ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্বাধীনতা দিবস ২০২৬

একাত্তরের অজানা অধ্যায়

একাত্তরের অজানা অধ্যায়
×

তৌহিদুর রহমান

মারুফ হোসেন

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তরে শুধুই ঢাকার নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেননি যশোরের আন্দোলন-সংগ্রামীরা। ১ মার্চ রেডিওতে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের খবর শোনার পর যশোরের রাজপথে হাজার হাজার জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নেমে আসেন। শুরু হয় ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এ অঞ্চলের সর্বত্র সংগ্রাম কমিটি গঠিত হতে থাকে। যশোরে ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপ এবং ভাসানী ন্যাপের মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি থাকলেও তাদের কারও কারও ধারণা ছিল, শেষ পর্যন্ত ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। কিন্তু ১ মার্চের পর তারা বুঝতে পারেন, হামলা আসন্ন। ফলে তারাও স্বাধীনতার দাবির পক্ষে এসে দাঁড়ান। এর ফলে মার্চের অসহযোগ আন্দোলন দ্রুত গণসংগ্রামের চরিত্র ধারণ করে।
স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও সমাজতন্ত্র কায়েমের লক্ষ্যে ষাটের দশকে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে যে কয়েকটি জেলায় অত্যন্ত গোপনে ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস গ্রুপ সেল গঠিত হয়, তার মধ্যে যশোর অন্যতম। একাত্তরের মার্চের শুরুতেই আমার বাবা মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে এখানে স্বাধীন বাংলা নিউক্লিয়াস বা স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। শহরের শংকরপুর কবরখানার পাশে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে ৪০ জন কর্মী এ প্রশিক্ষণ নেন। এতে প্রশিক্ষক ছিলেন বিমানবাহিনীতে কর্মরত আবু জাহিদ। যশোরের প্রতিরোধ যুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নিউক্লিয়াস গ্রুপের এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যশোরের মানুষের কাছে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ একটি ঐতিহাসিক দিন। স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল এদিন। সকালে স্বতঃস্ফূর্ত জনতার পাকিস্তানিবিরোধী বিশাল মিছিল বের হয় ঈদগাহ ময়দান থেকে। সরকারি খাদ্যগুদামের সামনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থান দেখে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের দিকে ইট ও জুতা নিক্ষেপ করে। এ সময় এক পাকিস্তানি সেনা জনতাকে ভয় দেখাতে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। সেই গুলিতে আকাশে উড়তে থাকা একটি চিল গুলিবিদ্ধ হয়। মৃত চিলটি নিয়ে মিছিল আবার ফিরে আসে ঈদগাহ ময়দানে। বিভিন্ন মহল্লা থেকে তখনও মানুষ জড়ো হচ্ছিল সেখানে।
দুপুর ১২টার দিকে হানাদার বাহিনীর একটি গাড়ি ঈদগাহের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জনতা আবার উত্তেজিত হয়ে ওঠে। খবর আসে, টেলিফোন ভবন দখল করে নিয়েছে হানাদার বাহিনী। এতে উপস্থিত ছাত্র-জনতার মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তাদের একটি অংশ ঈদগাহ ময়দান থেকে বেরিয়ে টেলিফোন ভবনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই ভবনের ছাদ থেকে জনতার ওপর মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে হানাদার বাহিনী। ছোড়া একটি বুলেট পাশের ঘরের গোলপাতার ছাউনি ভেদ করে গৃহবধূ চারুবালা করের মাথায় আঘাত করে। তিনি মুক্তি সংগ্রামে যশোরের প্রথম শহীদ হন।
নির্বিচার গুলিবর্ষণে আরও অনেকে আহত হন। চারুবালা করের মরদেহ যশোর সদর হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়। মর্গে তালা লাগিয়ে পাকিস্তানি সেনারা সেখানে অবস্থান নেয়। বাইরে হাজার হাজার মানুষ মরদেহ নেওয়ার অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এতে জনতার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। উত্তেজিত জনতা মর্গের তালা ভেঙে মরদেহ উদ্ধার করে। সূর্য তখন অস্তমুখী– হাজার হাজার মানুষ চারুবালার মরদেহ নিয়ে ছুটে চলে নীলগঞ্জ মহাশ্মশানের দিকে। শবযাত্রায় পুরুষের পাশাপাশি বহু নারীও যোগ দেন। সবার চোখেমুখে প্রতিরোধের দৃঢ় সংকল্প। সেখানে সমাধিস্থ করা হয় শহীদ চারুবালা করকে। তিনিসহ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে নয় মাস পর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।
