স্বাধীনতা দিবস ২০২৬
কারফিউর প্রথম ভোরে
রফিকুল হক
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৮ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১২:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কারফিউর সেই প্রথম ভোরটা আজও স্পষ্ট মনে আছে। রাতভর ছোটাছুটি আর উত্তেজনার পর আমরা যখন ভোরের আলো ফোটার আগেই রাস্তায় নামি, তখনও জানতাম না দেশ ইতোমধ্যে এক ভয়াবহ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কারফিউর প্রথম ভোরেই ব্যারিকেডে পাকিস্তানি সেনাদের ধাওয়া খেয়েছিলাম– সেই অভিজ্ঞতা আজও ভুলতে পারিনি।
আমি রফিকুল হক। বাড়ি সিলেট নগরীর কদমতলীতে। ১৯৭১ সালে জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও মদন মোহন কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস ছিলাম। স্বাধীনতার পর একাধিকবার সিলেট মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছি। পেশায় আমি একজন আইনজীবী। ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে নানা সময়ের স্মৃতি আজও আমার মনে জ্বলজ্বল করে। সদর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ২৬ তারিখ তেমুখী এলাকায় (বর্তমান কদমতলী মুক্তিযোদ্ধা চত্বর) লাঠি মিছিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তা সফল করতে সদর আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী রশিদ উল্লাহ, সহসভাপতি ইসমাইল মিয়া এবং আমি ২৫ মার্চ রাতে সুরমার দাউদপুর ও মোগলাবাজার ইউনিয়নে সমাবেশ করি।
রাত প্রায় ২টার দিকে বাড়ি ফিরি। তখনও জানতাম না রাত ১২টায় কারফিউ জারি হয়েছে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করারও কোনো উপায় ছিল না।
ভোরে কারফিউ চলাকালে দক্ষিণ সুরমার ঝালোপাড়া এলাকায় স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের সহায়তায় আমরা সড়কে পাথর ফেলে ব্যারিকেড দিই। কিন ব্রিজের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের জিপের শব্দ শুনতে পাই। তখন ভয় কাজ করছিল। কিছুক্ষণ পরই পাকিস্তানি সেনারা আমাদের ধাওয়া করে। আমরা স্থানীয় বাসিন্দা তাহির বকসের বাড়িতে আশ্রয় নিই। সবাই ভয়ে কাঁপছিল। আমরা অনেকক্ষণ চৌকির নিচে লুকিয়ে থাকি। পরে লুঙ্গি পরে সেখান থেকে বের হয়ে আসি। ১৭ মার্চ আমরা তিনজন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও এমএনএ দেওয়ান ফরিদ গাজীর চিঠি নিয়ে সুতারকান্দি সীমান্তে বিএসএফ কমান্ডারের কাছে যাই। চিঠিতে সীমান্ত খুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএসএফ এমএনএর উপস্থিতি চান। পরে গাজী সাহেবসহ আমরা ২৭ মার্চ আবার সীমান্তে যাই। কয়েক দিনের মধ্যেই কারফিউ শিথিল হলে সেনারা সিলেট রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে (বর্তমানে ক্যাডেট কলেজ) ক্যাম্প স্থাপন করে।
আমি আগরতলার দেরাদুনে ৩ মাস ১০ দিন প্রশিক্ষণ নিই। প্রশিক্ষণে আমার সঙ্গে মারুফ, মসিবাহ, সাজ্জাদ, ফারুক, শওকত, মোহন লালসহ আরও অনেকে ছিল। প্রশিক্ষণ শেষে আমরা সিলেটে ফিরে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ করি। দক্ষিণ সুরমার কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ক্যাম্প ছিল। আমরা সেটি দখল করি। ২১ জন সেনা আত্মসমর্পণ করে। ১৩ ডিসেম্বর দক্ষিণ সুরমা মুক্ত হয়। ২৫ মার্চ রাত ১২টায় কারফিউ জারি ও বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়। আমরা তা জানতে পারিনি। রেজিস্ট্রারি মাঠে জমায়েত হওয়ার কথা ছিল। সকালে কোতোয়ালি থানার তৎকালীন এসআই আবুল হোসেন কারফিউর সংবাদ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ফরিদ গাজীকে জানান। কিন্তু আমরা সেই খবর পাই পরদিন ভোরে। