ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

বিশ্বজয়ের আনন্দে ভাসছে দেশ

স্বপ্ন এখন আরও বড়

স্বপ্ন এখন আরও বড়
×

ছবি: ফাইল

আলী সেকান্দার

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৪৯ | আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৭

পথপ্রদর্শক সাধারণত বড়রাই হয়ে থাকে। জ্ঞানে, অভিজ্ঞতায় আর অর্জনে। তবে কখনও কখনও ব্যতিক্রমও ঘটে। ছোটরাও বড়দের পথ দেখায়। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই ব্যতিক্রম ঘটনাই ঘটেছে। জাতীয় দল যেখানে তিনবার এশিয়া কাপের ফাইনালের বাধা পেরোতে পারেনি অনূর্ধ্ব-১৯ দল সেখানে জিতে নিয়েছে বিশ্বকাপ। বড়দের জন্য এখন আকবর আলীরাই প্রেরণা। তারা দেখালেন একাগ্রতা থাকলে স্বপ্নের বিশ্বকাপ জেতা যায়। ছোটদের দেখানো পথ ধরে বড়রাও হয়তো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে সাফল্য পেতে চেষ্টা করবেন। নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করবেন। ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ হতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য।

তবে জাতীয় দল উন্নতির একটা পর্যায় পর্যন্ত গিয়েছে। ২০১৫ সালে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছেন মাশরাফিরা। ওয়ানডে এশিয়া কাপে দু'বার এবং টি২০ এশিয়া  কাপে একবার ফাইনাল খেলে ভারত ও পাকিস্তানের কাছে হেরেছে। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলেছে তিন বছর আগে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ও চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে ভারতের কাছেই হেরেছে মাশরাফির দল। এই বিশ্বকাপ জয়ের পর আশা করা যায়, জাতীয় দল আগামীতে কোনো ফাইনালে ভারত-পাকিস্তানকে পেলে যুবাদের কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণা কাজে লাগিয়ে চ্যাম্পিয়ন হবে। জাতিকে উপহার দেবে এশিয়া বা বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের শিরোপা।

রোববার মুমিনুল হকরা যখন রাওয়ালপিন্ডিতে টেস্ট ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে খাবি খাচ্ছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার পচেফস্ট্রুমে আকবর আলীরা তখন স্বপ্নের শিরোপা জয়ের মিশনে ভারতকে মোকাবিলা করছিল। ছোটদের বিশ্বকাপ জয়ের রোমাঞ্চ উপভোগ করে, ক্রিকেট অনুজদের শুভেচ্ছা এবং উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে স্ট্যাটাস দিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। গতকাল সকালেই টেস্ট হারের পর পাকিস্তানের এক সাংবাদিক মুমিনুলকে প্রশ্ন করেছিলেন, 'সাধারণত সিনিয়র টিম জুনিয়রদের পথ দেখায়। কিন্তু গতকাল (রোববার) বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দল যে বিশ্বকাপ জয় করেছে, তার মাধ্যমে কি ওরা আপনাদের রোল মডেল হয়ে ওঠেনি?' মুমিনুল কৌশলে উত্তর দিয়ে পার পেলেও মনের ভেতরে একটা খচখচানি ঠিকই কাজ করেছে। হয়তো সে কারণেই অধিনায়ক টিম মিটিংয়ে সতীর্থদের বলেছেন, 'এভাবে খেলে কোনো লাভ হবে না। খেলতে হলে ভালোভাবে পারফর্ম করতে হবে।'

বাংলাদেশ ছাড়া উপমহাদেশের তিনটি দলই বিশ্বকাপজয়ী। ভারত ১৯৮৩ ও ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়ন। ইমরান খানের পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হয় ১৯৯২ সালে। আর শ্রীলংকা জিতেছে ১৯৯৬ সালে। টি২০ বিশ্বকাপেরও শিরোপা জিতেছে এই তিন দল। বিশ্বকাপজয়ের ক্ষেত্রে ছোটদের জন্য রোল মডেল রেখেছে তিনটি দলই। ব্যতিক্রম কেবল বাংলাদেশে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের অভিষেক হয় ১৯৮৮ সালে। পাকিস্তানকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় অস্ট্রেলিয়া। যুব বিশ্বকাপ ভারত চারবার, পাকিস্তান দু'বার জিতলেও শ্রীলংকা এখনও চ্যাম্পিয়ন হয়নি। তবে এই দেশগুলোতে যুব বিশ্বকাপ থেকে বিরাট কোহলির মতো তারকা ক্রিকেটার পেয়েছে। বাংলাদেশের যুব দল থেকেও নিয়মিত জাতীয় দলে খেলেন। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহরা তো অনূর্ধ্ব-১৯ দল হয়েই এসেছেন। তবে এবার বিশ্বকাপ জেতায় আশা করা হচ্ছে আকবর আলীরা আরও শানিত হয়ে আরও বড় লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় দলের সিংহদ্বারে প্রবেশ করবেন।