ঢাকায় ২ মার্চ স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলিত হলেও তা যশোরে পৌঁছানোর আগেই ৪ মার্চ রাতে যশোরের ঈদগাহ ময়দানের এক প্রান্তে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়। আগের রাতে ‘নতুন দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদ উল হকের কার্যালয়ে বসে পতাকার নকশা চূড়ান্ত করা হয়। সালেহা বেগম নিজ হাতে সেই পতাকা তৈরি করে আনেন। ২৩ মার্চ পতাকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে যশোর কালেক্টরেটে উত্তোলন করা হয়। চারুবালা করের মৃত্যুতে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে যশোর। প্রতিবাদে আবারও মিছিল-স্লোগানে মুখরিত হয় শহর। স্বাধীনতার এক দফা দাবির বাস্তবায়ন তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যশোরবাসী অসহযোগ আন্দোলন শুরু করে। শহরের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সেনানিবাসে সব ধরনের পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তারা। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।
মহান স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর আজকের প্রজন্মের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবুও সত্য যে, একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে নিরস্ত্র লাখো মানুষ যশোর সেনানিবাসকে ৩১ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত টানা চার দিন অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই অধ্যায় এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই চার দিনের শিক্ষা নয় মাসের যুদ্ধে বাঙালিকে সাহস জুগিয়েছিল।
তখন আমি কিশোর হলেও স্পষ্ট মনে আছে, যশোর সেনানিবাসের পাকিস্তানি কর্নেল তোফায়েল ২৫ মার্চ সকালে আওয়ামী লীগ নেতাদের চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানান। তার উদ্দেশ্য ছিল খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। নেতারা যান, কিন্তু তাদের গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা দেখে পাকিস্তানিরা বিস্মিত হয়। পরে রাতে ডিনারের আমন্ত্রণ জানানো হলেও ততক্ষণে বিভিন্ন সূত্রে খবর আসতে থাকে যুদ্ধ আসন্ন। যশোরের সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা, ঢাকা থেকে আসা বার্তা এবং ইপিআরের তথ্য– সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত হয় আর আলোচনা নয়, যুদ্ধই একমাত্র পথ।
২৫ মার্চ রাতে হানাদার বাহিনী ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে শহরে প্রবেশ করে। কসবা এলাকায় তাদের কনভয়ের ওপর হাতবোমা নিক্ষেপ করে ফাইটিং স্কোয়াড। তবে সেদিন রাতেই শহর দখল করে নেয় তারা। গ্রেপ্তার হন অ্যাডভোকেট মশিয়ুর রহমান, মঈনুদ্দিন মিয়াজীসহ অনেকে। অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়। কারফিউ জারি করা হয়। তবে ২৫ মার্চ রাতে ইপিআরের তরফে কোনো প্রতিরোধ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়নি। হানাদারও ওইদিন হামলা করেনি তাদের ওপর। ইপিআর সেক্টর হেড কোয়ার্টারে সতর্ক অবস্থায় বাঙালি সৈনিকরা যে কোনো পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ২৬ মার্চ সকালে ইপিআর সদর দপ্তরে গুলি চালালে বাঙালি সৈনিকরা পাল্টা জবাব দেন। তারা অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ।
অবাঙালিরা পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় শহরে লুটপাট, হত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ চালায়। ঝুমঝুমপুর হয়ে ওঠে তাদের ঘাঁটি। গ্রামে গ্রামে গঠিত সংগ্রাম কমিটি শহর আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। শুরু হয় সশস্ত্র যুদ্ধ। ৩ এপ্রিল হানাদার বাহিনী আকস্মিক মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর কামানের গোলা নিক্ষেপ শুরু করে। তাদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মুখে সামান্য অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। এ সময় হানাদাররা বিমান হামলা চালাতেও থাকে। 
৪ এপ্রিল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরক্ষা অবস্থান সরিয়ে নেন। কিন্তু হানাদারদের যশোর শহর দখল করতে লেগে যায় ৬ এপ্রিল পর্যন্ত। মুক্তিবাহিনী যশোর বেনাপোল সড়কের বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান তৈরি করেন। হানাদাররা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে বেনাপোল সড়ক কব্জা করতে। কলকাতার সঙ্গে এ পথের সরাসরি যোগাযোগ থাকায় বহির্বিশ্বে যশোরের প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছিল। এ কারণেই তারা ওই উদ্যোগ নেয়। এদিকে ক্যাপ্টেন হাফিজ চৌগাছার মাসলিয়া সীমান্তে তাঁর সৈনিকদের এবং ইপিআর সদস্যদের পুনর্গঠিত করে কয়েকটি হামলা পরিচালনা করেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ হয় অস্ত্রের জন্য। সারা এপ্রিল এবং মে পর্যন্ত অগণিত প্রতিরোধ যুদ্ধে সাফল্য অর্জিত হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধকালে ভারতে না গিয়েও যশোর এলাকায় অনেকের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর জন্ম হয়।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধার সন্তান

অনুলিখন
তৌহিদুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর

আরও পড়ুন

×