স্বাধীনতা দিবস ২০২৬
বাঙ্কার থেকে প্রতিরোধ
সৌরভ হাবিব
মো. তৈয়বুর রহমান
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
২৫ মার্চ রাতে এ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দলমত নির্বিশেষে একটা প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে পুলিশের যেসব সদস্য বেঁচে যান, তারাও সাধারণ মানুষের প্রতিরোধে সমর্থন জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আমার গ্রামের বাড়ি ছিল রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার মাদারপুরে। শহরের পুলিশ সদস্যদের অনেকেই তখন ইপিআর হেডকোয়ার্টারে চলে আসেন। তাদের সঙ্গে আমিও যোগ দিই। ২ এপ্রিল তৎকালীন ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দীন আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গোদাগাড়ীর মহিশালবাড়ীতে রাজশাহী-ঢাকা সড়কের ওপর আমরা ডিফেন্স (প্রতিরক্ষা) তৈরি করি। সেখানে আমরা মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বাঙ্কার তৈরি করে অবস্থান নিই। আমাদের হাতে তখন অস্ত্র বলতে ইপিআরের সরবরাহ করা থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এসএলআর। সেখান থেকে আমরা প্রায় ১৫০ জন মুক্তিসেনা ৫ এপ্রিল রাজশাহী শহরে প্রবেশ করি। শহরের রায়পাড়া আমবাগানে এসে অবস্থান নিই। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষিপ্তভাবে হামলা, পাল্টা হামলা ও গোলাগুলি হয়। ইতোমধ্যে নাটোর, নওগাঁ, চারঘাটের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইপিআর সদস্যরা এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন। এতে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্পের মধ্যে মূলত অবরুদ্ধ হয়ে যায়। ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তারা ক্যাম্পে অবরুদ্ধ ছিল।
পাকিস্তানি বাহিনী নিরুপায় হয়ে তাদের জীবন বাঁচাতে ঢাকায় অতিরিক্ত সৈন্য চেয়ে খবর পাঠায়। ১৩ এপ্রিল ঢাকা থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভারী অস্ত্র নিয়ে রাজশাহীতে প্রবেশ করে। এর আগে ১২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী পুঠিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের বাধার মুখে পড়ে। পুঠিয়ার ঝলমলিয়ায় কয়েকজন আনসার সদস্য আধুনিক সমরাস্ত্র নিয়ে আসা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গুলি চালায়। পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ করে আনসার সদস্য তৈমুর মুন্সীসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে। কয়েকটি গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা বিড়ালদহ মাইপাড়া লোহার ব্রিজের কাছে এসে আবারও প্রতিরোধ যুদ্ধের মুখে পড়ে। সেদিন পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় দুই শতাধিক মানুষ মারা যায়।
পাকিস্তানি বাহিনী এরপর বানেশ্বরে এসে দুই ভাগে বিভক্ত হয়। একপক্ষ চলে যায় সারদায় পুলিশ একাডেমিতে। আরেকপক্ষ চলে আসে রাজশাহী শহরে। তারা শহরের তালাইমারীতে এসে আবারও বাধার মুখে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গোলাগুলি হয়। এতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ হতাহত হন। পরে আমরা শহর ছেড়ে বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে ফিরে যাই। পুনরায় আমরা গোদাগাড়ীতে গিয়ে ডিফেন্স নিই। আমরা সংগঠিত হতে থাকলাম, এরই মধ্যে ১৪ এপ্রিল শতাধিক পাকিস্তানি সেনা ফায়ার করতে করতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অভিমুখে রওনা দেয়। তখনও আমরা সেখানেই ডিফেন্স নিয়েছিলাম। কিন্তু