জাতীয় দলের সাবেক চার ক্রিকেটার মনে করেন, ২০২০ সালের যুব বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়রা ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপেও বাজির ঘোড়া হতে পারেন। ছোটদের এই বিশ্বকাপজয়কে দেশের ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন রকিবুল হাসান, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, এনামুল হক মনি ও আকরাম খানরা। রকিবুল হাসানের মতে, 'আইসিসির ইভেন্টে এই প্রথম আমরা চ্যাম্পিয়ন হলাম। এই বিজয় দেশের ক্রিকেটের জন্য বড় অর্জন। ছেলেরা সাহসী ক্রিকেট খেলেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে অত্যন্ত মেধাবী একটা দল তারা।'

বিসিবির কাছে জাতীয় দলের সাবেক এ অধিনায়কের অনুরোধ, শরিফুল ইসলামদের সঠিক পথ দেখাবে, 'এই অনূর্ধ্ব-১৯ খেলোয়াড়দের, এইচপি এবং 'এ' দলকে নিয়মিত দেশে এবং দেশের বাইরে বড় পরিসরের ক্রিকেট খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। লংগার ভার্সন বেশি বেশি খেলাতে হবে। এদের ওই স্বপ্ন দেখানোর দরকার মনে করি না, তুমি খুব ভালো খেলেছ, এক-দুই বছরের মধ্যেই জাতীয় দলে খেলবে। সে যখন ধারাবাহিক এবং পরিণত ক্রিকেট খেলবে, তখন অটো জাতীয় দলে ঢুকবে।'

চ্যাম্পিয়ন ১৯ দলের অধিনায়ক আকবর আলীতে মুগ্ধ রকিবুল, 'ফাইনাল ম্যাচটা পেন্ডুলামের মতো দুলছিল। এই অনিশ্চয়তার কারণেই আমরা আকবর আলীর মতো একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটারকে দেখতে পেলাম। এই বয়সের একজন সাহসী, আস্থাবান, বিচক্ষণ ক্রিকেটার। তার কিপিং এবং ব্যাটিং ঠিক থাকলে সে হবে দেশের ভবিষ্যৎ অধিনায়ক।'

জাতীয় দলের আরেক সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর বিশ্বাস, দেশের ক্রিকেট কাঠামোই বদলে দিতে পারে এই বিশ্বকাপ ট্রফি, 'এটা একটা টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অবকাঠামো ঠিক হওয়ার ক্ষেত্রে। আরেকটা টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে টিন এইজে তারকা সৃষ্টি হওয়ায়। সবাই আগে সাকিব, তামিম, মুশফিক হতে চাইত। এখন অনেকেই এদের নামগুলো নিয়ে ভাবতে পারে। ভালো কিছু করতে পারলে এই বয়সেও তারকা হওয়া যায়। এটা নির্ভর করবে বোর্ড এদের কীভাবে পরিচর্যা করছে।'