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে বড়লেখায় অবস্থান করি। আমরা সোনাই নদী হয়ে হাকালুকি হাওরে আসি। মাঝি জানত না নৌকার চাটাইয়ের নিচে অস্ত্র আছে। আমাদের কাছে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, কোমরে গ্রেনেড ও গুলি বাঁধা ছিল। ফেঞ্চুগঞ্জে পৌঁছাতে সূর্য উঠে যায়। নির্দেশনা ছিল– কেউ যেন বুঝতে না পারে আমরা মুক্তিযোদ্ধা। নৌকা ঘাটে ভেড়ানোর পর অস্ত্র রেখে নয়জনকে পারে তুলে আশ্রয় ক্যাম্পে যেতে বলি। আমি ও সাজ্জাদ দূরে অবস্থান করি। সেই সময় খবর পাই– ফয়েজ ভাই, শওকত আলী, নূরুজ্জামান ও মছব্বর মিয়া ধরা পড়েছে। রাজাকাররা আমাদের ফেঞ্চুগঞ্জ আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে লেফটেন্যান্ট আনসারীর সামনে তোলা হয়। তিনি আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করেন– আমি কি রফিকুল হক? বুঝতে পারি, আমার সঙ্গীদের কাছ থেকে আমার পরিচয় জেনে গেছে। আমি স্বীকার করি। এরপর তিনি অস্ত্রের খোঁজ জানতে চান। আমাদের ফেঞ্চুগঞ্জের কালাইবাবুর গুদামে বন্দি করে রাখা হয়। দেয়ালে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ দেখে বুঝি এটি ছিল নির্যাতনকেন্দ্র। অন্ধকারে বসে আমি ও সাজ্জাদ আত্মহত্যার পরিকল্পনা করি, কিন্তু তা করতে পারিনি। ভোরে আমাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়, নাশতা দেওয়া হয়। পরে খোলা জিপে তুলে কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং সেখান থেকে সিলেটে নিয়ে যাওয়া হয়।
সিলেটে রেসিডেন্সিয়াল মডেল হাই স্কুলের আর্মি ক্যাম্পে আমাদের রাখা হয়। একসময় সহযোদ্ধা শওকতের সঙ্গে দেখা হয়। জানতে পারি, তারা সবাই বেঁচে আছে। কয়েক দিনের মধ্যে ফয়েজ ভাই ও শওকতকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা চারজন থেকে যাই। পরে আরও অনেককে ধরে আনা হয়– রইছ আলী, হাসান আলী, আলাই পীর, টিএসআই মোহাম্মদ আলীসহ অনেকে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি আমাদের সিলেট কারাগারে পাঠানো হয়। পরে জানতে পারি, আমার ভাইদেরও ১৯ দিন আটক রেখে নির্যাতন করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২৭ নভেম্বর আমাকে ও সাজ্জাদকে সার্কিট হাউসে নেওয়া হয়। সেখানে শান্তি কমিটির নেতা নজমুল হোসেন খান, তারা মিয়া ও আমার বড় ভাইকে দেখি। পরে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
৪ ডিসেম্বর গ্রামের প্রবীণ রাজনীতিবিদ হামিদ মিয়ার বাড়িতে উঠি। পরদিন বিয়ানীবাজার যাওয়ার পথে খবর পাই– ডুবরি হাওরে মিত্রবাহিনী হেলিকপ্টারে নামছে। পরিকল্পনা বদলে বাড়ি ফিরে আসি। পরে মোহন লাল সোমের মাধ্যমে খবর পাই। বুরহান উদ্দিন (রহ.) মাজারে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। সেখানে সদর উদ্দিন চৌধুরী, মকসুদ ইবনে আজিজ লামা, ছানওয়ার আলী, আব্দুস শহীদ বাবুলসহ আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। কুশিঘাটে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ হয়। আমি আহত হই। পরে নদী পেরিয়ে আবার দক্ষিণ সুরমায় ফিরে আসি। সেখানে সহযোদ্ধা মুক্তাদির, আব্দুল মতিনসহ অনেকের সঙ্গে আবার মিলিত হই।
দক্ষিণ সুরমা মুক্ত করার জন্য আমরা পরিকল্পনা করি– আফরাইম আলী, মনির উদ্দিন, ছইল মিয়া, আনোয়ার হোসেন গামা, জলাল উদ্দিন, সামছুদ্দিন, বেলোয়েত হোসেন খানসহ কয়েকজন মিলে। ১২ ডিসেম্বর আমরা কদমতলীতে দুই পাকিস্তানি সেনাকে আটক করি। পরদিন ভোরে মিত্রবাহিনীর সঙ্গে একত্র হয়ে তেমুখী এলাকায় বাঙ্কার তৈরি করে আক্রমণ চালাই। হঠাৎ আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা দিশাহারা হয়ে পড়ে। বিকেলে ২১ জন আত্মসমর্পণ করে। তবে সেই যুদ্ধে আমাদের ক্ষতিও ছিল। একটি মর্টার এসে বাঙ্কারে পড়ে। মিত্রবাহিনীর সুবেদার রানাসহ তিনজন শহীদ হন। কদমতলী ক্যাম্প দখলের পর আত্মসমর্পণকারী সেনা ও শহীদদের নিয়ে আমরা রেলস্টেশনে মিত্রবাহিনীর ক্যাম্পে যাই। ১৪ ডিসেম্বর আমি একটি দল নিয়ে মোল্লারগাঁও ইউনিয়নের গোপশহরে যাই। সেখান থেকে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিই। রাতে নদী পেরিয়ে জিন্দাবাজারে আশ্রয় নিই। সেখানেই খবর পাই– রাজাকাররা হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে আশ্রয় নিয়েছে। আমি দল পাঠাই। তারা ১৫-২০ জন রাজাকারকে আটক করে নিয়ে আসে। ১৯ ডিসেম্বর আমরা যার যার বাড়িতে ফিরে যাই। কিন্তু সেই দিনগুলোর স্মৃতি– ভয়, সাহস, সংগ্রাম আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, আইনজীবী
অনুলিখন
মুকিত রহমানী
ব্যুরোপ্রধান, সিলেট
- বিষয় :
- স্বাধীনতা
