রাসেল এখন ব্যস্ত খামারি
--
প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২০ | ১২:০০
থেমে গেছে ক্রীড়াঙ্গনের কোলাহল। স্তব্ধ খেলার মাঠ। ঘরে সময় কাটছে খেলাধুলার তারকাদের। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ড্রয়িং রুমের খবর আসছে প্রতিনিয়তই। কিন্তু চারপাশের এই বৈরী সময়ে কেমন আছেন সাবেক তারকারা। কীভাবে কাটছে জীবন। সমকাল ক্রীড়া বিভাগের নতুন এই ধারাবাহিক আয়োজনে আজ সাবেক পেসার সৈয়দ রাসেলের বর্তমান সময় নিয়ে কথা বললেন আলী সেকান্দার
প্রতিষ্ঠিতদের একটা বড় অংশই নিজেকে খামারি বা কৃষক পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় খামারির চেয়ে একজন যে কোনো পর্যায়ের চাকরিজীবীকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সৈয়দ রাসেল ব্যতিক্রম। তিনি খামার নিয়ে আছেন এবং খামারি পরিচয়ে গর্ববোধ করেন। জাতীয় দলের সাবেক এ সুইং বোলার খামার ও মাছের ঘের দিয়ে আর্থিক দিক থেকেও শক্ত ভিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। এজন্য নিরলস খাটেন- যেমন পরিশ্রম করতেন খেলার মাঠে, খেলোয়াড়ি জীবনে। রাসেলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার খুব বড় হয়নি। তবে যে পাঁচ বছর জাতীয় দলে খেলেছেন, তাতে পারফরম্যান্সের ছাপ রেখে গেছেন। সফল হতে চান জীবনের নতুন অধ্যায়েও।
বাঁহাতি এ পেসারের বোলিং বৈচিত্র্য ছিল সুইং। এ কৌশল কাজে লাগিয়েই ক্রিকেট খেলেছেন ২০ বছর। সুশৃঙ্খল থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বহমান জীবনে পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে রাসেল দেখলেন প্রাপ্তির মিনারে জ্বলছে তৃপ্তির বাতি। যে প্রাপ্তির মূল্য অর্থের নিক্তিতে পরিমাপ করার নয়। তিনি তা করলেনও না, 'ক্রিকেট খেলে জীবনে বড় পাওয়া হলো সম্মান, মানুষের ভালোবাসা। এখনও বাইরে গেলে অনেক মানুষ বলেন, 'ভাই আপনার বোলিং ভালো লাগত। আপনি ভালো করতেন। আরও খেলতে পারতেন।' নেতিবাচক কথাবার্তা কখনও কারও মুখে শুনিনি। সব সময় সবাই ইতিবাচক কথা বলে। এ থেকে বুঝতে পারি আমি মানুষের মাঝেই আছি।'
জীবন কখনও পরিপূর্ণ হয় না। ক্রিকেট ক্যারিয়ারেও রাসেলের কিছু অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। জাতীয় দলে উপেক্ষিত হওয়ার ঘটনা প্রকাশ করলেন সমকালের কাছে, 'ক্রিকেট খেলেছি ২০ বছরের মতো। এই একটা জিনিসই জীবনে শিখেছি- ক্রিকেট খেলা। এই খেলা নিয়ে কখনও ফাঁকিবাজি করিনি। আমার আক্ষেপের জায়গা হলো, ওই সময় যারা কোচিং স্টাফ ছিলেন এবং নির্বাচক ছিলেন তারা আমাকে পছন্দ করতেন না। খারাপ খেলে বাদ পড়লে আফসোস থাকত না। এমনও হয়েছে পাঁচ থেকে সাত ম্যাচ পরে খেলানো হতো আমাকে, সে ম্যাচেও ভালো করতাম। এর পরও আবার ম্যাচ পেতে অপেক্ষায় থাকতে হতো। সবার সুযোগ দেওয়া হয়ে গেলে, বিকল্প যখন থাকত না, তখন আমাকে খেলাত।'
রাসেলের ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করেছেন ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। ২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ আর টি২০ বিশ্বকাপকে স্মৃতির অ্যালবামে সযতনে রেখেছেন যশোরের এ খেলোয়াড়, 'তিনটি টি২০ বিশ্বকাপ ও একটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলেছি। এ সময় খুব ভালো অর্জন বলতে ২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ। ওখানে অনেক সুখের স্মৃতি আছে। ওই সময়টা আমার সেরা সময় গেছে। স্মৃতিচারণ করতে গেলে ভালো জিনিস মনে পড়ে। দেশের হয়ে খেলা প্রতিটি ম্যাচই স্মৃতিময়। কোনোটাকে আলাদা করা যাবে না। প্রথম টি২০ বিশ্বকাপে গেইলের উইকেট নেওয়ার রোমাঞ্চ কখনও ভুলব না। ওই ম্যাচটা আমরা জিতেছিলাম। ম্যাচের আগের রাতে স্বপ্নে দেখেছি, গেইল খুব মারছে। বলগুলো স্টাম্পের বাইরে পড়ছে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, ভাবছিলাম ক্যারিয়ার শেষ। খুব চিন্তায় ছিলাম। কাওকে কিছু বলতেও পারছিলাম না। ম্যাচে বোলিং ভালো হওয়া এবং গেইলকে আউট করার পর স্বস্তি পেয়েছি।'
২০০৫ সালে শুরু করে ২০১০ সালে জাতীয় দলে শেষ ম্যাচ খেলেন রাসেল। ছয়টি টেস্ট, ৫২টি ওয়ানডে ও আটটি টি২০ ম্যাচের ক্যারিয়ার তার। দক্ষতার সঙ্গে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারতেন, যেটা তাকে জাতীয় দলে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে বলে জানান, 'পাঁচ উইকেট পাইনি কখনও; কিন্তু ব্রেক থ্রু দিয়েছি অনেক। গেম প্ল্যানে ভালো শুরু দরকার, আমি সেটা করে দিতে পেরেছি। ৩০ থেকে ৩৫ রানে ১০ ওভার শেষ করে দিতে পারতাম।' বোলিংয়ের মতো জীবনকে নিয়ন্ত্রিত রেখে এগোতে চান রাসেল। হতে চান ঝিকরগাছার মেয়র। পৌরসভা নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে আবেদন করবেন। তবে এ মুহূর্তে ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস থেকে নিজের রক্ষা করতে স্বেচ্ছায় খামারে থাকেন। নিজে নিরাপদে থাকছেন, পরিবারকেও নিরাপদ রাখছেন জাতীয় দলের সাবেক এ ক্রিকেটার। একইভাবে দেশের মানুষের প্রতি রাসেলের আহ্বান, 'সবার প্রতি আমার অনুরোধ ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। আপনি ট্রাভেল করলে করোনাভাইরাসও ট্রাভেল করবে। এ ভাইরাস মহামারি আকার নিলে কিছু করার থাকবে না। তাই নিজে বাঁচুন, পরিবারকে বাঁচান, দেশকে বাঁচান।' ঝিকরগাছার নেতৃস্থানীয়দের প্রতি বাঁহাতি এ পেসারের আহ্বান, সরকারের ত্রাণের অপেক্ষায় না থেকে নিজের থেকে খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। যেমন সামর্থ্যের ভেতরে মানুষের জন্য করে যাচ্ছেন রাসেল।
- বিষয় :
- ক্রিকেট
- সৈয়দ রাসেল