাশের জানালায় কান পেতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিশোরকে, সে অপেক্ষা করছে মৃদু টোকার আওয়াজ শোনার জন্য, সে অপেক্ষা করছে গাছ থেকে খসে পড়া পাতার ওপর বৃষ্টির ফোঁটার মতো মুক্তিযোদ্ধাদের পদশব্দ শোনার জন্য, যে অপেক্ষা করছে ভীষণ এক যুদ্ধের মাঠে নিজেকে উন্মোচিত করার জন্য। উঠে দাঁড়ান আমানউল্লাহ। আঙুল বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেখেন টেবিল, কাঠের জানালার পাট, সেই আলমারির পেছনে অস্ত্র লুকিয়ে রাখার দেয়ালের ভাঙা জায়গাটা। 
‘আরেক কাপ চা দেবো চাচা?’
লিমার প্রশ্নে চারপাশে জেগে ওঠা অনুভূতির জগৎটা পলকে হারিয়ে যায়। একটা রাজনৈতিক সময়ের ভিতর থেকে অন্য একটি রাজনৈতিক সময়ের তীরে ভেসে ওঠেন। 
‘না, এখন আর চা খাব না। বাইরে যেতে হবে।’
‘এখন কোথায় যাবেন?’ লিমার কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়ে। 
‘ছোট্ট একটা কাজ বাকি আছে; সেরে আসি।’
‘লিটনকে বলি?’
লিমার কথায় ওর উদ্বেগটা টের পেয়ে ভালো লাগে আমানউল্লাহর। তাঁর জন্য ভাবে এরা। একটা জীবন তো নিজেকে কোথাও জড়াননি। এরাই তাঁর সংসার। সামান্য হেসে মাথা নাড়েন। 
‘ভয় পেও না। ওরা আমার কিছু করতে পারবে না।’ 
পাঞ্জাবিটা পরে স্যান্ডেল শু পায়ে জড়ান আমানউল্লাহ। এখন আর ভাঙা হারমোনিয়ামের বিশ্রী আওয়াজ মাথার ভিতরে ভেসে থাকছে না, ১৯৭১ সালে আসা ভয়ের জ্বরটাও নেই। শান্ত ভঙ্গিতে বাসা থেকে রাস্তায় বের হন তিনি। রিকশায় লাল মাটি যেতে খুব বেশি সময় লাগে না এখন।
ওখানেই তো যেতে হবে। সিরাজের মেয়ে বনশ্রীর হারমোনিয়ামটা ধার নিতে ওখানেই যেতে হবে তাঁর। 
হারমোনিয়াম নিয়ে যখন আবার রিকশায় চড়ে বসেন আমানউল্লাহ তখন চারপাশে দুপুরের রোদ ঝরে পড়ছে। লাল মাটি থেকে ইলেকট্রিক মার্কেট অনেকটা রাস্তা। দরজাটা এখনও ভাঙা পড়ে আছে। সেখানে গিয়ে হারমোনিয়াম বাজাতে হবে। সুরেলা হারমোনিয়াম আবার বেজে উঠবে। কোনোদিন গান গাননি আমানউল্লাহ। আজকে গাইবেন? গুনগুন করে গাইবেন হয়তো তরুণের মতো করে। মিছিল করে আসা লোকগুলি বলে গেছে, গানের স্কুল আর করা যাবে না। আজকে গান গাইবেন আমানউল্লাহ। গান তাঁকে গাইতেই হবে। দুপুরের রোদ বলছে তাঁকে, ভাঙা হারমোনিয়াম জানিয়েছে তাঁকে অনেক কথা। 

লেখক
ইরাজ আহমেদ
কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন

×