ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্বাধীনতা দিবস ২০২৬

দেখামাত্র গুলি করা হবে!

দেখামাত্র গুলি করা হবে!
×

হাসান হিমালয়

মনিরুজ্জামান মনি

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৬ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৩:০৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ফজরের কিছু পরেই আমাদের বাড়ির সামনে, উদয়ন ক্লাবের কাছে পাকিস্তান তথ্য অফিসের একটি গাড়ি এসে দাঁড়ায়। লম্বা উইলিস জিপে চারটি মাইক লাগানো থাকত। তারা ঘোষণা করতে লাগল– ‘সারা পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। কেউ বাড়ির বাইরে বের হতে পারবেন না। দেখামাত্র গুলি করা হবে। দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সব অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’

এই ঘোষণার পর আর কারও বুঝতে বাকি থাকল না কী হয়েছে। তখন আমাদের বাড়িতে ট্রানজিস্টার রেডিও ছিল। বিবিসি, আকাশবাণীর মাধ্যমে খবর পেলাম ঢাকায় ভয়াবহ ক্র্যাকডাউন হয়েছে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সেই সংবাদ খুলনায় ছড়িয়ে পড়তেই সবাই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন।
ওইদিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ দুপুরে আমাদের বাড়ির উঠানে শেখ কামরুজ্জামান টুকু ও তৎকালীন ছাত্রনেতারা বৈঠকে বসলেন। আমরা জুনিয়ররাও সেখানে ছিলাম। আলোচনা হলো– যুদ্ধ শুরু করতে হবে। কিন্তু আমাদের হাতে তো পর্যাপ্ত অস্ত্র নেই। তখনই ওই বৈঠকে পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুটের সিদ্ধান্ত হয়। বিকেলেই অস্ত্রাগারে হামলা চালিয়ে কিছু অস্ত্র আনতে সক্ষম হন তারা। তবে বেশি অস্ত্র আনা যায়নি। কারণ পুলিশরাও গুলি ছোড়া শুরু করেছিল। তারপরও ছাত্রনেতাদের হাতে তখন বেশ কিছু অস্ত্র জোগাড় হয়ে যায়।

বর্তমান যে অফিসার্স ক্লাব রয়েছে, সেটি তখন ছিল ইউএফডি ক্লাব। তত দিনে ইউএফডি ক্লাবে বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা এসে তাঁবু গেড়েছে। একই সঙ্গে তারা সার্কিট হাউস ময়দানেও তাঁবু গেড়েছিল। তখন সার্কিট হাউস ছিল ছোট্ট একটি ভবনে। ওই ২৬ মার্চ রাতেই কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে ছয়-সাতজনের একটি দল যাদের হাতে ভারী অস্ত্র ছিল, আমার সেজো ভাই জহুরুল হকসহ (বড় খোকা) বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করল। তারাও পাল্টা গুলি ছুড়ল। বলতে গেলে খুলনার প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ ২৬ মার্চ রাত থেকেই শুরু হলো।
এর আগে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। না হলে পুরো চিত্র অনেকেই বুঝতে পারবেন না। ঢাকার মতো খুলনার মানুষ, বিশেষ করে ছাত্রনেতারা ছিলেন রাজনীতি সচেতন। ঢাকার সব খবর বেতারের মাধ্যমে দিনে দিনেই খুলনায় পৌঁছে যেত।

১৯৭০ সালের আগস্টে আমি আজম খান সরকারি কমার্স কলেজের প্রথম বর্ষে ভর্তি হই। ওই বছরই পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা নিয়ে তখন আন্দোলন চলছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠক চলছিল। রাজনীতিতে তখন অন্য রকম উত্তাপ। প্রথম বর্ষের ছাত্র হিসেবে আমরা নিয়মিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভা-সমাবেশ-মিছিলে অংশ নিতাম। মার্চের শুরু থেকেই তৎকালীন ছাত্রনেতাদের ডাকে নিয়মিত রাজপথে মিছিল-মিটিং হতো। হাদিস পার্কের শহীদ মিনারে সভা, কবিতা আবৃত্তি, নাটক মঞ্চস্থ হতো। আমরা সবকিছুতে অংশ নিতাম। ছাত্রদের মিছিলে গুলির ঘটনাও ঘটে; অনেকে শহীদ হন।

কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে ছাত্রদের একটি বড় অংশ তখন জিলা স্কুল মাঠে বাঁশের লাঠি নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করে। নিয়মিত এই প্রশিক্ষণ চলছিল, কিন্তু তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। মার্চের প্রথম সপ্তাহে গোলাম রসুল অ্যান্ড কোং নামের পাঞ্জাবিদের বন্দুকের দোকান ও গোডাউন লুট করা হয়। আমরা সেটিতে অংশ নিই। সেগুলো সবাই ভাগ করে আলাদা আলাদা জায়গায় লুকিয়ে রাখেন। আমার সেজো ভাই জহুরুল হকের ভাগে পড়েছিল একটি সেভেন এমএম রাইফেল। তিনি সেটি বাড়িতে নিয়ে এসে গ্রিজ মাখিয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখলেন।
এভাবেই বড়রা যুদ্ধের প্রস্তুতি চালিয়ে গেছেন। আমরা ছোটরা তাদের দেখে সহযোগিতা করতে লাগলাম। আমাদের তখন দুটি ট্রানজিস্টার ছিল। একটি বাড়িতে, অন্যটি সুন্দরবন কলেজের সামনে আমাদের মোটর রিপেয়ারিং ওয়ার্কশপে থাকত। ২৬ মার্চ সকালে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর সংবাদ শুনেই ছাত্রনেতাদের বুকে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। বিকেলে পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুটের পর রাতেই ইউএফডি ক্লাবে আক্রমণের সিদ্ধান্ত হয়। (বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম. বাবর আলী রচিত ‘স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান’ বইয়ে ইউএফডি ক্লাব আক্রমণের আগে খানজাহান আলী রোডে আলিয়া মাদ্রাসার সামনে কবির মঞ্জিলে বিপ্লব পরিষদ গঠন এবং ক্লাবে আক্রমণের বিষয়টি অনুমোদনের কথা রয়েছে।)

রাত ৮টায় হাজী মহসিন রোড ও আলতাপোল লেনে দুটি দল ভাগ হয়ে সেনা ছাউনিতে আক্রমণ চালায়। অল্প কিছু অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ প্রতিরোধে পাকিস্তানি বাহিনী ভারী অস্ত্র দিয়ে গুলি ছোড়া শুরু করে। অতর্কিত এই আক্রমণের জন্য পাকিস্তানি বাহিনী মোটেই প্রস্তুত ছিল না। নৈশভোজের সময় এই আক্রমণে তাদের অনেকে আহত হয়। খুলনায় পাকিস্তানি মিলিটারিদের ওপর এটাই ছিল প্রথম গেরিলা আক্রমণ। এ ঘটনার পর কামরুজ্জামান টুকু, আমার সেজো ভাই ও নোয়া ভাই যুদ্ধের জন্য নদী পেরিয়ে ওপারে চলে যান।
২৭ মার্চ সকালে চারদিকে ইপিআর ও সেনাবাহিনীর টহল চলছিল। এর মধ্যে আমরা ট্রানজিস্টার ঘোরাতে ঘোরাতে চট্টগ্রাম বেতারে সিগনাল পেলাম। তখন আমি নিজ কানেই শুনেছি– কেউ একজন বলছেন, ‘আই মেজর জিয়া, ডিক্লেয়ার দি ইন্ডিপেন্ডেন্স অব বাংলাদেশ অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ এটা বারবার বাজানো হচ্ছিল। পরে এটি আকাশবাণী ও বিবিসিতে প্রচার করা হয়।

এরই মধ্যে রেডিওতে শুনতে পেলাম– যশোর থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর বিশাল বহর খুলনার দিকে আসছে। ২৭ মার্চ বৈকালীসহ খুলনা প্রবেশের বিভিন্ন মোড়ে মুক্তিকামী ছাত্র-জনতা তাদের প্রতিরোধ করল। তুমুল যুদ্ধে অনেকে আহত হলেন। আমাদের বাড়িতে রুটি বানিয়ে আমরা তাদের জন্য নিয়ে গেলাম। আবার সাউথ সেন্ট্রাল রোডে স্পেন্সারের ওষুধের গুদাম থেকে ওষুধ নিয়ে বৈকালীর যোদ্ধাদের জন্য পৌঁছে দিলাম।
২৭ মার্চ রাতের আরেকটি ঘটনা আমাকে নাড়া দেয়। রাত দেড়টার দিকে মেশিনগানের গুলির শব্দে সবাই আতঙ্কিত হয়ে ওঠেন। পরদিন ২৮ মার্চ ভোরে সাউথ সেন্ট্রাল ও আলতাপোল লেনের মোড়ে অনুপম ফার্নিচারের দোকানে মহাদেব সাহাসহ (পাইওনিয়ার কলেজের জমির মালিক) সাতজনের ক্ষতবিক্ষত লাশ পড়ে আছে। পাকিস্তানি আর্মি তাদের গুলি করে হত্যা করেছিল। ওটাই ছিল প্রথম গণহত্যা। এরপরই শহর ফাঁকা হয়ে গেল। হিন্দুরা দলে দলে চলে যাওয়া শুরু করল। শুরু হলো বিহারিদের লুটপাট।
২৬ ও ২৭ মার্চের পর থেকে ছাত্রনেতারা সবাই শহর ছেড়ে নদী পেরিয়ে রূপসার নৈহাটিতে অবস্থান নেন। সেখান থেকে এপ্রিলের শুরুতে রেডিও স্টেশনে আক্রমণ করা হয়। মোট কথা, মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত কয়েক দফায় পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ হয়েছে। এপ্রিলের পর মুক্তিযোদ্ধাদের বড় অংশ ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য চলে যান। আমি ও আমার দুই ভাই ভারতে প্রশিক্ষণ নিতে যাই। পরবর্তী যুদ্ধগুলো পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত হয়েছিল; যা শেষ হয় ১৭ ডিসেম্বর খুলনা বিজয়ের মধ্য দিয়ে।

লেখক: আহ্বায়ক, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ খুলনা মহানগর শাখা, অনুলিখন: হাসান হিমালয়, স্টাফ রিপোর্টার, খুলনা

আরও পড়ুন

×