তাদের ভারী অস্ত্রের মুখে আমরা আবারও ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। পরে আমি বাবা-মাকে নিয়ে পদ্মা নদী পার হয়ে ভারতের তারানগরে আমার দাদার বাড়ি চলে যাই। সেখানে বাবা-মাকে রেখে ২২ এপ্রিল মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা মুক্তিযোদ্ধা অপারেশন ক্যাম্পের তৎকালীন সাব-সেক্টর ৪-এর কমান্ডার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দীন আহমেদ চৌধুরীকে রিপোর্ট করি। তিনি আমাকে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ভর্তি করে নেন।
১ মে আমাদের একটি গ্রুপকে ভারতের চাকুলিয়ায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে আমরা এক মাস ১৭ দিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। জুন মাসের মাঝামাঝি আমরা পুনরায় লালগোলা সাব-সেক্টর হেডকোয়ার্টারে ফিরে এসে রিপোর্ট করি। জুনের তৃতীয় সপ্তাহে আমাদের আবার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য রাজশাহী শহরে পাঠানো হয়। আমরা রাজশাহী শহরের বিদ্যুৎ অফিসে আক্রমণ করে অফিসটি ধ্বংস করে দিই। এরপর গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে অংশ নিয়ে মোহনপুর থানার সাঁকালো ক্যাম্পে আক্রমণ করে ১৩ রাজাকারকে হত্যা করি। আগস্টে তৎকালীন সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দীন চৌধুরীর নেতৃত্বে অভয়া ব্রিজে আক্রমণ চালিয়ে ১০ জন পাকিস্তানি সৈন্যকে হত্যা ও অর্ধশতাধিক সৈন্যকে আহত করি। এ যুদ্ধে আমাদের সঙ্গে অংশ নেওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা তৌহিদ শহীদ হন। ৩ নভেম্বর অনারারি লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান টুনুর নেতৃত্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইসলামপুর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করি। দুই পক্ষের মাঝে তুমুল যুদ্ধ হয়। প্রচণ্ড গোলাগুলি। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ভারী মেশিনগানের ব্রাশফায়ারে আমাদেন ৯ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এর মধ্যে হাবিলদার আবুল কাশেমের মৃতদেহ আমরা নিয়ে আসতে পারলেও অন্যদের লাশ আনতে পারিনি। সেখানে হাবিলদার নিজাম উদ্দীন জীবিত থাকলেও হানাদার বাহিনী তাঁকে ধরে চরম নির্যাতন চালায়। তাঁর দুই চোখ উঠিয়ে ফেলে এবং শরীরের গোপন অঙ্গ কেটে ফেলে। তাঁর আর্তচিৎকারে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠলেও আমরা কিছুই করতে পারিনি। আমরা শহীদ হাবিলদার আবুল কাশেমকে এনে হাকিমপুর সীমান্ত চৌকির পাশে তাঁকে দাফন করি।
এরপর ১২ ডিসেম্বর আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের রাজারামপুর এলাকায় প্রবেশ করি। হাসিনা গার্লস স্কুলের পাশে আমরা অবস্থান নিই। পাকিস্তানি বাহিনী সেদিন সন্ধ্যায় আমাদের ওপর হঠাৎ আক্রমণ করে। সেখানে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর সশস্ত্র দুটি গাড়ি আমরা ধ্বংস করি। আমাদের আক্রমণে তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে পালিয়ে যায়। ১৩ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রাজশাহী সড়কের দাড়িয়াপুর-হরিপুর এলাকায় একটা যুদ্ধ হয়। সেখানে আমাদের সঙ্গে ভারতের বিএসএফ সদস্যরাও অংশ নেন। এতে বিএসএফের এক সদস্য শহীদ হন। পরে আমরা ফিরে আসি। আমরা ফিরে আসার সময় শান্তির মোড়ে আবারও পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি হই। সেখানে আমাদের ওপর আরআরগানের গুলি করা হয়। তখন আমরা আবারও পিছু হটি। এভাবে ১৪ ডিসেম্বরও চলতে থাকে। ওইদিন আমরা হানাদার বাহিনীর শক্ত ঘাঁটি বিডি হল অভিমুখে রওনা