রকিবুলের মতো লিপুও মনে করেন, বিশ্বকাপজয়ী অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটাররা পরিণত হওয়ার পরই যেন জাতীয় দলে নেওয়া হয়, 'আমার মনে হয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আসতে এদের আরও অনেক পরীক্ষা দিতে হবে। পেস বোলারদের মধ্যে কিছু প্রতিশ্রুতিশীল আছে তবে এক নাগাড়ে ১৪০ গতিতে বল করতে দেখিনি, যেটা ভারতের বোলারদের দু-একজনকে দেখেছি। সিম বোলারদের নিয়ে আমি মুগ্ধ। তবে পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী খেলার যে অভ্যাস, সেটা ভালো করেছে তারা। বড় চ্যালেঞ্জিংয়ে গেলে কেমন হবে সেটা দেখার। সুতরাং এই খেলোয়াড়দের যথেষ্ট পরিণত হওয়ার জন্য আমার মনে হয় আরও কিছুটা সময় দরকর। বিভিন্ন জায়গায় আরও সফর করা দরকার, ভালো পরিবেশে যত্ন নিতে হবে। খেলোয়াড়দের সবার দুর্বল জায়গাগুলো কোচিং স্টাফ জানে, সেগুলো আরও চিহ্নিত করে উন্নতি করা দরকার।' তবে তিনিও অধিনায়ক আকবর আলীর মধ্যে বড় সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন, 'একটা ফাইনাল খেলায় যেভাবে সে দল পরিচালনা করেছে, আমার কাছে সেটা ভালোই মনে হয়েছে। আকবর সে রকম ভুল করেনি। দলকে শুধু মাঠে পরিচালনা করা নয়, একতাবদ্ধ রাখাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় সব কাজই সে ভালো করতে পারছে। কথাও ভালো বলে সে। ইংরেজিতে যে কথাগুলো বলল, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য স্কিল আছে।'

২৩ বছর আগে যার নেতৃত্বে আইসিসি ট্রফি জিতে দেশের ক্রিকেটে নবযুগের সূচনা এনে দিয়েছিলেন, সেই আকরাম খানেরও বিশ্বাস, যুব বিশ্বকাপ জয়ে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগবে দেশের ক্রিকেটে, 'প্রতিটি অর্জন প্রভাব ফেলে। এশিয়া কাপে মেয়েরা জিতল, জাতীয় দল তিনবার এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছে। ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতেছে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। এগুলো পরের ধাপে উন্নীত হতে সাহায্য করছে। আমরা যেমন ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জেতায় বিশ্বকাপ খেলতে পেরেছি। আবার বিশ্বকাপে ভালো করায় টেস্ট মর্যাদা পেলাম। তবে বিশ্বকাপ জেতায় নতুন প্রজন্মের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষুধা তৈরি হবে। আমাদের দায়িত্ব তাদের সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া।'

এই ক্রিকেটারদের আগামী পাঁচ বছরে সাকিব-তামিমদের পথ অনুসরণ করতে বলছেন আকরাম, 'ভালো উইকেট, ফিজিও, ট্রেনার, কোচ দেবো আমরা। ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করে দেবো। কিন্তু তারা নিজেদের গড়ে তুলতে পারলেই ভালো ক্রিকেটার হতে পারবে। বাংলাদেশে ভালো ক্রিকেটার অনেক আছে, প্রতিভার ছড়াছড়ি; কিন্তু মানসম্পন্ন খেলোয়াড়ের অভাব। যারা অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলল, আগামী পাঁচ বছর তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাকিব-তামিমের মতো তাদের মানসিক স্ট্রং হতে হবে। স্কিল ও ফিটনেস ডেভেলপ করতে হবে। এগুলো পারলে তারা জাতীয় দলের হয়ে ভালো খেলবে।'

জাতীয় দলের সাবেক স্পিনার ও আন্তর্জাতিক আম্পায়ার এনামুল হক মনির দৃষ্টিতে বিশ্বকাপ জয়ের উন্মাদনা কাজে লাগাতে পারলে বিপ্লব ঘটে সূচিত হবে দেশের ক্রিকেটে, 'আমাদের একটা চ্যাম্পিয়নশিপ কাপ দরকার ছিল। জাতীয় দল বারবার ব্যর্থ হচ্ছিল। আইসিসি ট্রফির ২৩ বছর পর আরেকটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট জিতলাম। আমার মনে হয় এই ট্রফি জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের টার্নিং পয়েন্ট হবে। নতুন কিছু দেবে। এটাকে পুঁজি করে আমাদের ক্রিকেট নতুন করে সাজাতে হবে। এখানে কিছু প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে তাদের সঙ্গে আগের দুই বিশ্বকাপের বাছাইকৃত ক্রিকেটারদের নিয়ে একটা ভালো দল বানাতে পারে বোর্ড, যারা লংগার ভার্সন ক্রিকেট খেলে জাতীয় দলের জন্য তৈরি হবে।

আরও পড়ুন

×