হই। তখন আবারও প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। আমাদের সঙ্গে তখন প্রায় ২০০ জন। পাকিস্তানি বাহিনীর সংখ্যাও ছিল অনেক, সঙ্গে ভারী অস্ত্র। তবুও আমরা লড়াইয়ের মধ্যে ছিলাম। বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ খবর এলো আমাদের থেকে এক মাইল দূরে রেহায়ের চরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর শহীদ হয়েছেন। এ খবরে আমরা যখন মর্মাহত, ঠিক সেই সময় পাকিস্তানি বাহিনীর মর্টারশেল আমাদের ওপর নিক্ষিপ্ত হতে থাকে। ইতোমধ্যে আরেকটি দুঃসংবাদ আমরা পাই। সেটা হলো, আমাদের মর্টারপ্লাটুন বাহিনীর ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর শেল আক্রমণে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং চারজন আহত হন। এতে আমরা হতাশাগ্রস্ত হই। এদিন পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণে আরও দুজন আহত হলে আমরা পেছনে সরে আসি। বিকেল ৪টার দিকে মেজর গিয়াস আমাদের আবারও যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখন আবারও প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। রাত ১২টা পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলতে থাকে। রাত ১টায় হঠাৎ পাকিস্তানি বাহিনীর গুলি বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তানি বাহিনী রাজশাহীতে পালিয়ে যায়। আমরা তাদের পিছু ধাওয়া করি। দুপুর ১২টার দিকে আমরা আবারও গোদাগাড়ীতে গিয়ে ডিফেন্স নিলে সাধারণ মানুষ আমাদের অভিনন্দন জানায়। অনেকেই ফুলের মালা পরিয়ে আমাদের বরণ করে। সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতা ইসাহাক ডাক্তার আমাকে বুকে জড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করেন। আমার হাতে তখন এলএমজি ছিল। গ্রুপ কমান্ডার হারুনার রশীদ নির্দেশ দিলেন রাজশাহী শহরের গিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। গোদাগাড়ীর সিঅ্যান্ডবি মোড়ে পজিশন নিলে দেড়শ জন রাজাকার আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই রাজশাহী শহরের দিক থেকে শতশত মানুষ জয় বাংলা স্লোগানে আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। তারা আমাদের সাতজনকে একটি জিপে তুলে নেয়। আমার এলএমজি সামনে লাগিয়ে রাজশাহী শহরের দিকে যেতে থাকে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আমরা কোর্ট ঢালুর মোড়ে পৌঁছি। রাত ৮টায় আমরা রাজশাহী বেতার কেন্দ্র দখলে নিই। রাত ৯টায় রাজশাহী শহরের সিঅ্যান্ডবি মোড়ে উপস্থিত হলে শতশত মানুষ আমাদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয়। রাত ১১টায় রাজশাহী কলেজের কলাভবনে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ওইদিন রাতে রাজশাহী রেলস্টেশনে আমার ডিউটি পড়ে। সেখানে বিহারিদের সঙ্গে আমাদের প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়। আমাদের পাল্টা গুলিতে তারা স্তব্ধ হয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৮টায় আমরা গাড়ি নিয়ে চলে যাই বোয়ালিয়া ক্লাবে। সেদিকে যেতেই মিশন হাসপাতালের কাছে গির্জার সামনে যেতেই ভারতের চাকুলিয়া গোর্খা রেজিমেন্টের, যেখানে আমি প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম, এক প্রশিক্ষকের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে বলেন, ‘তোমারা ঘর কিধার হ্যায়?’ আমরা গোটা রাজশাহী শহরের নিয়ন্ত্রণ নিই। আর কোনো পাকিস্তানি সৈন্য শহরে খুঁজে পাইনি। শত্রুমুক্ত হয় রাজশাহী।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন
সৌরভ হাবিব
রাজশাহী ব্যুরোপ্রধান
- বিষয় :
- স্বাধীনতা
